লুকো-ছাপার আড়ালে কলঙ্কময় ইতিহাস
ছবির উৎস, Anadolu Agency
- Author, সাগুফতা শারমীন তানিয়া
- Role, লেখক, লন্ডন
অফিস পার্টির মৌসুম চলছে। আলো জ্বলজ্বলে রেস্তোরাঁ। মাঝে মাঝে মত্ত হাসির কল্লোল। টেবিল ঘিরে সারি সারি নানান জাতের মানুষ। তাদের পরিবার। স্প্যানিশ। আরব। ইতালীয়। ভারতীয়।
এভাবে মোটা দাগে এথনিসিটি ভাগ করলে অবশ্য ভাগশেষ থাকবে। কারণ স্প্যানীয়দের গা থেকে মুরের রক্তের মিশেল আভার মতো ফুটে বের হচ্ছে। আরব কপালের নিচে নাকটা ককেশীয়। ভারতীয়ের গায়ে তুর্কি মেজাজ।
সিল্ক রুটে যে যার সামনে পড়েছে, সবাই যেন ''মেলাবে-মিলিবে দেবে আর নেবে'' করেছে। কেউ থাবা না মেরে কথা কইতে পারে না। কেউ আবার স্পর্শ বাঁচিয়ে চলে। টেবিল ঘিরে যেন এমনি নানান জাতের রক্তের ফোয়ারা টগবগ করছে।
হ্যাপি ক্রিসমাস…হ্যাপি দিওয়ালি
অনর্গল কথা বলছে সবাই। ছোট্টবেলার সেই ছড়ার মতো—''খাবি দাবি কলকলাবি''। আমি চুপচাপ চেহারাগুলো দেখছি। মনে মনে আবোল তাবোল ভাবছি, যেমন— বাঙালি কেন মুখস্থ করাকে আত্মস্থ করা বলে? মনের সাথে যোগ নেই, আত্মার সম্পর্ক নেই এমন কত কিছুই তো আমরা গড়গড়িয়ে বলি।
অবশ্য অন্য জাতের লোকেও বলে। যারা একে অন্যের পরিবারের সদস্যের সাথে পরিচিত নই, তারা পরিচিত হচ্ছি। চেহারার রকম, শরীরের গড়ন আর গায়ের রঙ ভরসা করে অনেকেই আন্দাজে ঢিল মেরে বলছে—"হ্যাপি ক্রিসমাস…হ্যাপি দিওয়ালি"। জিজ্ঞেস করছে—"আচ্ছা তোমাদের বিয়ের সময় কি 'মনসুন ওয়েডিং' সিনেমাটার মতোই বৃষ্টিতে নেচেছিলে?" "হাতিতে করে বর এসেছিল?" "আগুনের চারদিকে ঘুরে ঘুরে বিয়ে করেছিলে?"
ছবির উৎস, NurPhoto
এই লন্ডন শহর সাংস্কৃতিকভাবে মেল্টিং পট, নানান জাতের মানুষের জগাখিচুড়ি। তাই নিয়ে ভারী গর্ব। কিন্তু একে অন্যের রকমসকম জানে না।
ইস্কুল এবং কারিকুলাম ঢালাওভাবে ইংরেজ বিনির্মাণ করে। লালন যাকে বলেছিলেন—গুরুর মনে ইচ্ছা সকলি সমান করে। টিভি-চ্যানেলগুলোও তাই করে। মাঝে মাঝে পাঁচফোড়ন হিসেবে অন্য জাতের মানুষ দেখা যায়, কিন্তু সেই জাতের সাথে ব্রিটিশ জাতের আদি লেনাদেনা এবং যুদ্ধবিগ্রহ সম্পর্কে তেমনটা শোনা যায় না।
রবীন্দ্রনাথ-এর সেলাই পরামর্শ
এসব নিয়ে আজকাল অবশ্য কথা উঠছে। পাঠ্যপুস্তকে ব্রিটিশ উপনিবেশে কী কী ঘটেছিল, তার অনুপস্থিতি নিয়ে বাদ-প্রতিবাদ চলছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন— "জীর্ণবস্ত্রকে ছিদ্রহীন বলিয়া বিশ্বাস করিবার জন্য যতক্ষণ চক্ষু বুজিয়া থাকিব, ততক্ষণ সেলাই করিতে বসিলে কাজে লাগে।" সেলাইয়ের দুই-এক ফোঁড় ইদানীং দেয়া চলছে।
টেবিলে খাবার আসছে ছোট ছোট প্লেটে। টাপাস বলে একে। মূলপর্বে যাবার আগে ছোট ছোট সুরের মুরকি। সবুজ সবুজ ঝালহীন মরিচ ভাজা, তাতে মোটা দানার লবণ ছড়ানো।
আর্টিজান ব্রেড টোস্ট করে তাতে দেয়া টোমাটো-রসুন আর অলিভ অয়েল। ছাগ দুগ্ধের চিজের পুর দিয়ে ভাজা ক্রোকেটা। লাল টুকটুকে স্যামন মাছের ফালি, শসার আচার। পেঁয়াজ-রসুনে ভাজা মুড়োসহ চিংড়িমাছ।
ছবির উৎস, Jeff Greenberg
টেবিলে এসে পড়ছে স্প্যানিশ পদ। রান্নায় জ্বলজ্বল করছে অপরাপর জাতের প্রভাব। গ্রিক, ফিনিশীয়, বাইজেন্টাইন, মুরিশ, ইহুদি, ভূমধ্যসাগরীয়। কলম্বাসের আমদানি—টোমাটো- আলু- পাপরিকা- বেল পেপার। টেবিলে এসে পড়ছে আর উড়ে যাচ্ছে।
দেখা গেল, টাপাস তাপসজনের খাদ্য নয়। টেবিলে অবতীর্ণ হবার সাথে সাথে কেড়ে না খেলে ক্ষুন্নিবৃত্তি দূরে থাক, স্বাদ নেয়ার সুযোগটাও মেলে না।
এই একত্র হয়ে একই পাত থেকে খাদ্য তুলে নেবার সময় যে আবার ফিরবে, তা করোনাকালে অসম্ভব মনে হয়েছিল। এখন তা আবার সম্ভব হচ্ছে, কিন্তু আর কদ্দিন সম্ভব হবে তা কে বলতে পারে!
সোমালিদের এক পাতে খাওয়া
আমার এক সোমালি গণিতবিদ সহকর্মী ছিলেন বছর তিনেক আগে। তিনি বলতেন, প্রকাণ্ড পাতে করে তাঁদের বাড়িতে খাদ্য পরিবেশিত হতো। ছোটবেলা থেকেই তিনি আর তাঁর ভাইবোনরা ওঁত পেতে থাকতেন কত দ্রুত সেই পাতের খাবার মুখে তোলা যায়।
বারোয়ারী পদ্ধতি, তাতে একেকজনের বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। ছিনিয়ে খেতে না জানলে জুটবে না। ওঁর ছেলেমেয়েরা তো আর একান্নবর্তী পরিবারে বড় হয়নি, তাদের অমন কাড়াকাড়ি করে খেতেও হয়নি। তারা বোঝে না, বাবা কেন খেতে বসলে অত তাড়াহুড়ো করে খায়।
বাবা যে বলেছিল মিশরের শাসক ফারাওরা আসলে ছিল সোমালি, ঐরকম পুরু ঠোঁট আর ঐরকম আয়ত চোখে টলমলে চাউনি…তবে বাবা কেন হাভাতের মতো খায়!
ছবির উৎস, Anadolu Agency
শুনে আমরা সব্বাই হাসতাম। গণিতবিদ বন্ধুটিও হাসতেন—বলতেন, "আমাদের দেশের পাশ দিয়ে গেছে মহাসাগরের টুনা লাইন। সেই টুনা খেলে বুঝবে আসল টুনা কী স্বাদের।" ঠিক যেমন করে আমরাও বলি—"চিকেন টিক্কা মাসালা আবার কি! চকবাজারে গেলে বুঝবে পুরান ঢাকার বাবুর্চির হাতের আসল চিকেন টিক্কা কী বস্তু।"
আসল আর আসল নেই, এতদূর আসতে আসতে কত মিশেল এসেছে!
লুটেরার ইতিহাস, উপনিবেশে দুর্ভিক্ষ
মনে পড়ে গেল একদিনের স্মৃতি। এক ইস্ট ইউরোপীয়কে তামিল পাড়ার বাঙালি দোকানদার সহজ করে পাটিসাপটা পিঠা চেনাচ্ছে- "রোটি ইনসাইড ফিন্নি, ইউ নো...দোসা অ্যান্ড ইনসাইড ফিরনি।"
যা বলছিলাম, টেবিলে এক সাথে খাবার খাওয়ার সময় ইতিহাস বড় ভাস্বর হয়ে ওঠে। ঠিক বোঝা যায়—কে ছিল ফারাও অথচ এখন নিঃস্ব। কে পড়েছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ছিনিয়ে খায়নি কেন'। কে লুট করতে গেছিল সাগর পাড়ি দিয়ে। কে অত পরিক্রমার ভেতরই যায়নি, পড়ে পড়ে মার খেয়েছে। কে নাপিতের কাছে মাথা জমা দিয়ে ঘুমিয়ে গেছিল, উঠে দেখেছে নাপিত মাথা মুড়িয়ে দিয়েছে, তবু ভদ্রভাবে বলেছে—বেশ হয়েছে। কে আজীবন জেনেছে খাদ্যই জীবনের সারকথা।
লুটেরার ইতিহাস, উপনিবেশে দুর্ভিক্ষ আর রায়টের ইতিহাস, দাস ব্যবসায়ের ইতিহাস, দেশভাগের ইতিহাস ইত্যাদি সব রকমের ইতিহাসকে লুকিয়ে ফেলে পথ চলছিল এ দেশ। সেই চলতি পথে এখন হোঁচট খাচ্ছে।
দাস ব্যবসায়ীর দুশো বছরের পুরনো মূর্তি সেই ইতিহাসের সাক্ষী। ব্রিটিশ মিউজিয়াম ভরে থাকা 'অ্যাননিমাস গিফট' নামধারী সব তৈজসপত্র- সব মার্বেল পিলার- সব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সেই ইতিহাসের সাক্ষী। মানুষ নিজেই তার ইতিহাসের, তার জীবনাচরণের, তার নৃতত্ত্বের প্রধান সাক্ষী। এত সাক্ষী থাকতে কি আর ইতিহাস লুকোনো যায়?
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট