নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী আয়শা খানম মারা গেছেন

ছবির উৎস, Bangladesh Mahila Parishad

ছবির ক্যাপশান, নারীর অধিকার আন্দোলনে কাজ করে গেছেন আয়েশা খানম

বাংলাদেশে নারী অধিকার আন্দোলনের প্রথম সারির নেতৃত্বে থাকা আয়েশা খানম মারা গেছেন।

শনিবার ভোরে ঢাকার নিজ বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে বেসরকারি বিআরবি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আয়েশা খানমের বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে মানবাধিকার এবং নারী অধিকার আন্দোলনের সংশ্লিষ্টদের মাঝে।

তিনি আমৃত্যু বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্র জীবন শেষে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বঞ্চিত, নিপীড়িত নারীদের অধিকার আদায়ে কাজ করে গেছেন।

তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা।

আয়েশা খানম ১৯৪৭ সালের ১৮ অক্টোবর নেত্রকোনার গাবড়াগাতি গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন।

স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালীন আয়েশা খানম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং নানা আন্দোলনে সোচ্চার ভূমিকায়। ১৯৬৯-৭০ এর দিকে সমাজবিজ্ঞানে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।

থাকতেন রোকেয়া হলে এবং তিনি ওই হলের ছাত্র সংসদের সহ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতিরও দায়িত্ব পালন করতেন।

ছবির উৎস, Bangladesh Mahila Parishad

ছবির ক্যাপশান, আয়েশা খানমের মরদেহ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কিছু সময় রাখা হয়।

১৯৬২ সালে পাকিস্তান আমলে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বাতিলের দাবিতে যে ছাত্র আন্দোলন হয়েছিল, সেখানে যুক্ত ছিলেন আয়েশা খানম।

এছাড়া ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধসহ, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, মানবাধিকার ও প্রগতিশীল সব আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক ছিলেন তিনি।

ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বক্তৃতা দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়ে তিনি ঢাকার শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করার পেছনে ভূমিকা রেখেছেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনের শিকার নারীদের পুনর্বাসন এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় তিনি দীর্ঘ জীবন কাজ করে গেছেন৷

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এবং ছাত্রজীবন শেষে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ শুরু করেন আয়েশা খানম।

১৯৭২ সালে তিনি মহিলা পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যুক্ত হন।

২০০৮ সাল থেকে তিনি সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

২০০২ সাল থেকে ৬৮টি সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির সেক্রেটারিয়েটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।

এরমধ্যে নারী অধিকার আদায়ে তার ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়।

ছবির উৎস, Bangladesh Mohila Parishad

ছবির ক্যাপশান, আয়শা খানম

তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের এক অকৃত্রিম অভিভাবককে হারাল বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, আইন সংস্কার আন্দোলন, সিডও বাস্তবায়নসহ নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

বাংলাদেশের সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন প্রশ্নে তিনি শুরু থেকেই সোচ্চার ছিলেন।

বৈশ্বিক নারী আন্দোলনেও ছিল তার শক্ত অবস্থান। ১৯৯২ সালে ভিয়েনার মানবাধিকার সম্মেলন এবং ১৯৯৫ সালে বেইজিং এর বিশ্ব নারী সম্মেলনে তিনি অংশ নেন।

এছাড়া ২০১১ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত সিডও কমিটির এবং কমিশন অন দ্য স্ট্যাটাস অব উইমেন-এর বিভিন্ন অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেছেন।

নারী ইস্যুতে পত্র পত্রিকায় লেখালেখিও করতেন তিনি।

আরও পড়তে পারেন:

আয়েশা খানমের মরদেহ আজ সকাল নয়টায় ঢাকার সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেওয়া হয়।

সেখানে মহিলা পরিষদের সদস্যরা তাঁর প্রতি শোক ও শ্রদ্ধা জানান।

তাকে নিজ গ্রাম নেত্রকোনায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার কথা রয়েছে।