অস্ট্রেলিয়ার ভিসা বাতিল নিয়ে বিবিসি বাংলাকে যা জানালেন মিজানুর রহমান আজহারী

    • Author, মোহনা হোসেন
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৩ মিনিট

হিটলারের প্রশংসা ও ইহুদি বিদ্বেষী বক্তব্যের অভিযোগে ভিসা বাতিল করা হয়েছে অস্ট্রেলিয়া সফররত বাংলাদেশি একজন ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারীর। ভিসা বাতিলের বিষয়টি বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন মি. রহমান, জানিয়েছেন দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

অস্ট্রেলিয়া সফর

মিজানুর রহমান আজহারী গত ২৮শে মার্চ অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছান। তার এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন কমিউনিটি আয়োজিত ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এবং বক্তব্য দেওয়া।

সফরের প্রথম কয়েকদিন তিনি সেখানে অবস্থান করলেও কোনো আনুষ্ঠানিক জনসভায় বক্তব্য দেননি বলে জানিয়েছেন।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, তার প্রথম ইভেন্ট হওয়ার কথা থাকলেও সেটি পরবর্তীতে পুনঃনির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ, সফরের শুরু থেকেই তিনি কার্যত কোনো পাবলিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাননি।

তবে এর মধ্যেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে এবং প্রশাসনিকভাবে তার ভিসা বাতিল করা হয়।

ভিসা বাতিল: কী অভিযোগ উঠেছে

মিজানুর রহমান আজহারীর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, তিনি অতীতে হিটলারের প্রশংসা করেছেন এবং ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়েছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই অস্ট্রেলিয়ার সরকার তার ভিসা বাতিল করেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার ভিসা বাতিলের বিষয়টি তিনি নিজেও বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন। এবং দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

অস্ট্রেলিয়ান সিনেটর জনাথন ডুনিয়াম তাদের দেশটির পার্লামেন্টে বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, কমিউনিটি গ্রুপগুলোর পক্ষ থেকে আজহারীর উপস্থিতি সম্পর্কে আগেই সিনেটরদের সতর্ক করা হয়েছিল।

পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায়, মিজানুর রহমান আজহারীকে 'ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রদানকারী প্রচারক' হিসেবে উল্লেখ করে অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টির সমালোচনা করে প্রশ্ন তোলেন যে, কীভাবে এমন একজন ব্যক্তিকে ভিসা দেওয়া হলো?

তার মতে, শুরুতেই মিজানুর রহমান আজহারীকে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল না এবং তাকে প্রথম ফ্লাইটেই দেশে ফেরত পাঠানো উচিত ছিল।

'পুরোনো ভিডিও' নিয়ে বিতর্ক

অস্ট্রেলিয়ার ভিসা বাতিলের কারণ হিসেবে আনা অভিযোগের জবাবে মিজানুর রহমান আজহারী দাবি করেন, পুরো ঘটনাটি একটি বহু বছর আগের বক্তব্যের খণ্ডিত ভিডিওকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "যে ভিডিওটির কথা বলা হচ্ছে, সেটি প্রায় ১৩ বছরের পুরোনো। তখন আমার বয়সও অনেক কম ছিল।"

তার ভাষ্যমতে, ওই ভিডিওটি মূল বক্তব্যের প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে (cropped version) উপস্থাপন করা হয়েছে, যা প্রকৃত অর্থ বিকৃত করেছে।

তিনি আরও জানান, এই একই ভিডিওর সূত্র ধরে অতীতে যুক্তরাজ্যেও তার প্রবেশে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ, এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়; বরং পুরোনো একটি বিতর্কের পুনরাবৃত্তি।

যা জানালেন মিজানুর রহমান আজহারী

মিজানুর রহমান আজহারীর মতে, গণমাধ্যমে এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে যেন তিনি অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে নতুন করে কোনো বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন, যা তথ্যগতভাবে সঠিক নয়।

তিনি বলেন, একটি পক্ষ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট করার পরই প্রশাসনিকভাবে ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তাকে 'অ্যান্টি-সেমিটিক' বা ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টাকে সম্পূর্ণ ভুল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "ইহুদি বা খ্রিস্টানদের প্রতি আমাদের কেন বিদ্বেষ থাকবে? মানবতার দিক থেকে তারা আমাদের ভাই।"

মিজানুর রহমান আজহারী দাবি করেন, তার বক্তব্য সবসময়ই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং মানবিক মর্যাদার পক্ষে ছিল।

বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার বিষয়েও তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা ও উপাসনালয়ের সুরক্ষার বিষয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছেন।

মিজানুর রহমান আজহারী তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, তার প্রতিবাদ মূলত কোনো ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, বরং নিপীড়ন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, নিউ ইয়র্ক বা ওয়াশিংটন ডিসিতে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে বিক্ষোভে অনেক ইহুদি ধর্মীয় পণ্ডিত (Rabbis) এবং খ্রিস্টানরাও অংশ নিয়েছেন।

তার মতে, যারা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ান, তারা কখনোই শত্রু হতে পারেন না বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

তিনি আরও বলেন, যদি ইহুদিদের ওপর কিংবা অস্ট্রেলিয়ার ওপরও কোনো অন্যায় আক্রমণ হয়, তিনি সেটির বিরুদ্ধেও কথা বলবেন।

ভিসা বাতিলে 'স্বার্থান্বেষী মহল' এর দিকে ইঙ্গিত

নিজের ভিসা বাতিলের পেছনে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে বলেও দাবি করেন মিজানুর রহমান আজহারী। তার অভিযোগ, একটি মহল পরিকল্পিতভাবে নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।

এর আগে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও তিনি একই ধরনের অভিযোগ তুলে ধরেন।

সেখানে তিনি লিখেন, "কিছু নির্দিষ্ট স্বার্থান্বেষী মহল ও নাস্তিক্যবাদী পক্ষ পরিকল্পিতভাবে একজোট হয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেছে।"