বিশ্বের বৃহত্তম আদমশুমারির কাজ শুরু হলো ভারতে, পাঁচ বছর দেরিতে

পড়ার সময়: ৭ মিনিট

ভারতে শুরু হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম আদমশুমারি, অর্থাৎ জনগণনার কাজ। এই প্রথমবার ডিজিটাল মাধ্যমে সেদেশে জনগণনা হবে।

ভারতে আদমশুমারি প্রতি ১০ বছর অন্তর হওয়ার কথা। সেই অনুযায়ী ২০১১-র সর্বশেষ জনগণনার পরে ২০২১ সালে আদমশুমারি হওয়ার কথা থাকলেও সেই সময়ে করোনা মহামারির কারণে তা পিছিয়ে দিয়ে নির্ধারিত সময়ের পাঁচ বছর পরে এখন তা শুরু হলো।

এটি ভারতের ১৬তম আদমশুমারি বা সেন্সাস, যা ১৯৪৭ সালে দেশের স্বাধীনতার পর অষ্টম। এ বারের সেন্সাসে বহু 'বিতর্কিত' জাতিগত তথ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

ভারত সরকার আনুষ্ঠানিক আদমশুমারি গত ১৫ বছর আগে শেষ বার করলেও জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ১৪০ কোটির বেশি জনসংখ্যা নিয়ে ভারত ২০২৩ সালেই জনসংখ্যার নিরিখে চীনকে ছাড়িয়ে গেছে।

তথ্য বলছে, গড় বয়স ২৮ বছর হওয়ার কারণে এটি বিশ্বের অন্যতম তরুণ দেশ এবং যার প্রায় ৭০ শতাংশ জনসংখ্যাই কর্মক্ষম।

৩৩টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে নাগরিকদের

আদমশুমারির মাধ্যমে প্রত্যেক ভারতীয়কে ৩৩টি প্রশ্ন করা হবে।

যার মধ্যে 'বাড়ির ছাদ কি পাকা নাকি খড়ের','আপনার খাবারে প্রধান খাদ্যশস্য কী?', 'ইন্টারনেট সংযোগ আছে কি না?', 'মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন কি না' -এ ধরনের প্রশ্নও করা হবে।

যে জনগণনায় জাতি-সম্পর্কিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়, তাকে জাতিগত জনগণনা বলা হয়। সেই প্রক্রিয়ায় কেবল জনসংখ্যা গণনাই করা হয় না, অন্যান্য দিকও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

১৮৭২ সালে, ভারতে ব্রিটিশ শাসনকালে, ভাইসরয় লর্ড মেয়ো জনগণনা শুরু করেন। ১৯৩১ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশদের জনগণনায় জাতি-সংক্রান্ত তথ্য লিপিবদ্ধ করা হতো।

স্বাধীন ভারতের প্রথম জনগণনা ১৯৫১ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ভারত সরকার ২০২৭ সালের আদমশুমারির জন্য ভারতীয় মুদ্রায় ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ অনুমোদন করেছে। সম্ভাব্য সমস্ত আঞ্চলিক ভাষায় প্রায় ৩১ লক্ষ গণনাকারী ও সুপারভাইজারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এই জনগণনার জন্য।

যেভাবে চলবে আদমশুমারির প্রক্রিয়া

এবারেই প্রথম ভারতে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে আদমশুমারি পরিচালিত হচ্ছে। এর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় রয়েছে।

স্ব-গণনা: প্রত্যেকে অনলাইনে নিজেদের তথ্য নিজেরাই পূরণ করতে পারবেন। নিজেদের তথ্য পূরণ করলে ভুলের সম্ভাবনা কম। তথ্য সংগ্রহ আরও দ্রুত হবে। তবে, এই পর্যায়টি বাধ্যতামূলক নয়।

অনলাইনে তথ্য পূরণ করলেও, তথ্য সংগ্রহকারী প্রত্যেকের বাড়ি যাবেন। যারা অনলাইনে নিজেদের তথ্য পূরণ করবেন তাদের একটি এসই আইডি (SE ID) ব্যবহার করে তা যাচাই করতে হবে।

SE ID বা সেল্ফ এনুমারেশন আইডি একটি ১১ সংখ্যার আলফানিউমেরিক কোড ("H" দিয়ে শুরু)। se.census.gov.in ওয়েবসাইটে অনলাইনে ডিজিটাল আদমশুমারি প্রশ্নপত্র পূরণ করার পর এই আইডি প্রত্যেকের কাছে এসএমএস বা ইমেলের মাধ্যমে পৌঁছে যাবে।

মোবাইল অ্যাপেও করা যাবে, অ্যাপটি ১৬টি ভাষায় পাওয়া যাবে।

বাড়ি তালিকাভুক্তি ও গৃহগণনা: এই সময়ে এলাকার প্রতিটি কাঠামো, ভবন এবং বাড়ি গণনা করে সেগুলোকে তালিকাভুক্ত করা হয়।

এই তথ্য ব্লকগুলোকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। তবে নিশ্চিত করতে হয় কোনো বাড়ি যেন বাদ না পড়ে। প্রতিটি বাড়ির বিবরণ, অবস্থা, শৌচাগার আছে কি না, মালিকানা কার, তাও খতিয়ে দেখা হয়।

জনসংখ্যা গণনা: এই পর্যায়ে, গণনাকারীরা প্রত্যেক ব্যক্তির নির্দিষ্ট তথ্য নথিভুক্ত করতে প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি যান। এখানে গণনাকারী স্মার্টফোন ব্যবহার করে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য রেকর্ড করবেন এবং ডেটা জমা দেবেন।

২০২৭ সালের আদমশুমারির সময়সীমা

যদিও আদমশুমারির কাজ ২০২৬ সালে কাজ শুরু হলো, তবে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যাবে আগামী বছর। তাই এটিকে বলা হচ্ছে '২০২৭ সেন্সাস'।

পহেলা এপ্রিল থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ – গৃহ তালিকা এবং গৃহগণনা পরিচালিত হবে। প্রতিটি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্য একটি নির্দিষ্ট ৩০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সময়ের ১৫ দিন আগে থেকে 'স্ব-গণনা' করা যাবে।

ফেব্রুয়ারি ২০২৭- প্রকৃত জনসংখ্যা গণনা করা হবে। তবে, যে সমস্ত এলাকায় এই সময়ে তুষারপাত হয়, সেখানে এই প্রক্রিয়াটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেই হবে, যেমন লাদাখ এবং ভারত শাসিত জম্মু ও কাশ্মীর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের তুষারাবৃত এলাকা এবং উত্তরাখণ্ড ও হিমাচল প্রদেশ।

দ্বিতীয় পর্যায়ে, জাতি গণনাও নথিভুক্ত করা হবে।

এর পাশাপাশি, প্রত্যেক ব্যক্তির কাছ বয়স, লিঙ্গ, আয়, ধর্ম, ভাষা, শিক্ষা, সন্তানের সংখ্যা এবং দেশের বাইরে থাকেন কি না তার তথ্যও নেওয়া হবে।

পশ্চিমবঙ্গে আদমশুমারি কবে হবে?

পশ্চিমবঙ্গে এখনো আদমশুমারির নোটিফিকেশন জারি হয়নি।

এ ব্যাপারে রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন রেজিস্ট্রার জেনারেল অব ইন্ডিয়া এবং সেনসাস কমিশনার মৃত্যুঞ্জয় কুমার নারায়ণ।

প্রথম দফার কাজ শেষ করার জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় আছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

"এটি আইনি প্রক্রিয়া। এটা করতেই হবে। আমরা পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আলোচনা করছি। আশা করছি তাড়াতাড়িই নোটিফিকেশন বেরিয়ে যাবে", বক্তব্য মি নারায়ণের।

আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, দিল্লি, গোয়া, কর্ণাটক, লাক্ষাদ্বীপ, মিজোরাম, ওড়িশা এবং সিকিমে ২০২৬ সালের পহেলা পহেলা এপ্রিল থেকে ১৫ই এপ্রিল পর্যন্ত স্ব-গণনা পর্ব চলবে।

২০২৬ সালের ১৬ই এপ্রিল থেকে ১৫ই মে পর্যন্ত গৃহতালিকা তৈরি এবং গৃহগণনা করা হবে।

মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, চণ্ডীগড়, ছত্তিশগড় এবং হরিয়ানা রাজ্যে ২০২৬ সালের ১৬ই এপ্রিল থেকে ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত স্ব-গণনা হবে।

২০২৬ সালের পহেলা মে থেকে ৩০শে মে পর্যন্ত গৃহতালিকা তৈরি ও গৃহগণনা শুরু হবে।

ভারতে জনগণনায় দেরি হলো কেন?

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং জনগণনা কমিশনার আদমশুমারির গোটা প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়।

ভারতে সাধারণত প্রতি দশ বছর অন্তর জনগণনা করা হয়।

২০১১ সালে আর্থ-সামাজিক ও জাতিগত আদমশুমারি পরিচালিত হয়, তবে তার তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।

২০১৫ সালের তেসরা জুলাই ভারত সরকার এই তথ্য প্রকাশ করে। তবে এতে প্রচুর ত্রুটি ছিল। যার একটি বড় অংশ পরে সংশোধন করা হয়।

২০১৫ সালেও একটি জাতিভিত্তিক আদমশুমারি পরিচালিত হয়েছিল যার ফল অপ্রকাশিত। কেন্দ্রীয় সরকার একটি শুনানির সময় দাখিল করা হলফনামায় জানায় যে, এই তথ্য ত্রুটিপূর্ণ ও অসঠিক হওয়ায় তা ব্যবহারযোগ্য নয়।

এমনকি কর্ণাটক রাজ্য সরকার একটি সামাজিক ও শিক্ষাগত সমীক্ষা করে, সেটাও অপ্রকাশিত থেকে যায়।

বিশ্বব্যাপী কোভিড মহামারির কারণে ২০২১ সালের জন্য নির্ধারিত আদমশুমারি স্থগিত হয়ে যায়। তবে সেবছরই পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন হয়েছে, সেই ভোটের প্রচারে বড় বড় জনসভা ও মিছিল হয়েছে।

২০২২ সালে কোভিড প্রতিবন্ধকতা অনেকটা অতিক্রান্ত হলেও আদমশুমারির পরিকল্পনা করা হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পূর্ণ ব্যবস্থাটিকে ডিজিটাল করার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। যার জন্য প্রশিক্ষণ দিতেও সময় লেগেছে।

একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, সমীক্ষায় জাতিভিত্তিক গণনা যুক্ত করা নিয়ে তীব্র আলোচনা এবং রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত জনগণনা স্থগিত করে রাখা হয়।

২০২৯ সালে পরবর্তী লোকসভা ভোট রয়েছে। ২০২৭ সালের জনগণনার পরে লোকসভা কেন্দ্রগুলোর পুনর্বিন্যাস করা হবে।

ভারতে আদমশুমারি কেন প্রয়োজন?

জনগণনা থেকে পাওয়া তথ্য দেশের নীতি প্রণয়নের জন্য ব্যবহার করা হয়।

বিবিসির ভারত সংবাদদাতা সৌতিক বিশ্বাস জানাচ্ছেন, জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের পরিকল্পনা, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ ইত্যাদির জন্য আদমশুমারি থেকে পাওয়া তথ্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় আদমশুমারি না হওয়ায় ভারত সরকার সাম্প্রতিক জনসংখ্যার কোনো ভিত্তি ছাড়াই নীতি প্রণয়ন করে আসছে।

নতুন আদমশুমারির অভাবে, দেশের ব্যয় থেকে শুরু করে শ্রমশক্তির তথ্য পর্যন্ত সবকিছু নির্ধারণের জন্য অন্যান্য বিভিন্ন সমীক্ষার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ অশ্বিনী দেশপান্ডে বিবিসিকে জানান, "ভারতের মূল মানচিত্রে কোনটা শহর, কোনটা গ্রাম বা ক্রমবর্ধমান এলাকা হিসাবে গণ্য হবে তা বোঝার জন্য আদমশুমারির দরকার আছে। কোনো এলাকার জনসংখ্যা, অথনৈতিক - সামাজিক পরিস্থিতি জানা থাকলে তবেই সেখানকার উন্নতির জন্য নীতি নির্ধারণ সম্ভব। ২০১১-র পর সব এলাকারই অনেক পরিবর্তন হয়েছে। যদি পুরোনো তথ্য বা ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেশে নীতি নির্ধারণ করা হয় তবে মানুষ তাদের প্রাপ্য পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।"

মি দেশপান্ডের মতে, "ভারতের বিশাল জনকল্যাণ ও সরকারি ব্যয় ব্যবস্থার ওপর এর বাস্তব প্রভাব রয়েছে। এই আদমশুমারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে ভারতের জাতি ও ধর্ম থেকে শুরু করে চাকরি, শিক্ষা ও সুযোগ-সুবিধা পর্যন্ত সব সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।"

'জাতিগণনা' নিয়ে বিতর্ক কেন?

ভারতে জাতি গণনাতে সবসময়ই সরকারি সুবিধার ভাগ কে পাবে আর কে পাবে না, সেই বিষয়টিও জড়িত থাকে।

২০২৭ সালের আদমশুমারিতে প্রতিটি জাতিকে গণনা করা হবে। কয়েক দশক ধরে জাতিগণনা নিয়ে বিতর্ক চলেছে।

এক পক্ষ এটিকে অনগ্রসর শ্রেণির সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ও সঠিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানালেও অন্য পক্ষ একে সামাজিক বিভাজন, জাতপাত বৃদ্ধি ও ভোটের রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে দেখেছে - যা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও বাদানুবাদ চলেছে।

প্রতিটি জাতির অনেক উপগোষ্ঠী থাকায়, তাদের শ্রেণিবিন্যাসের সঠিক স্তর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

১৯৫১ সালের আদমশুমারির পর থেকে তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতি ছাড়া সকলের জন্য জাতিগত গণনা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার ফলে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্য থাকেনি।

১৯৬১ সালে ভারত সরকার রাজ্যগুলিকে সমীক্ষা পরিচালনা করতে এবং অন্যান্য অনগ্রসর জাতি সমূহের জন্য রাজ্য-ভিত্তিক তালিকা সংকলন করার অনুমতি দেয়।

সর্বশেষ জাতীয় জাতিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল ২০১১ সালে।

২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে 'ভারত জোড়ো যাত্রা' চলাকালীন এবং লোকসভার বর্তমান বিরোধী দলনেতা কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী জাতিগত গণনার দাবিটি জোরালোভাবে তুলে ধরেন।