পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা নিয়ে বিক্ষোভে 'মূল অভিযুক্ত' এক মুসলিম অ্যাক্টিভিস্ট গ্রেফতার

    • Author, ময়ূরী সোম
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায় ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়াকে কেন্দ্র করে যে ব্যাপক বিক্ষোভ ও ভাঙচুর হয়েছিল বুধবার, সেই ঘটনায় একজন মুসলিম সামাজিক কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজ্য পুলিশ বলছে, গ্রেফতারকৃত এই ব্যক্তি 'মূল অভিযুক্ত'।

মোফাক্কারুল ইসলাম নামে ওই সামাজিক কর্মকর্তাকে রাজ্য পুলিশের সিআইডি শুক্রবার শিলিগুড়ি সংলগ্ন বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে আটক করে। একই সঙ্গে গ্রেফতার করা হয়েছে তার এক সহযোগী, পশ্চিমবঙ্গের পরিচিত ইউটিউবার, একরামূল বাগানিকেও।

মি. ইসলাম আইনজীবী এবং মুসলিমদের নানা ইস্যু নিয়ে সরবও হয়ে থাকেন।

রাজ্য পুলিশের অতিরিক্ত মহানির্দেশক (উত্তরবঙ্গ) কে জয়রামান জানিয়েছেন, মালদা জেলার ওই বিক্ষোভের ঘটনায় এখনো পর্যন্ত ৩৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, দায়ের করা হয়েছে ১৯টি মামলা।

রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস বলছে যে, 'মূল অভিযুক্ত' মি. ইসলাম বিগত বিধানসভা নির্বাচনে আসাদুদ্দিন ওয়েসির দল এআইএমআইএমের প্রার্থীও হয়েছিলেন।

তৃণমূল কংগ্রেস এক্স হ্যান্ডেলে একটি পোস্টে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে,আটকদের মধ্যে রয়েছেন মওলানা শাহজাহান আলি নামে এক ব্যক্তি, যাকে ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট মোথাবাড়ি কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করেছে এই নির্বাচনে।

ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফ দলটির নেতৃত্ব দেন মুসলিমদের পবিত্র ধর্মস্থান ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা নওশাদ সিদ্দিকি।

যে মালদা জেলার নানা অঞ্চলে সেদিন বিক্ষোভ ছড়িয়েছিল, এবং পাশ্ববর্তী জেলা মুর্শিদাবাদ - দুটিই মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল। ওই সব অঞ্চলের বহু 'বৈধ' ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বুধবার বিকেল থেকে প্রায় মাঝরাত পর্যন্ত কালিয়াচক অঞ্চলের স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকর্তার সরকারি দফতর ঘেরাও করে রেখেছিল কয়েক হাজার মানুষ। ওই দফতরেই বিবেচনাধীন ভোটার সংক্রান্ত কাজ করছিলেন সাতজন বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তা। তার মধ্যে একাধিক নারীও ছিলেন।

মাঝরাতে, বিক্ষোভকারীদের ঘেরাও থেকে ওই কর্মকর্তাদের উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার সময়ও পুলিশের গাড়ির ওপর হামলা হয়েছিল বলে অভিযোগ।

ঘটনাটি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে বৃহস্পতিবার ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ওঠে বিষয়টা। শীর্ষ আদালত পরামর্শ দিয়েছিল যে, কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সিকে দিয়ে এই ঘটনার তদন্ত করানো হোক।

রাতেই ভারতের নির্বাচন কমিশন মালদায় ওই বিক্ষোভের ঘটনার তদন্ত করতে নির্দেশ দেয় ভারতের সন্ত্রাস দমন এজেন্সি এনআইকে।

শুক্রবার এনআইএ-র তদন্তকারী দল পশ্চিমবঙ্গে এসে পৌঁছায়।

এডিজি উত্তরবঙ্গ জানিয়েছেন যে, এনআইএ এলে তাদের হাতে তদন্ত তুলে দেওয়া হবে।

পালাতে গিয়ে গ্রেফতার 'মূল অভিযুক্ত'?

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী শুক্রবার উত্তর দিনাজপুর জেলার হরিরামপুরে আয়োজিত এক জনসভায় বলেন, "মালদার মোথাবাড়িতে যে ঘটনা ঘটেছে, যে করেছে তাকে হাতেনাতে কে ধরেছে জানেন? এনআইএ আসার আগেই আমাদের সিআইডি… যারা নির্বাচন কমিশনের আওতায় পড়ে না, তারা মেন্ কাল্প্রিটকে গ্রেফতার করেছে।"

ঘটনা সম্পর্কে তিনি অভিযোগ করেন, "মুম্বাই থেকে বিজেপি ধার করে ওই অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন (দলের লোককে) নিয়ে এসেছে। ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) ওদের সাথে। কংগ্রেসের উস্কানি আছে। আর বিজেপিরও উস্কানি আছে।"

মিজ ব্যানার্জী দাবি করেন, বাংলার বদনাম বা "সংখ্যালঘুদের খেপিয়ে দিয়ে তাদের উপর কেন্দ্রীয় এজেন্সির অত্যাচারের" জন্য বিরোধীরা দায়ী।

গতকাল মুখ্যমন্ত্রী আরো অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটিয়ে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন আনার একটি পরিকল্পনা চলছে। তিনি সবাইকে শান্ত থাকার এবং প্ররোচনায় পা না দেওয়ার অনুরোধ জানান।

রাজ্য পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ সূত্র বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছে, শুক্রবার সকালে শিলিগুড়ির বাগডোগরা এয়ারপোর্ট হয়ে পালানোর চেষ্টা করছিলেন মূল অভিযুক্ত মোফাক্কারুল ইসলাম। তার কাছে থেকে উদ্ধার হওয়া নথি অনুযায়ী তিনি একজন আইনজীবী।

তিনি আরো জানান, "মি. ইসলামের নাম ফার্স্ট ইমফরমেশন রিপোর্টে 'মূল প্ররোচক' হিসেবে নথিভুক্ত ছিল। শিলিগুড়ি পুলিশ এবং সিআইডি একসঙ্গে গ্রেফতার করে মি. ইসলামকে। এখন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।"

বিজেপির ইঙ্গিত কার দিকে

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা সুকান্ত মজুমদার বলেন, "(ধৃত মূল অভিযুক্ত) মোফাক্কারুল ইটাহারের বাসিন্দা। এবং সেই ইটাহারেই বাড়ি তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক এবং মাইনোরিটি মোর্চার সভাপতির। এই জন্য ভালো করে তদন্ত করে দেখা উচিত মোফাক্কারুল আদপে কার হয়ে কাজ করছিল।"

তিনি দাবি করেন, "মূল উস্কানিদাতা বুধবার গাড়ির উপর দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছিল এবং প্রচুর মানুষকে উস্কেছিল এই জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের আটকে রাখার জন্য।"

দেশের শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য প্রশ্ন তোলেন, "এই ধরনের পোলারাইজেশন কোনো রাজ্যে হতে পারে, সেটা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত কখনো দেখেনি। আমরা কোন পশ্চিমবঙ্গে বাস করছি? আজ কি আমরা আবার উদ্বাস্তু হব?"

অন্যদিকে, মালদার ঘটনা সম্পর্কে সিপিআই (এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেন, "বিজেপি এবং তৃণমূল, দুই শাসকদল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এসআইআরকে বিভাজনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে চেয়েছে।"

তার দাবি, "নাম না থাকা মানুষকে রাতারাতি বেনাগরিক করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। যারা এই ষড়যন্ত্র করছে, যারা ভোটার তালিকায় কারচুপি করে ভোটের ফলাফল নিজেদের পক্ষে আনতে চাইছে, মানুষের ক্ষোভ তাদের বিরুদ্ধে বাড়ছে।"

দুই মুসলিম অধ্যুষিত কেন্দ্রে 'বিবেচনাধীন' ২ লাখ নাম

পশ্চিমবঙ্গের যে বিধানসভা কেন্দ্রগুলি মুসলিম অধ্যুষিত, তার প্রথম দশটির তালিকায় সবার আগে আছে মালদা জেলার সুজাপুর আসনটি। ওই তালিকাতেই কিছুটা নিচের দিকে রয়েছে মোথাবাড়ি আসনটি।

এই দুটি অঞ্চল জুড়েই বুধবার বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন মানুষ।

ভারতের নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মালদা জেলার মোথাবাড়ি এবং সুজাপুর কেন্দ্র মিলিয়ে প্রায় দুই লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে প্রকাশিত 'বিচারাধীন ভোটারের' তালিকায় রাখা হয়।

কলকাতার সমাজ গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'সবর ইনস্টিটিউট'-এর তথ্য বলছে, সুজাপুরের ৫২ শতাংশেরও বেশি মানুষের নাম 'বিবেচনাধীন' তালিকায় চলে গেছে। মোথাবাড়িতে এই সংখ্যাটা ছাড়িয়েছে ৩৯ শতাংশেরও বেশি।

ওই বিবেচনাধীন ভোটারদের নথি যাচাইয়ের কাজ করছেন সাতশোরও বেশি বিচারক। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে যে, ইতিমধ্যেই ৪৯ লক্ষেরও বেশি বিবেচনাধীন মামলায় সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছেন বিচারকরা।

তারপরেই নির্বাচন কমিশন 'বাদ পড়া ভোটার'দের যে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করছে দফায় দফায়, তা থেকেই সাধারণ মানুষ জানতে পারছেন যে তারা ভোট দিতে পারবেন কী না। এই তালিকা যতই প্রকাশিত হচ্ছে, ক্ষোভ বাড়ছে মানুষের মধ্যে।

বুধবার, এই দুই কেন্দ্রেই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার প্রতিবাদে মানুষ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। তাদের অভিযোগ, বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গ জুড়েই যাদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, তাদের একটা বড়ো অংশ মুসলিম এবং নারী।

ভোট বিশ্লেষকরা বলে থাকেন যে নির্বাচনের সময়ে এই দুই অংশের মানুষদের ঢালাও সমর্থন পেয়ে থাকে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস।

সমাজকর্মী এবং অ্যাক্টিভিস্ট শর্মিষ্ঠা রায় বিবিসি বাংলাকে বলেন, "অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে অন্য রাজ্যে যেভাবে এসআইআর হচ্ছে, তার থেকে অনেকটা আলাদা ভাবে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। এখানে বিচারব্যবস্থাও যুক্ত হয়ে গেছে ভোটাধিকার যাচাইয়ের কাজে। বিবেচনাধীন মানুষ এই প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব হারানোর মুখে।"

সুপ্রিম কোর্টে তোপের মুখে 'নিষ্ক্রিয়' প্রশাসন

বুধবার মালদা জেলার মুসলিম অধ্যুষিত দুটি অঞ্চলে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পরেও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নিষ্ক্রিয় ছিলেন বলে মন্তব্য করেছিল সুপ্রিম কোর্ট।

ভারতের শীর্ষ আদালত বলেছিল, "পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের খাবার ও জল পর্যন্ত দেওয়া যায়নি। জেলাশাসক বা পুলিশ সুপার কেউই সেই বিডিও অফিসে পৌঁছাননি, যেখানে কর্মকর্তাদের ঘেরাও করে রাখা হয়েছিল।"

রাজ্য প্রশাসনের তরফে রাত ৮.৩০ পর্যন্ত "লক্ষণীয় নিষ্ক্রিয়তা" ছিল বলে আদালতের পর্যবেক্ষণে জানানো হয়েছে। নবনিযুক্ত মুখ্যসচিবকেও সেই সময়ে যোগাযোগ করা যায়নি বলে জানিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

তবে তৃণমূল কংগ্রেস বলছে, নির্বাচন ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পর থেকে পুলিশ ও প্রশাসন তো নির্বাচন কমিশনের অধীনে কাজ করে। পুলিশ ও প্রশাসনে ব্যাপক রদবদলও ঘটিয়েছে নির্বাচন কমিশনই।

গতকাল রাতেই দেশের সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ মেনে নির্বাচন কমিশন মালদার ঘটনার তদন্তভার দেয় কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা, এনআইএ -কে। এনআইএর প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে আদালতে।