আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ, বিচারকদের ঘেরাও
- Author, ময়ূরী সোম
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া নিয়ে আবার তুমুল বিক্ষোভ হয়েছে সে রাজ্যে। মালদা জেলায় এরকমই একটি ঘটনার জেরে বৃহস্পতিবার দেশের সুপ্রিম কোর্ট শোকজ করেছে রাজ্যের মুখ্যসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি, এবং মালদার পুলিশ সুপার ও জেলাশাসককে।
বুধবার সকাল থেকে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মালদা জেলার মোথাবাড়ি, সুজাপুর, কালিয়াচকের মতো একাধিক জায়গা। জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন বিক্ষোভকারীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘেরাও করে রাখা হয় একাধিক বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাকে।
বিক্ষোভকারীরা দাবি করছেন, রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এস আই আর) পর অনেক ভোটারের নাম বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ।
তারা প্রশ্ন তুলছেন, রাজ্যের একটা বিপুল সংখ্যক মানুষকে ভোট প্রয়োগ করতে না দিয়ে কী করে নির্বাচন হতে পারে?
অভিযোগ উঠেছে, বুধবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বিক্ষোভকারীরা ঘেরাও করেন কালিয়াচক ২ ব্লকের বিডিও অফিস। সেখানে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ করছিলেন সাতজন বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তা।
এই বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তারা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ভোটারদের জমা দেওয়া নথি যাচাই করছেন রাজ্যের প্রতিটি জেলায়।
প্রায় মাঝরাতে রাজ্য পুলিশ অফিসাররা তাদের উদ্ধার করেন।
মাঝরাতে কিছুক্ষণের জন্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও, বৃহস্পতিবার সকালে আবারও ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন বিক্ষোভকারীরা। ঘটনাস্থলে মোতায়ন করা হয় রাজ্য পুলিশ বাহিনী এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী।
বিধানসভা নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগেই আইনশৃঙ্খলার এই অবনতি বিচারব্যবস্থা এবং নির্বাচন কমিশনের কপালে ভাঁজ ফেলেছে।
রাজ্য পুলিশের কাছে ঘটনার রিপোর্ট তলব করেছে নির্বাচন কমিশন।
পুলিশ কী বলছে?
বৃহস্পতিবার মালদার পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট অনুপম সিং বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ইতিমধ্যেই ১৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের নামে একাধিক ধারায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, যেমন জনসাধারণের সম্পত্তির ক্ষতি করা আর সরকারি অফিসারদের কাজে বাধা দেওয়া।"
তিনি দাবি করেন, এই মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।
বৃহস্পতিবার রাজ্য পুলিশের এক্স হ্যান্ডলে লেখা হয়, ঘটনায় একজন কনস্টেবল এবং একজন স্থানীয় বাসিন্দা জখম হয়েছেন। তারা এখন সেরে উঠছেন বলে দাবি করেছে পুলিশ।
পোস্টে আরো বলা হয়েছে, "পুলিশ যথাযথ ভাবে পরিস্থিতির সামাল দিয়েছে। এখনো কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।"
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
বিতর্ক কী নিয়ে?
গত অক্টোবরে ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশন দ্বারা পরিচালিত এসআইআর প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গ সহ আরো ১১টি রাজ্যের ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণের কাজ শুরু হয়।
ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে রাজ্যের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্ৰকাশ করে কমিশন। সেই তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায় প্রায় ৬৩ লক্ষ মৃত, অনুপস্থিত, অবৈধ এবং স্থানান্তরিত ভোটারের নাম। তার সাথে, ৬০ লক্ষ ভোটার রয়ে যান 'বিবেচনাধীন'।
ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে প্রকাশিত ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, রাজ্যের 'বিবেচনাধীন' ভোটারদের একটি বড় অংশ মালদা এবং মুর্শিদাবাদ জেলার ভোটার।
বিশেষ করে, মালদার সুজাপুর এবং মোথাবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে প্রচুর ভোটার বিবেচনাধীনের তালিকায় ছিলেন।
ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ মেনে বিবেচনাধীন কেসগুলি নিষ্পত্তি করার দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রায় ৭০০ বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাকে।
কমিশন সূত্রের দাবি, বুধবার পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে প্রায় ৪৯,৬২,৮৫০ বিবেচনাধীন কেসের।
ইতিমধ্যেই নিষ্পত্তি হওয়া কেসের ভিত্তিতে, একাধিক সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট এবং 'ডিলিটেড' লিস্ট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন।
সমাজ গবেষকরা কী বলছেন?
সবর ইনস্টিটিউট নামে কলকাতার একটি সামাজিক গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রথম এবং দ্বিতীয় ডিলিটেডের তালিকায় যে বিবেচনাধীন ভোটারদের নাম গ্রাহ্য করেননি বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তারা, তার মধ্যে সংখ্যালঘু ভোটারদের হারই সর্বাধিক।
এসআইআরে ভোটারদের ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় চিহ্নিত করতে হয়েছে নিজেদের বা পিতামাতার নাম। ২০০২ সালে শেষবার রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া হয়েছিল।
২০২৫ সালের এসআইআরে, নির্বাচন কমিশনের প্রথম দিকের নির্দেশিকায় উল্লেখ ছিল, যাদের নাম বা পিতামাতার নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নির্ভুল পাওয়া গেছে, তাদের নাম সরাসরি বৈধ ভোটারদের তালিকায় আবার উঠে যাবে।
২০০২ সালের তালিকার সাথে এই যোগসূত্র করার প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া হয়েছিল 'ম্যাপিং'।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য এবং সবর ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মালদার সুজাপুর বিধানসভা কেন্দ্রে মাত্র ০.৫৮ শতাংশ ভোটার ২০০২ এর তালিকার সাথে 'আনম্যাপড' অর্থাৎ যোগসূত্রহীন ছিল।
কিন্তু সেই তুলনায়, একই কেন্দ্রে বিবেচনাধীন ভোটারদের হার ছিল ৫২.৪৯%।
বুধবার এই বিধানসভা কেন্দ্রেও বিক্ষোভ হয়েছিল ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার প্রতিবাদে।
সবর ইন্সিটিটিউটের গবেষক সাবির আহমেদ বিবিসিকে বলেন, "আমরা ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় আর একাংশ বিবেচনাধীন কেস নিষ্পত্তির পর, সংখ্যালঘু জনসংখ্যায় ডিলিশন তুলনায় অনেকটা বেশি।"
"বিশেষ করে মালদা এবং মুর্শিদাবাদে। এই জেলাগুলিতে, যতজন নিজেদের ২০০২ এর তালিকায় ম্যাপ করতে পেরেছিলেন, এবং যতজনের নাম সম্প্রতি বাদ দেওয়া হচ্ছে, তার মধ্যে সামঞ্জস্য নেই," জানান তিনি।
তার মতে, এসআইআর প্রক্রিয়া রাজ্যের মানুষকে একটি অসহায় জায়গায় ঠেলে দিয়েছে।
সাবির আহমেদ বলছেন, "গরিব মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। হিংসা কখনোই সমাধানের পথ হতে পারে না, কিন্তু ভোটাধিকার নিয়ে মানুষের মনে যে উদ্বেগ রয়েছে, মালদার ঘটনাটি তারই একটি বহিঃপ্রকাশ।"
শীর্ষ আদালত কী নির্দেশ দিল?
বৃহস্পতিবার দেশের সর্বোচ্চ আদালত শোকজ করেছে রাজ্যের মুখ্যসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি, এবং মালদার পুলিশ সুপার আর জেলাশাসককে।
আদালত নির্দেশ দিয়েছে, এই ঘটনার তদন্তের ভার যেন দেওয়া হয় সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন, সিবিআই বা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেটিং এজেন্সি, এনআইএ-র মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার উপর।
বিচারকদের কর্মস্থান এবং বাসস্থানে নিরাপত্তার কড়া ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত সংখ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়নেরও নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
সুপ্রিম কোর্টের আরো নির্দেশ, যে দফতরে আপত্তি নিষ্পত্তির কাজ এবং শুনানি করছেন বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তারা, সেখানে যেন একসঙ্গে তিন থেকে পাঁচ জনের বেশি মানুষ না জড়ো হন।
রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা কি বলছেন?
এই ঘটনার উল্লেখ করে, মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা ব্যানার্জী অভিযোগ করেছেন, "রাষ্ট্রপতি শাসনের গেমপ্ল্যান চলছে।"
বৃহস্পতিবার মুর্শিদাবাদের সুতিতে একটি জনসভায় মিজ. ব্যানার্জী বলেন, "অনেক মানুষের ভোট বাদ দিয়েছে, তার মধ্যে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা বেশি।… কিন্তু আমি অনুরোধ করব কেউ দাঙ্গায় যাবেন না। এটা বিজেপির প্ল্যান, আপনাদের উস্কে দেওয়া।"
মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, "মালদার ঘটনা দিয়ে রাজ্যকে বদনাম করা হয়েছে, একটা আন্দোলনের জন্য। আন্দোলন করতে পারেন, শান্তিপূর্ণ (ভাবে)।… গন্ডগোলে যাবেন না, শান্ত থাকুন। জজদের গায়ে হাত দেবেন না, শান্ত থাকুন।"
বৃহস্পতিবার মিজ. ব্যানার্জীর একটি জনসভা ছিল মালদা জেলারই বৈষ্ণবনগর বিধানসভা কেন্দ্রে।
অন্য দিকে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা সুকান্ত মজুমদার ঘটনাটির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, "এটি ভয়ঙ্করতম ঘটনা। এই পুরো বিষয়টি ঘটেছে মমতা ব্যানার্জী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের উসকানিতে।"
তার দাবি, পুলিশ কর্মকর্তারা যখন আটকে পড়া বিচারকদের উদ্ধার করার চেষ্টা করেন, বিক্ষোভকারীরা তাদের গাড়ির উপর হামলা করেন এবং বাঁশ ফেলে রাস্তা অবরোধ করার চেষ্টাও করেন।