ইয়াসির আলী রাব্বি: বাংলাদেশের যে ক্রিকেটার খেলার চাইতে না খেলার জন্য বেশি আলোচিত
ছবির উৎস, Getty Images
- Author, রায়হান মাসুদ
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ইয়াসির আলী রাব্বি প্রথম জাতীয় দলে খেলার জন্য ডাক পান প্রায় তিন বছর আগে। অথচ চট্টগ্রামের এই ক্রিকেটার আয়ারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবুয়ে ঘুরে এসেও গত বছরের নভেম্বর মাস পর্যন্ত কোনওবার জাতীয় দলের হয়ে মাঠে খেলতে পারেননি।
শেষ পর্যন্ত নিজ শহর চট্টগ্রামের মাটিতেই ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে প্রথমবার বাংলাদেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন পাকিস্তানের বিপক্ষে। কিন্তু এখানেও বিধিবাম। পুরো ম্যাচ খেলা হয়ে ওঠেনি তার চোটের কারণে।
মাথায় বল লাগার কারণে মাঠের বাইরে চলে যেতে হয় তাকে। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত তার দৃঢ়তা ছিল চোখে পড়ার মতো, যে দলের ৪৯ রানের মাথায় চার জন বাংলাদেশি টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান আউট হয়ে সাজঘরে ফিরে গিয়েছিলেন ইয়াসির আলি টিকেছিলেন ৭২ বল, করেছিলেন ৩৬ রান, ধারাভাষ্যকাররা যখন তাকে নিয়ে আশা দেখা শুরু করেন তখনই ২০২১ সালের বর্ষসেরা ক্রিকেটার শাহীন শাহ আফ্রিদির বল মাথায় লাগে রাব্বির, এবং তিনি মাঠ ছাড়েন, নামতে হয় বদলি ক্রিকেটারকে।
এরপর সদ্যই নিউজিল্যান্ডের মাটিতে বাংলাদেশ দলের একমাত্র টেস্ট সিরিজ ড্র, একমাত্র টেস্ট ম্যাচ জয়ের সাক্ষী হয়েছেন ইয়াসির আলী রাব্বি, এক মাস আগেই। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতকও তুলে নেন তিনি।
ছোট আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত বলার মতো বিষয় এটাই যে ইয়াসির আলী রাব্বি দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের ড্রেসিংরুমে, একেক সময় একেক দেশে, একেক ফরম্যাটে তিনি কেবলই অপেক্ষা করেছেন জাতীয় দলের হয়ে খেলার।
কিন্তু তিনি হতাশ হননি কিংবা হতাশা প্রকাশ করেননি।
সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদদের সাথে সাজঘর শেয়ার করতে পেরে নিজের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন এর আগেও।
বিবিসি বাংলাকে রাব্বি বলেন কেবল পারফর্ম করে যাওয়াই তার কাজ। বাকিটা নির্ভর করে ম্যানেজমেন্টের ওপর।
রাব্বির মতে, "আমি যেখানে আছি বা ছিলাম সেখানে আসা তো অনেক ক্রিকেটারের স্বপ্ন। কয়জন ক্রিকেটার একটা দেশের সর্বোচ্চ লেভেলে সুযোগ পান?"
এই ধরনের ক্রিকেটার যারা দীর্ঘ সময় স্কোয়াডে থেকেও একাদশে সুযোগ পাননি এমন তালিকায় অবশ্য ইয়াসির আলী রাব্বি বেশ সফল সঙ্গী খুঁজে পাবেন, তবে তারা সবাই ছিলেন বিশ্বের সফলতম ক্রিকেট দলগুলোর সফলতম স্কোয়াডে- যেমন স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল, দীর্ঘসময় শেন ওয়ার্নের মানের বোলারের কারণে অস্ট্রেলিয়ার একাদশে সুযোগ পাননি।
পাকিস্তানের ২০০০-১০ সালের মিডল অর্ডারে অনেক সময়ই সুযোগ হতো না মিসবাহ উল হকের, কিন্তু তিনি স্কোয়াডে ছিলেন অনেক সিরিজের।
ছবির উৎস, Bangladesh Cricket Board
সাইদ আজমলও, সাকলাইন মোশতাকের মতো বোলারের সব ফরম্যাটে, সব দেশে সফলতার কারণে দীর্ঘদিন একাদশের বাইরে সময় কাটিয়েছেন।
রাব্বির কথায় সত্যতা রয়েছে ঠিক, তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ ফরম্যাটের ক্রিকেটে পারফর্ম করেও দলে সুযোগ না পাওয়াটা অবাকই করে।
যেখানে দলগতভাবেই টেস্ট ক্রিকেটে ২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সালের শেষ পর্যন্ত টেস্ট ব্যর্থ সময় কাটিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে টানা ১০ ইনিংস ২৫০ রানও স্পর্শ করতে পারেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দল, আফগানিস্তানের সাথে ঘরের মাটিতে টেস্ট হেরেছে, এমনকি ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় সারির দল পাঠিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জিতেছে।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ইয়াসির আলী রাব্বির গড় ৫০ ছুঁইছুঁই। খেলেন মিডল অর্ডারে, কিন্তু কাঙ্খিত ডাক তিনি পেয়েছেন দলে ডাক পাওয়ার একত্রিশ মাস পর।
এবিষয়ে খুব বেশি আক্ষেপ করতে রাজি নন এই ব্যাটসম্যান, তিনি বলেন, আমি এসব নিয়ে খুব বেশি ভাবি না। আমাকে যখন যেখানে যেভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই কাজটাই আমার করার দরকার।
টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে সমান পারদর্শী
টেস্ট ফরম্যাটের ক্রিকেট খেলে নিউজিল্যান্ড থেকে ফিরেই রাব্বি যোগ দিলেন খুলনা টাইগার্সের সাথে, শুরু হলো বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ টি টোয়েন্টি আসর।
চলতি আসরে বাংলাদেশে ব্যাটসম্যানদের মধ্যে যারা বেশি রান সংগ্রাহকদের তালিকায় আছেন তাদের মধ্যে ষষ্ঠ ইয়াসির আলী রাব্বির। খুলনা টাইগার্সের হয়ে খেলা এই ব্যাটসম্যানের বিশেষত্ব হলো বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে চলতি বিপিএলে তার স্কোরিং রেট দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, সর্বোচ্চ স্কোরিং রেট মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের ১৩৯.৫৬ আর রাব্বির ১৩৮.০৫।
রাব্বির প্রথম ডাক পাওয়ার স্মৃতি মনে করিয়ে দিলেন, "আমি যখন প্রথম ডাক পাই তখনও বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে খেলেই আমি সুযোগ পাই।"
২০১৯ সালে জনপ্রিয় ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকিনফোর করা বিপিএলের সেরা একাদশেও জায়গা করে নেন ইয়াসির আলী রাব্বি।
তিনি বাংলাদেশের সেইসব ক্রিকেটারদের মধ্যে একজন যিনি দীর্ঘদিন ধরে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য বিবেচনায় আছেন।
সেখানে তিনি খেলার চেয়ে না খেলার জন্যই বেশি আলোচনায় ছিলেন।
ইয়াসির আলী রাব্বির মতে এই সময়টা তার জন্য আশীবার্দস্বরূপ ছিল।
তার মতে কিছু জায়গায় বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন তিনি, "এক নেইল ম্যাকেঞ্জির মতো কোচের সাথে কাজ করতে পেরেছি, তিনি আমার টেকনিকে অনেক উন্নতি করে দিয়েছেন। একই সাথে ফিটনেসের কথাও বলতেই হবে জাতীয় দলের রাডারে আসার পর ফিটনেস নিয়ে আমার অনেক কাজ হয়েছে।"
"জাতীয় দলের হয়ে কিছু করতে পারা সবসময়ই একটা বড় ব্যাপার। সেখানে টেস্ট কি টি টোয়েন্টি এটা ভাবার সময় থাকে না। যখন যে ফরম্যাট থাকে সেই ফরম্যাট অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নেই। অনুশীলনের সময় কেবল পরে কোন ফরম্যাটে খেলা সেটা ভাবি এবং সে অনুযায়ী অনুশীলন করি।"
তবে তিনি টেস্ট ফরম্যাটটাকেই বেশি পছন্দ করেন বলেছেন বিবিসি বাংলার প্রশ্নের জবাবে।
বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্লেষক সাথিরা জাকির জেসি মনে করেন, ইয়াসির আলী রাব্বির মতো ক্রিকেটাররা ব্যাটিংয়ে গভীরতা নিয়ে আসবে।
"রাব্বি যে পজিশনে খেলেন, সেখান থেকে সামনে আগানো ও বিপর্যয় সামাল দেয়া দুই কাজই হয়"
ফিটনেস নিয়ে বাড়তি কাজ করতে হয়
২০১২ সাল থেকে প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে আছেন ইয়াসির আলী রাব্বি।
সেদিক থেকে দীর্ঘদিন ক্রিকেটের আবহের সাথে তার পরিচয়।
আফগানিস্তানের মোহাম্মদ শেহজাদ কিংবা পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ইনজামাম উল হকের মতো তুলনামূলক ভারি হওয়ায় ইয়াসির আলীকে ফিটনেস নিয়ে বাড়তি কাজ করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, "শুরু থেকেই আসলে কোচরা বলতেন, এটা করতে হবে ওটা করতে হবে। এসবে কখনোই মন খারাপ হয়নি। কারণ এটা তারা আমার ভালোর জন্যই বলতেন। আমার সবসময় মনে হয়েছে ফিটনেস নিয়ে কাজ করাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।"
জাতীয় ক্রিকেট লিগে ইতোমধ্যে নয়টি সেঞ্চুরি করেছেন ইয়াসির আলী, একই সাথে টি টোয়েন্টির ঘরোয়া লিগগুলোতে ৮টি ফিফটি করেছেন তিনি, যেখানে হাঁকিয়েছেন ৫৩টি ছক্কা।
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট