করোনাভাইরাস: বিশ্ব মহামারির কালে জন্ম, মৃত্যু এবং বিয়ে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কারফিউ এর সময় পুলিশের গুলিতে ১৩ বছরের ছেলে নিহত হওয়ার পর পরিবারের শোক।

করোনাভাইরাস আর সবার মতো পাল্টে দিয়েছে কেনিয়ানদের জীবন, জন্ম থেকে শুরু করে বিয়ে, মৃত্যু- সব কিছু। কেনিয়ার সাংবাদিক জোসেফ ওয়ারুংগু শুনিয়েছেন সেই কাহিনি:

নাইরোবির এক হাসপাতালে সন্তান জন্ম দিতে এসেছেন এক নারী। ৩২ সপ্তাহের অন্তসত্ত্বা। ডা. শীলা আটিয়েনোকে* সার্বক্ষণিক নজর রাখতে হচ্ছে তার ওপর। এরকম কাজ তিনি এর আগেও বহুবার করেছেন। কিন্তু এবারের শিশু জন্ম নেয়ার ঘটনাটি ঘটছে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে।

সরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসা এই নারীকে করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করা হয়েছিল। পরীক্ষায় দেখা গেছে তিনি কোভিড-নাইনটিনে আক্রান্ত। কাজেই আর দশটি স্বাভাবিক সন্তান জন্মদানের ঘটনা এটি নয়।

ডা. আটিয়েনো একজন ধাত্রীবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। তার সঙ্গে আছেন আরও কয়েকজন ডাক্তার। যেসব গর্ভবতী নারীর করোনাভাইরাসের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তাদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব এই দলটির ওপর।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, করোনাভাইরাসের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মীরাও।

খুবই নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে ডা. আটিয়েনোর জীবন। তিনি নিজেও দুই শিশু সন্তানের মা, দুজনের বয়সই দুই এর নীচে।

তিনি আমাকে বলছিলেন, “আমি এমন সব গর্ভবতী মায়েদের দেখাশোনা করছি যারা এই ভাইরাসে আক্রান্ত, খুবই কঠিন মনে হয় ব্যাপারটা।”

“আমাকে এখনই কোন রোগীর সিজারিয়ান সেকশন করতে হবে। এর মানে হচ্ছে রোগীর দেহের অনেক রক্ত এবং বডি ফ্লুইডের সংস্পর্শে আসতে হবে আমাকে। অপারেশন করার সময় আমার শরীর যদিও ঢাকা থাকবে খুবই সুরক্ষিত স্যুটে। এই স্যুটটি পরলে বেশ গরম লাগে, আর মোটেও আরামদায়ক নয়।”

“আর যখন আমি বাড়ি ফিরে যাই, বাচ্চারা দৌড়ে আসবে আমার কোলে উঠার জন্য। কিন্তু কাপড়-চোপড় বদলে, গোসল করে, স্যানিটাইজার মেখে পরিচ্ছন্ন না হওয়া পর্যন্ত আমি ওদের ছুঁতে পারি না।”

“মানসিকভাবে, আবেগের দিক থেকে, এটা বেশ কঠিন। কিন্তু আমার তো কোন উপায় নেই- নতুন শিশুকে এই পৃথিবীতে নিয়ে আসা, সেটাই আমার কাজ। সেটা পৃথিবীতে মহামারি থাকুক আর না থাকুক।”

ছবির উৎস, FRANCIS GITONGA

ছবির ক্যাপশান, গির্জায় মাত্র ছয়জনকে নিয়ে ফ্রান্সিস আর ভেরোনিকার বিয়ে

নববিবাহিত দম্পতি

তরুণ দম্পতি ফ্রান্সিস এবং ভেরোনিকা গিটোংগা হানিমুনে এসেছেন নিয়াহুরুরু এলাকায় তাদের গ্রামের বাড়িতে। নাইরোবি থেকে জায়গাটা প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে।

তারা তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান করেছেন গত ৫ই এপ্রিল। প্রায় ৫০০ জনকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু যখন শেষ পর্যন্ত তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানটি হলো, গির্জায় ঢুকতে দেয়া হয়েছিল মাত্র ৬ জনকে। বর, কনে, এক দম্পতি এবং দুজন যাজক। আর কেউ বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার অনুমতি পাননি- না তাদের বাবা-মা, পরিবার, না কোন বন্ধু-বান্ধব, গ্রামবাসী।

কোভিড-নাইনটিনের কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য যেসব বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে, তাতে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারছেন না বহু মানুষ। এই দম্পতি যখন বাড়িতে একটা বিয়ের অনুষ্ঠান করলেন, সেখানে যেতে পেরেছিলেন মাত্র ১২ জন।

সব কিছু স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান স্থগিত রাখতে পারতেন। কিন্তু তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, এর মধ্যেই বিয়ে করবেন।

আমি তাদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, এটি নিয়ে তাদের কোন দুঃখ আছে কীনা যে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব তাদের অনুষ্ঠানে আসতে পারলেন না।

“না, আমাএদর কোন দুঃখ নেই”, বললেন মিস্টার গিটংগা, যিনি নিয়াহুরুরুর গির্জায় কাজ করেন।

‍‍“আমাদের মনে হচ্ছিল ঈশ্বর যেন আমাদের বলছেন, বিয়েটা করে ফেলতে। আমি আর ভেরোনিকা তো একে অন্যকে গভীরভাবে ভালোবাসি। গির্জায় ঈশ্বরের সামনে আমরা দুজন এক সঙ্গে জীবন বাঁধবো, সেটাই তো আমরা সবসময় চেয়েছি।”

মিস্টার গিটংগা আমাকে বললেন, কোভিড-নাইনটিন কেবল তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাই বদলে দেয়নি, কিছু অপ্রত্যাশিত সুফলও এনেছে।

“বিয়ের অনুষ্ঠান করতে আমাদের খরচ করতে হতো প্রায় তিন লাখ কেনিয়ান শিলিং (২৮০০ ডলার)। কিন্তু অতিথিরা না আসায়, খাবারের খরচ এবং হল ভাড়ার খরচ বেঁচে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত মাত্র ৫০ হাজার শিলিং খরচ হয়েছিল।”

“এখন আমরা কেনিয়ার নানা জায়গা থেকে অনেক ফোন কল পাচ্ছি তরুণদের কাছ থেকে। আমরা যে ধুমধাম করে বিয়ে করে অনেক ধার-দেনায় পড়িনি, এরকম জাঁকজমকহীনভাবে বিয়ে করলাম, সেটা নাকি তাদের অনুপ্রাণিত করেছে।”

এক বিশ্ব মহামারীর মাঝখানে মিস্টার এবং মিসেস গিটংগার এই বিয়ে আসলেই একটি সত্যিকারের ভালোবাসার কাহিনি। কেনিয়ার এক ‘নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতি‌’তে এরকম ছোট্ট, অন্তরঙ্গ এবং কম খরচের বিয়েই হয়তো আমরা দেখবো।

একটি শোকার্ত পরিবার

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সরকার যখন সন্ধ্যার পর কারফিউ জারি করেছিল, তখন ১৩ বছরের এক বালক ইয়াসিন হোসেইনকে গুলি করে হত্যা করেছিল পুলিশ।

এরকম ঘটনার শিকার ইয়াসিন একা হয়নি। দেশজুড়ে পুলিশ কঠোর হাতে যখন এই কারফিউ জারি করেছে, তখন তাদের মার খেয়ে হাত-পা ভেঙ্গেছে বহু মানুষের, গুরুতর আহত হয়েছেন অনেকে। কেনিয়ার এই পুলিশ বাহিনীর শ্লোগান আবার “সবার সেবায় নিয়োজিত।”

কোভিড-নাইনটিন যেন রাষ্ট্রের মদতে নতুন বর্বরতার দরোজা খুলে দিল।

ইয়াসিনের বাবা হোসেইন মোয়োর কন্ঠে ঝরে পড়লো কেনিয়ার বহু মানুষের ক্ষোভ। তার ছেলের জানাজায় তিনি বলেছিলেন, ‍“দিনের বেলায় আমাদের ভাইরাসের ভয়ে থাকতে হয়, আর রাতের বেলায় থাকতে হয় পুলিশের সন্ত্রাসের ভয়ে।”

ছবির ক্যাপশান, ইয়াসিনের কবরের পাশে প্রার্থনা করছে তার বন্ধুরা এবং আত্মীয়-স্বজন

কেনিয়ার বেশিরভাগ মানুষ কাজ করেন অর্থনীতির অনানুষ্ঠানিক খাতে, তাদের আয়-রোজগার খুবই সামান্য। রেডিও-টেলিভিশনে এখন শোনা যায় তারা এখন এক সঙ্গে তিন শত্রুর মোকাবেলা করছেন- করোনাভাইরাস, ক্ষুধা আর পুলিশ।

বিদ্রুপের শিকার এক রাজনীতিক

জেমস ওরেংগো এক সুপরিচিত রাজনীতিক। বিরোধী দল অরেঞ্জ ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট থেকে নির্বাচিত একজন সেনেটর। কেনিয়ার সাধারণ মানুষের মনোভাব তিনি ভালোই আঁচ করতে পারেন। তিনি একজন আইনজীবীও।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে সেনেটের এক অধিবেশনে তিনি খারাপ আইন পাশ করার বিপদ সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন। ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন তারা যেন নিজেদের বেশি নিরাপদ না ভাবেন।

“অনেক সময় কিন্তু বিপ্লবের সন্তানরাই এর শিকার হন…সরকার নিজেই তাদের নিজেদের লোকজনকে ধ্বংস করে। আমি আপনাদের সতর্ক করে দিচ্ছি, এই সরকার কিন্তু আমাকে যতটা না শাস্তি দেবে, তার চেয়ে আপনারা বেশি শাস্তি পাবেন, আমি আপনাদের বলে রাখছি। আর এক বছর পর আপনারা আমার অফিসে এসে আমার কাছে কান্নাকাটি করবেন, যাতে আমি আপনাদের প্রতিনিধিত্ব করি।”

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জেমস ওরেঙ্গো দেশটির বিরোধীদলের জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ।

কেনিয়ায় তার এই কথাটি এখন হরহামেশাই উল্লেখ করেন লোকজন।

কিন্তু কিছুদিন আগে মিস্টার ওরেংগো যখন একটি টুইট করেন, তখন তিনি জনগণের মনোভাব বুঝতে ভুল করেছিলেন। তিনি টুইটে লিখেছিলেন, ‍“নিজে গাড়ি চালিয়ে পার্লামেন্টে গিয়েছিলাম কোভিড-নাইনটিন টেস্ট করাতে। এই বিশ্ব মহামারি মোকাবেলায় নির্দেশনা মেনে চলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

তার এই টুইটের যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হলো, তা মারাত্মক।

কেনিয়ার একজন ক্রুদ্ধ হয়ে পাল্টা টুইট করলেন, “আমরা সাধারণ মানুষ তাহলে কোথায় যাব? রাজনীতিকরা তাহলে সত্যিই মনে করেন নিজে গাড়ি চালানো বিরাট এক বাহাদুরি? এই দেশের হয়েছেটা কী”?

কোভিড-নাইনটিন সংকটের পর গণমাধ্যমে যে রাজনীতিকদের আর অতটা দেখা যাচ্ছে না, সেটা যেন কেনিয়ার মানুষ বেশ উপভোগ করছেন।

কেনিয়ার গণমাধ্যম যেন একটা অলিখিত নিয়ম মেনে চলছে- রাজনীতিকদের আপাতত নিউজ এজেন্ডার বাইরে রাখো যদি না তারা মেডিক্যাল বা প্রাসঙ্গিক কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে এই সংকট নিয়ে কথা বলেন।

রাজনীতিকরা নিশ্চয়ই দুঃশ্চিন্তায় আছেন- তাদের ছাড়া জীবনে যদি কেনিয়ানরা অভ্যস্ত হয়ে যায় তখন কি হবে?

সৌভাগ্যবান বন্দী

কোভিড-নাইনটিনের কারণে কেনিয়ায় এখন অনেক বিচার কাজ ডিজিটাল হয়ে গেছে। ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের নির্দেশ জারি করছেন ভিডিও লিংকে।

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, বিশ্বজুড়ে গভর্নররা দুঃশ্চিন্তায় রয়েছেন এই ভেবে যে, বন্দীদের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে কিনা।

সুপারমার্কেট থেক বাইবেল চুরির অভিযোগ আনা হয়েছিল এমন একজন এর সুবিধাভোগী।

পুলিশ কাস্টডিতে থাকা লোকটি ভিডিও লিংকে ম্যাজিস্ট্রেটের কথা শুনছিলেন। যখন শুনলেন, বিচারক কোন বন্ড ছাড়াই তাকে জামিন দিয়েছেন এবং বিচার চলাকালীন সময়ে তাকে বন্দী থাকতে হবে না, তখন তিনি বেশ খুশি।

কোভিড-নাইনটিন মোকাবেলায় সরকার কারাগারগুলোতে চাপ কমাতে চাইছে। প্রায় ৪ হাজার ৮শ মানুষকে এর মধ্যেই মুক্তি দেয়া হয়েছে।

বাইবেল চুরির মামলা হয়েছে যার বিরুদ্ধে, তিনি নিশ্চয়ই এখন অন্য কেনিয়ানদের সঙ্গে প্রার্থনায় যোগ দেবেন– ঈশ্বর যেন কোভিড-নাইনটিনের মহামারি থেকে তাদের রক্ষা করে।

জীবন যে আর আগের মতো থাকবে না, এটা একদম পরিস্কার।

*এই ডাক্তারের আসল নাম ব্যবহার করা হয়নি, কারণ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি তার নেই।