নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণ: নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৪, কারণ অনুসন্ধানে ৫টি পৃথক তদন্ত কমিটি

ছবির উৎস, Monir Hossain

ছবির ক্যাপশান, মসজিদ ঘেরাও করে পরিদর্শন চলছে।

নারায়ণগঞ্জের বায়তুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যায় আরও যোগ হল নতুন নাম। এই নিয়ে এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ২৪ জনে।

দুর্ঘটনার সময় মসজিদের ইমাম যিনি সে সময় নামাজ পড়াচ্ছিলেন তিনিও মারা গেছেন শনিবার রাতে। তার নাম আবদুল মালেক। বয়স ষাটের মত।

তার শরীরের খুব বেশি অংশ অগ্নিদগ্ধ না হলেও বয়স বেশি হওয়ার কারণে তাকে বাঁচানো যায়নি বলে জানান চিকিৎসকেরা।

এই ঘটনায় আরও ১৩ জন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটে চিকিৎসাধীন আছেন।

বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন জানিয়েছেন, আহত সবার অবস্থাই আশঙ্কাজনক। আহতদের মধ্যে তিন জন আইসিইউতে রয়েছেন। বেশিরভাগেরই শরীরের ৭০ ভাগ থেকে শতভাগ পুড়ে গেছে।

এর মধ্যে দুইজনের দগ্ধ হওয়ার হার ২৫ ভাগ থেকে ৩০ ভাগ হলেও শ্বাসনালী পুড়ে যাওয়ায় কেউই শঙ্কামুক্ত নন বলে তিনি জানিয়েছেন।

মি. সেন বলেন "সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক কারও ১৫% বার্ন হলেই আমরা ক্রিটিক্যাল বার্ন বলি। এখানে রোগীর চুল পড়ে গেছে, নিকট আত্মীয়রা তাদের চেহারা চিনতে পারছে না। আমি আমার ৪০ বছরের ক্যারিয়ারে এতো ভয়াবহ বার্ন দেখিনি।"

ছবির উৎস, Syed Ahmed Salehin

ছবির ক্যাপশান, মসজিদের ভেতরে দমকল কর্মীরা কাজ করছেন।

এদিকে হাসপাতাল ভবনের নীচে পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে।

হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, বিস্ফোরণের ঘটনায় কারও অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এর আগে ওই বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ।

অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামী করে ফতুল্লা থানার উপপরিদর্শক হুমায়ুন কবির বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।

কারও দায়িত্ব অবহেলায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে কিনা সেটি তারা তদন্ত করবে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে গাফেলতির অভিযোগ মিলবে তাদেরকেই আসামী করা হবে বলে জানা গেছে।

মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, মসজিদ কমিটি, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ভবন নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অবহেলার কারণেই ঘটনা ঘটেছে।

আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Syed Ahmed Salehin

ছবির ক্যাপশান, মসজিদের ভেতরে নিরাপত্তাবাহিনীর অবস্থান।

এদিকে বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এবং ডিপিডিসি পাঁচটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে কাজ করছে।

রোববার সকাল থেকেই ঘটনাস্থল ঘেরাও করে পরিদর্শনে গিয়েছে পুলিশ, সিআইডি, ফায়ার সার্ভিস, এবং ডিপিডিসির পর্যবেক্ষণ দল।

এখন পর্যন্ত এই বিস্ফোরণের পেছনে তারা নাশকতার কোন আলামত পাননি।

মসজিদের ভেতরে কোন এসি বিস্ফোরিত হয়নি। গ্যাস লাইনে লিকেজ এবং বৈদ্যুতিক লাইনে স্পার্ক থেকে ওই বিস্ফোরণের মূল কারণ বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে প্রকৃত কারণ বের করে দ্রুত এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের উপ সহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল আরেফিন।

এদিকে গ্যাসের লাইন থাকা সত্ত্বেও সেটার ওপরে কিভাবে মসজিদ নির্মাণের অনুমতি পেলো সেটা খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রোববার জাতীয় সংসদে উত্থাপিত শোক প্রস্তাবের আলোচনায় তিনি বলেন, মসজিদের স্বল্প পরিসরে ছয়টি এসি পরিচালনার মতো যথেষ্ট বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল না, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে যথাযথ নকশা অনুযায়ী মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে কিনা সব বিষয় খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এই দুর্ঘটনার পর গতকাল থেকে নারায়ণগঞ্জের তল্লা এলাকায় গ্যাসের সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। এ কারণে দুর্ভোগে আছে সেখানকার বাসিন্দারা।

ছবির উৎস, Syed Ahmed Salehin

ছবির ক্যাপশান, বিস্ফোরণের পর মসজিদের মেহরাবের চিত্র।

এদিকে নিহত পরিবার প্রতি ২০,০০০ টাকা এবং আহত ব্যক্তিদের ১০,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেয়া হলেও তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়ে এখনো কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান।

নিহত প্রত্যেকের পরিবার এবং আহতদের জন্য ৫০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

শুক্রবার রাত সাড়ে আটটার দিকে নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা এলাকার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

তাতে অগ্নিদগ্ধ হন সেখানে নামাজ পড়তে আসা অর্ধশতাধিক মানুষ।

ওদিকে এই ঘটনায় তদন্তের জন্য আলাদা করে ফায়ার সার্ভিস, তিতাস গ্যাস ও জেলা প্রশাসনের তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে।

পাইপলাইনের লিকেজ থেকে গ্যাস জমে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে কিনা সেটি তদন্ত করা হবে। ফায়ার সার্ভিস প্রাথমিকভাবে এমনটাই ধারণা করছে।

স্থানীয়রাও অনেকে দুর্ঘটনার পর জানিয়েছে মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তারা প্রায়ই গ্যাসের গন্ধ পেতেন।

দমকল কর্মীরা দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে মসজিদের মেঝের নীচ দিয়ে যাওয়া গ্যাস লাইন থেকে গ্যাস বেরুতে দেখেছেন।