ফিলিস্তিন ইসরায়েল: হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধে হার-জিত লাভ-ক্ষতির সমীকরণ
ছবির উৎস, AFP
- Author, শাকিল আনোয়ার
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, লন্ডন
লন্ডনে শনিবার গাযায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে এক বিক্ষোভে এক নারীর হাতে একটি প্ল্যাকার্ডের ভাষা ছিল এরকম - ইসরায়েলে রকেট হামলা এবং ধর্ষিতার হাতে ধর্ষকের পিটুনির মধ্যে তফাত নেই।
এমন তুলনা হয়তো মোটা দাগের ক্রুদ্ধ একটি প্রতিক্রিয়া, কিন্তু একথা সত্যি যে ইসরায়েল গাযায় তাদের বিমান হামলার যুক্তি হিসাবে হামাসের রকেট ছোঁড়াকে দায়ী করলেও ফিলিস্তিনিরা এখনও তার জন্য হামাসকে দোষারোপ করছে না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় গাযার শত শত বাসিন্দা বলছেন টানা সাতদিন ধরে ইসরায়েলি বোমার যে ধ্বংসযজ্ঞ তা নজিরবিহীন। অনেকে লিখছেন যে কোনো সময় প্রাণ যেতে পারে এই আশঙ্কায় পরিবারের সব সদস্য এখন বাড়ির একটি ঘরের মধ্যে থাকছেন যাতে মরলে তারা একসাথে মরতে পারেন। সাংবাদিকরাও লিখছেন ২০১৪ সালে যখন ইসরায়েল গাযায় স্থল অভিযান চালিয়েছিল তখনও পরিস্থিতি এত ভীতিকর হয়নি।
ইসরায়েল বলছে তারা হামাসের রকেট হামলার জবাব দিচ্ছে, এবং তাদের টার্গেট হামাসের নেতৃত্ব এবং তাদের সামরিক ক্ষমতা খর্ব করা। কিন্তু হামাস যে ভয় পেয়ে তাদের তৎপরতায় ক্ষান্ত দিয়েছে তার কোনো লক্ষণ এখনও নেই। সোমবারও তারা গাযা থেকে দক্ষিণ ইসরায়েলের একাধিক শহরে রকেট ছুঁড়েছে।
দশই মে সোমবার রাতে গাযায় ইসরায়েলি বিমান হামলার শুরুও হয়েছিল গাযা থেকে ইসরায়েলের ভেতর হামাসের রকেট এসে পড়ার পর। রোজার ভেতর জেরুসালেমে আল আকসা মসজিদ এবং আশপাশে ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপানো নানা বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, কট্টরপন্থী ইহুদিদের উস্কানি বন্ধ এবং জেরুসালেমের শেখ জারা এলাকা থেকে ছয়টি ফিলিস্তিনি পরিবারকে উৎখাতের উদ্যোগ বন্ধের জন্য হামাস ইসরায়েল সরকারকে ১০ই মে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত আল্টিমেটাম দেয়। ইসরায়েল তার তোয়াক্কা না করলে গাযা থেকে এক-ঝাঁক রকেট এসে পড়ে জেরুসালেমের উপকণ্ঠ সহ দক্ষিণ ইসরায়েলের কয়েকটি শহরে।
ছবির উৎস, Getty
প্রায় সাথে সাথে গাযায় শুরু হয় ইসরায়েলের বিমান হামলা যে তাণ্ডবের মাত্রা প্রতিদিন বেড়েই চলেছে, এবং কবে তা শেষ হবে তার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনও নেই।
আরও পড়তে পারেন:
জেরুসালেম হারানোর ভয়
প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিশোধের প্রায় শতভাগ ঝুঁকি সত্ত্বেও ১০ই মে ইসরায়েলের ভেতর হামাস রকেট ছুঁড়ল কেন? তাদের জন্য এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য এর সম্ভাব্য পরিণতি কী?
লন্ডনে রাজনৈতিক ঝুঁকি সম্পর্কিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ সাদি হামদি মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দিনদিন আশঙ্কা জোরদার হচ্ছে যে পূর্ব জেরুসালেম এবং আল আকসার নিয়ন্ত্রণ নিতে ইসরায়েল এখন মরিয়া এবং হামাস মনে করেছে ইসরায়েলকে প্রতিরোধের জন্য যে কোনো ঝুঁকি তাদের নিতে হবে।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "ইসরায়েলের বহুদিনের কৌশলই হচ্ছে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে নিজে থেকেই ফিলিস্তিনিরা চলে যায়। বেন গুইরান (ইসরায়েলি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা) নিজে তার জীবনীতে এই কৌশলের কথা লিখেছেন। অব্যাহত চাপের মুখে নানা সময়ে বহু জায়গা ফিলিস্তিনিরা ছেড়েও দিয়েছেন। ব্যতিক্রম হলো পূর্ব জেরুসালেম এবং আল আকসা। ফিলিস্তিনিরা এখানে মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছে, কারণ তারা মনে করে এই শহরটি হারালে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে।"
জেরুসালেমে যা চলছিল তা নিয়ে রামাল্লায় ফিলিস্তিনি প্রশাসন তেমন সোচ্চার হয়নি। সৌদি আরব বা অন্য আরব মুসলিম দেশগুলো কম-বেশি চুপ ছিল। তুরস্ক কিছু মৌখিক বোলচালের বাইরে কিছু করেনি।
"এই শূন্যতার মধ্যে হামাস হয়তো মনে করেছে জেরুসালেম নিয়ে তাদেরই এখন কিছু করতে হবে। চরম ঝুঁকি স্বত্বেও তারা ইসরায়েলকে বার্তা দিতে চেয়েছে জেরুজালেম নিয়ে তাদের পরিকল্পনার পরিণতি রয়েছে,“ বলেন মি. হামদি।
ছবির উৎস, Getty
হামাসের রকেট ছোঁড়ার পর যে লড়াই এখন শুরু হয়েছে তা থামানোর জন্য জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন দূত পাঠিয়েছেন ইসরায়েলে। দুদিন আগে তিনি প্রথম টেলিফোনে করেছেন ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাসকে। কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে বলা হচ্ছে হামাসের সাথে কথা বলার জন্য আমেরিকার পক্ষ থেকে কাতারকে মধ্যস্থতা করতে বলা হয়েছে।
পাশাপাশি শুরু হয়েছে এই লড়াইয়ের দুই পক্ষের মধ্যে লাভ-ক্ষতির সমীকরণ।
হামাসের পরিণতি
লন্ডনে গবেষণা সংস্থা চ্যাটাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক মোহামেদ এল দাহশান বলেন, সাময়িকভাবে হামাস দুর্বল হয়ে পড়বে, কিন্তু সংগঠন হিসাবে তারা গাযা থেকে নিশ্চিহ্ন হবে বা গাযায় তারা নিয়ন্ত্রণ হারাবে সে সম্ভাবনা ক্ষীণ।
“গাযায় ক্ষমতার শূন্যতা নিয়ে ইসরায়েল উদ্বিগ্ন। সুতরাং তারা হামাসকে সংগঠন হিসাবে ধ্বংস করতে চায়না। তারপরও হামাসের রকেট, তাদের রাজনীতি ইসরায়েলকে অনেক সুবিধা দেয়। বহু বহু ফিলিস্তিনি হামাসকে মনে-প্রাণে ঘৃণা করে, এবং ফিলিস্তিনিদের নিজেদের মধ্যে এই বিরোধ বৈরিতা ইসরায়েলকে সুবিধা দেয়।“
তবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা সংস্থা জেরুজালেম ইন্সটিটিউট অব স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড সিকিউরিটি‘র (জেআইএসএস) গবেষক ড. জনাথন স্পায়ার মনে করেন চলতি এই সংঘাতে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবে হামাস।
ড স্পায়ার বলেন, “এই দফার এই সংঘাতে যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তা হলো হামাস এই প্রথম ইসরায়েলের ভেতর আরব জনগোষ্ঠীকে খেপিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। এটি এবার হামাসের বড় একটি কৌশলগত অর্জন এবং ইসরায়েলের বড় মাথাব্যথার কারণ।“
ছবির উৎস, Getty Images
জেরুসালেম এবং ইসরায়েলের আরব অধ্যুষিত বিভিন্ন আরব শহরে ইসরায়েল বিরোধী যে বিক্ষোভ তা যে হামাসের ‘উস্কানি বা নেতৃত্বে হয়েছে‘ হয়েছে তা মনে করেন না সাদি হামদি। কিন্তু, তিনি বলেন এই সংঘাত হামাসকে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের মধ্যে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য করবে।
“আমার মনে হয় রাজনৈতিকভাবে হামাসের অবস্থান শক্ত হবে। অনেক ফিলিস্তিনি মনে করবে যে হামাসের সাথে তাদের যত মতভেদই থাকুক না কেন অন্যায়ের প্রতিবাদে হামাস তাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। হামাস সাহস করে ই সংঘাত শুরু করেছে বলেই ফিলিস্তিনি ইস্যু আবার আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় চলে এসেছে।''
সামি হামদি মনে করেন এই বিরোধের দুই বিজয়ী হলো “হামাস এবং নেতানিয়াহু।“
“হামাস আবারো দেখিয়েছে প্রতিরোধে কার্যকরী। ইসরায়েলি আয়রন ডোম ভেদ করেছে তাদের রকেট। এই প্রথম তারা লড়াইকে সীমান্ত পেরিয়ে তেল আবিবে নিয়ে গেছে যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হবে। এই ঘটনা ভবিষ্যতে দু্ই পক্ষের মধ্যে যে কোন মীমাংসার ধরন বদলাবে।
“আর অন্যদিকে নেতানিয়াহু ইসরায়েলিদের বলছেন দেখ হামাস কত বড় হুমকি এবং তাদের হাত থেকে বাঁচতে হলে তাকেই প্রয়োজন। আবারো ভোট হলে তিনিই হয়তো জিতবেন।''
অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, চলতি এই সংঘাতের জেরে হঠাৎ যেভাবে দল-মত-স্থান নির্বিশেষে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে যে ঐক্য চোখে পড়ছে তা বিরল। মাহমুদ আব্বাস নির্বাচন স্থগিত করায় লড়াই শেষ হলে ফিলিস্তিনি ঐক্যমত্যের সরকার গঠনের চাপ বাড়বে বলে ধারণা জোরালো হচ্ছে।
সাদি হামদি মনে করেন, জো বাইডেন নতুন করে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি শান্তি প্রক্রিয়া শুরুর যে ইঙ্গিত এখন দিচ্ছেন তাতে এই ঐক্য ভবিষ্যতে যে কোনো মীমাংসায় ফিলিস্তিনিদের সাহায্য করবে।
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট