শেখ হাসিনার পক্ষে ট্রাইবুনালে চিঠি পাঠানোর দাবি

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
    • Author, সজল দাস
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৪ মিনিট

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার আইনজীবীর মাধ্যমে ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। সেই চিঠিতে তার বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে।

যুক্তরাজ্য ভিত্তিক ল ফার্ম কিংসলি ন্যাপলি গত ৩০শে মার্চ এই চিঠি পাঠিয়েছে বলে দাবি করেছে আওয়ামী লীগ। দলটির কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ আলী আরাফাত বিবিসি বাংলাকে আইনজীবীর মাধ্যমে এই চিঠি পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, শেখ হাসিনা বিদেশি আইনজীবীর মাধ্যমে এই প্রথম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিঠি পাঠালেন।

এই চিঠিতে বলা হয়েছে,আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে যেভাবে বিচার করা হয়েছে, তাতে "আন্তর্জাতিক আইন এবং ন্যায্য বিচারের মৌলিক মানদণ্ড" লঙ্ঘন হয়েছে।

জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এই বিচার প্রক্রিয়া এবং রায়কে, অবৈধ ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে ওই চিঠিতে।

যদিও এই চিঠি পাওয়ার বিষয়টি এখনও নিশ্চিত করেনি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।

আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চিঠি না পেলেও এ বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে জানতে পেরেছেন বলে দাবি করেছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "শেখ হাসিনার পক্ষে লেখা চিঠিতে ট্রাইবুনালকে বিতর্কিত করা বা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আমরা অফিসিয়ালি চিঠিটা পেলে আমাদের মতামত জানাবো।"

এদিকে, বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে এই ধরণের চিঠির কার্যকারিতা কতটা, সে ব্যাপারে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জোতির্ময় বড়ুয়া বিবিসিকে বলেন, সঠিক বিচার হয়নি, বিচার প্রক্রিয়ায় সমস্যা রয়েছে বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে মনে করলে, এমন চিঠি যে কেউ পাঠাতেই পারেন।

"কিন্তু বিচার নিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে হলে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই করতে হবে। এক্ষেত্রে আপিলের সুযোগ রয়েছে। তবে পলাতক থাকা অবস্থায় আপিলের কোনো সুযোগ নেই," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. বড়ুয়া।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

ছবির উৎস, BBC/MUKIMUL AHSAN

ছবির ক্যাপশান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

চিঠিতে যা বলা হয়েছে

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে ট্রাইব্যুনাল বরাবর লন্ডনের আইনি প্রতিষ্ঠান কিংসলি ন্যাপলির পাঠানো এই চিঠি দশ পৃষ্ঠার।

চিঠিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

ই-মেইল এর মাধ্যমে পাঠানো ওই চিঠিতে, শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়াকে 'অবৈধ' এবং 'আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি' বলে দাবি করা হয়েছে।

তারা বলছে, আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার করা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থি।

চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে ন্যায্য বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে।

এছাড়া, প্রসিকিউশন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বলেও অভিযোগ করা হয়েছে ওই চিঠিতে।

বিশেষ করে সাবেক প্রধান প্রসিকিউটরের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েই উদ্বেগ জানানো হয়েছে ওই চিঠিতে।

এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের ঘটনাবলিকে আইসিটির আওতায় নেওয়ার বিষয়কে আইনের 'ভূতাপেক্ষ প্রয়োগ' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এসব অভিযোগ সাধারণ ফৌজদারি আদালতেই বিচার হওয়া উচিত ছিল বলেও মনে করে ল' ফার্মটি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে তা 'সামারি এক্সিকিউশন' বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে গণ্য হতে পারে।

বিচার বাতিল ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের পাশাপাশি আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানানো হয়েছে।

ট্রাইবুনালকে ১৪ দিনের মধ্যে এই চিঠির জবাব দেওয়ার অনুরোধও জানিয়েছে ব্রিটিশ এই ল' ফার্মটি।

শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয় ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয় ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট

চিঠির গুরুত্ব কতটা?

শেখ হাসিনার পক্ষে যুক্তরাজ্যের ল ফার্মের এই চিঠি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এই চিঠির আইনি গুরুত্ব নিয়েও পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত আসছে।

যদিও এই চিঠির কোনো আইনি ভিত্তি নেই বলেই মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।

তার মতে, আন্তর্জাতিক আইন কিংবা দেশীয় আইন- উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো 'পলাতক ব্যক্তির কোনো আইনি অধিকার নেই'। আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত আপিল বা কোনো আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকে না।

"আপনি আইনের কাছ থেকে পালিয়ে থাকবেন কিন্তু আপিল করার চেষ্টা করবেন, সেই সুযোগ নেই," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

এছাড়া কোনো ল' ফার্ম বা মানবাধিকার সংস্থা তাদের পর্যবেক্ষণ জানাতেই পারে, কিন্তু ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে এর জবাব দেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই বলেও জানান মি. বড়ুয়া।

"একজন পর্যবেক্ষক যদি মনে করে যে বিচারের ক্ষেত্রে কাউকে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়নি, এটি বলাতে তো কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু এখানে লিগাল ইমপ্লিকেশনের কিছু নেই," বলেন তিনি।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার চ্যালেঞ্জ করতে হলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করতে হবে, যা পলাতক অবস্থায় সম্ভব নয়।

মি. বড়ুয়ার মতে, "কেউ যদি মনে করে যে সঠিক বিচার পায়নি, বিচার প্রক্রিয়ায় সমস্যা ছিল, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি- তাহলে অভিযুক্ত বা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অবশ্যই আইনী প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে হবে।"

গত ১৭ই নভেম্বর শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
ছবির ক্যাপশান, গত বছরের ১৭ই নভেম্বর শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায়

২০২৫ এর নভেম্বরে শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

৪৫২ পৃষ্ঠার ওই রায়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে বলে জানানো হয়।

যার এক নম্বর অভিযোগে 'সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি' প্রমাণিত হওয়ায় তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয় আদালত।

এছাড়া তিনটি পৃথক অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে হেলিকপ্টার ও ড্রোন থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ, চাঁনখারপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং আশুলিয়ায় পুড়িয়ে হত্যার মতো অভিযোগ রয়েছে।

রায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ জব্দের নির্দেশও দেয় আদালত। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ প্রদান করা হয়।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়।

পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় প্রথম মামলা হয়।

২০২৪ সালের ১৭ই অক্টোবর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে প্রথম বিচার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। ওইদিনই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এ মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল।