সুইডেনে কীভাবে 'কিংমেকার' হয়ে উঠলো সাবেক নব্যনাৎসী দল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রোববারের ভোটের পর সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতারত এসডি নেতা জিমি একেসন

সুইডেনে রোববারের নির্বাচনে যে ফলাফল হয়েছে তাতে এই প্রথমবারের মতো দেশটিতে একটি উগ্র ডানপন্থী ও সাবেক নব্যনাৎসী দল ক্ষমতার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।

সবশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুইডেন ডেমোক্র্যাটস বা এসডি পার্টি ভোট পেয়েছে ২০.৬ শতাংশ অর্থাৎ সুইডেনের প্রতি পাঁচজনের একজন তাদের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এটি একটি উগ্র অভিবাসনবিরোধী জাতীয়তাবাদী দল।

এর ফলে পার্লামেন্টে সামগ্রিকভাবে ডানপন্থী দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেছে এবং এসডি হচ্ছে তাদের মধ্যে বৃহত্তম।

এটি এখন সুইডেনের দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল, এবং সুইডিশ পার্লামেন্টে তাদের ৭৩ জন এমপি থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।

তারা যদি সরাসরি সরকারে যোগ না-ও দেয়, তাহলেও "কিং মেকার" হিসেবে একটি ডানপন্থী কোয়ালিশনকে সমর্থন দেবার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে তারা।

সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী ম্যাগডালেনা অ্যান্ডারসন নির্বাচনের পরাজয়ের পর ইতোমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন।

কেন এমন হলো

এসডি'র প্রধান নির্বাচনী এজেণ্ডাগুলো ছিল অভিবাসন এবং সহিংস অপরাধকে কেন্দ্র করে।

সুইডেনের জাতীয় অপরাধ দমন কাউন্সিলের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ইউরোপের অন্য যে কোন দেশের তুলনায় সুইডেনে বন্দুক-সংশ্লিষ্ট অপরাধ বেশি দ্রুতগতিতে বাড়ছে।

এ বছর এ পর্যন্ত দেশটিতে গুলিতে নিহত হয়েছে ৪৭ জন, যা পুরো ২০২১ সালে মোট নিহতের চেয়েও বেশি।

বিবিসি বাংলায় সম্পর্কিত খবর:

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নির্বাচনের ফল জানার পর এসডি সমর্থকদের উল্লাস

অপরাধবিজ্ঞানী নিকোই ডিয়ানে এ জন্য ক্রমবর্ধমান মাদকের বাজার আর অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এলাকাগুলোতে চাকরির অভাবকে দায়ী করছেন।

অভিবাসীর সংখ্যা বেশি এমন এলাকায় সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাগুলোর অধিকাংশ ঘটার ফলে দেশটিতে অভিবাসনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক।

সুইডেনের রাজনীতিবিজ্ঞানী গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়োহান মার্টিনসন বলছেন, অভিবাসন প্রশ্নটি অনেকদিন ধরেই সুইডেনের রাজনীতিতে একটি বড় ইস্যু হয়ে উঠছিল।

তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে সুইডেনে যে পরিমাণ লোক রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছে তার মাথাপিছু হার বিশ্বে সর্বোচ্চ।

ছবির ক্যাপশান, সুইডেনে সম্প্রতি বন্দুক-সংশ্লিষ্ট অপরাধ বেড়েছে

এ ছাড়া দেশটিতে সহিংস অপরাধও বেড়ে গেছে বলে মনে করা হয়। অনেকের মতে এ দুটি কারণ দিয়েই এসডি-র উত্থানকে ব্যাখ্যা করা যায়।

সুইডেনে এ দুটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে এসডি বছরের পর বছর ধরে প্রচারণা চালিয়ে আসছিল, এবং তাদের একটি বিতর্কিত দাবি ছিল যে 'অভিবাসন ও সহিংস অপরাধ বেড়ে যাওয়া পরস্পর সম্পর্কিত।'

এ নিয়ে প্রচারণা চালিয়েই এসডি ভোটারদের মধ্যে নজর কাড়তে শুরু করে।

সুইডেনের ইতিহাসে নতুন পর্ব?

ইয়োহান মার্টিনসন এসডিকে "উগ্র দক্ষিণপন্থী" না বললেও দলটিকে "অভিবাসন-বিরোধী, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ বিরোধী, জাতীয়তাবাদী দল" হিসেবে বর্ণনা করেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সুইডেনের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ম্যাগডালেনা অ্যান্ডারসন ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন।

তার ভাষায়, এসডি প্রথম পার্লামেন্টে ঢুকেছে মাত্র ২০১০ সালে, এবং সে হিসেবে এবারের নির্বাচনের ফল 'নাটকীয়।'

এই নির্বাচনী ফল সুইডেনের ইতিহাসে এক নতুন "বিভক্তি রেখা" সৃষ্টি করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করছেন।

একটি নব্যনাৎসী আন্দোলন থেকে ১৯৮৮ সালে জন্ম নেয়া এই দলটির বর্তমান নেতা জিমি একেসন দলটির ভেতরে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছেন। তিনি বর্ণবাদ ও উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নেন, ২০১৫ সালে দলটির পুরো যুব সংগঠনকে তিনি সাসপেন্ড করেছিলেন চরম ডানপন্থীদের সাথে যোগাযোগের অভিযোগে।

ভিডিওর ক্যাপশান, সুইডেন নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পর অভিবাসী অধ্যুষিত মালমো শহরের দিকে এক নজর

তাদের দলীয় প্রতীকে আগে যে আগুনের শিখা ছিল, তা বাদ দিয়ে নিরীহ চেহারার ফুল যোগ করা হয়েছে। বাদ দেয়া হয়েছে "সুইডেনকে সুইডিশ রাখার" শ্লোগান।

কিন্তু এসব ঘষামাজার পরও দলটি যে সুইডেনের সংখ্যালঘুদের প্রতি হুমকি এমন অভিযোগ পুরোপুরি মুছে যায়নি। সামাজিক মাধ্যমে দলটির সদস্যদের নানা পোস্ট এই দলটিকে বারবার সমস্যায় ফেলেছে।

এ দলটি এখন তাদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ স্বীকার করে না।

দলটির যুব সংগঠন ইয়াং সুইডসের একজন নেতা এমিল এনেব্ল্যাড বিবিসিকে বলেন, এসব অভিযোগ তার জন্মের আগের কথা।

তার দাবি, তরুণদের মধ্যে তার দলের সমর্থন বেড়েছে, কারণ তারা নিরাপত্তা, চাকরি ও অভিবাসনের ওপর জোর দিচ্ছেন।

বিবিসি বাংলায় আজকের আরো খবর: