ফ্রি ডাইভিংয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়ার সময় প্রায় মরতে বসা ডুবুরি হার্বার্ট নিশ সম্পর্কে যা জানা যায়
ছবির উৎস, herbertnitsch.com
"মানুষ আমাকে জিজ্ঞাসা করে: 'আপনি কি ডাইভিং ছাড়া জীবন কল্পনা করতে পারেন?' আমি তাদের বলি: 'আপনি কি না খেয়ে বেঁচে থাকা কল্পনা করতে পারেন?' "
মাছের মতো পানিতে বিচরণ করে বেড়ানো হার্বার্ট নিশের জন্ম ল্যান্ড লক বা চারপাশে ভূমি বেষ্টিত দেশ অস্ট্রিয়ায়।
তিনি একজন বিশ্ব রেকর্ডধারী মুক্ত ডুবুরি বা ফ্রি ডাইভার , যিনি ডুব দেয়ার সময় নিজের সঙ্গে প্রচলিত শ্বাস প্রশ্বাসের কোনও সরঞ্জাম রাখেন না।
তিনি একটানা নয় মিনিটের জন্য তাঁর শ্বাস ধরে রাখতে পারেন এবং তার রেকর্ড ডাইভটি ২৫৩ মিটারের চেয়েও গভীর ছিল, উদাহরণস্বরূপ, ইংলিশ চ্যানেলের চাইতেও গভীরে গিয়েছিলেন তিনি।
ইংলিশ চ্যানেলের সর্বোচ্চ গভীরতা ১৭৪ মিটার
নিশ বিবিসিকে জানিয়েছেন ডাইভিংয়ের প্রতি তার এই গভীর আসক্তি সম্পর্কে - এবং কীভাবে এই আসক্তির কারণে তিনি তার জীবন প্রায় হারাতে বসেছিলেন।
ছবির উৎস, herbertnitsch.com
সীমাহীন
ফ্রি ডাইভিংয়ের সবচেয়ে গভীর এবং চরম নিয়মকে "সীমাহীন" বলা হয়, যার মাধ্যমে ডুবুরিকে একটি ওজনযুক্ত স্লেজের মধ্যে চেপে পানির নীচে নামানো হয়।
পরে ডুবুরি বোয়েন্সি ডিভাইসের মাধ্যমে ওপরে উঠে আসেন।
পেশাদার ডাইভারদের জন্যও এই পদ্ধতিটি অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করা হয় এবং এজন্য বেশ কয়েকজন ডাইভারকে জীবন দিতে হয়েছে।
নিশের মতো ডাইভারের জন্য এটি হল ধৈর্য এবং সাহস এই দুইয়ের দুর্দান্ত পরীক্ষা।
তবে নিশ এই চ্যালেঞ্জ উপভোগ করতেন এবং এর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে তার প্রয়োজন হয়েছে দীর্ঘ বছরের প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতা।
বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে, তিনি তার ফুসফুসের ক্ষমতা ১৪ লিটার পর্যন্ত বাড়িয়েছেন বলে জানা গেছে - যেখানে একজন সাধারণ মানুষের ফুসফুসের ক্ষমতা গড়ে ছয় লিটার থাকে।
২০০৭ সালের জুনে নিশ এক নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়তে ২১৪ মিটার নিচে নেমেছিলেন।
২০১২ সালে, তিনি আরও গভীরে যান, গ্রিসের সান্টোরিনির কাছে তিনি ২৫৩ মিটার পর্যন্ত পানির গভীরে যান, যেটা ৭০-তলা আকাশচুম্বী অট্টালিকার প্রায় সমান।
সেবার তার প্রায় জীবন যাওয়ার দশা হয়েছিল, বিবিসি'র কাছে তিনি বর্ণনা করেছিলেন সেই অভিজ্ঞতা।
ছবির উৎস, herbertnitsch.com and Phil Simha
বড় একটা ডুব দেয়া
"আমি চোখ বন্ধ করে ছিলাম এবং আমার চারপাশের কিছুই লক্ষ্য করিনি। সেখানে বাইরের পৃথিবীর অস্তিত্ব ছিল না।"
পানির নীচে ১৫ মিটার যাওয়ার পর তিনি নিজের সমস্ত বায়ু ইকুএক্সে অপসারণ করা বন্ধ করে দেন।
ইকুএক্স হল ইকুয়ালাইজেশন এক্সটেনশন টুল, এটি বিশাল আকারের প্লাস্টিকের বোতলের মতো বস্তু, যার ওপরে একটি নল জুড়ে দেয়া থাকে -এবং নীচে একটি ছিদ্র থাকে।
গভীরে ডুব দেয়ার সময় অর্থাৎ ডিপ ডাইভের সময় তিনি তার শরীরে চাপ সমান করার জন্য নিজেই এই এই সরঞ্জামটি তৈরি করেছিলেন - এটি বানাতে কোন ধরণের ভুল বা ব্যর্থতা থাকলে কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
"ক্রমশ নীচে নামার সাথে সাথে আমি এই বায়ু চুমুক দিয়ে দিয়ে শ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছিলাম। গভীরে যাওয়ার সমস্যা হল আপনি আপনার ফুসফুস থেকে আর কোন বাতাস পাবেন না।
আপনি আর শ্বাস নেয়ার সমান শ্বাস ছাড়তে পারবেন না। তবে, আমি যখন এই বোতলগুলিতে বাতাস দেই তখন আমি অনেক গভীরেও সেই বাতাস গ্রহণ করতে পারি।
ইকিউএক্সে নিঃশ্বাসের মাধ্যমে আমার সমস্ত বায়ু ছাড়তে প্রায় আধ মিনিট সময় লাগে। এরপর পুরো খালি ফুসফুস নিয়ে পানির নীচে নামা অব্যাহত থাকে।"
২৫০ মিটার গভীরতায় মানুষের দেহের চাপ প্রচণ্ড বেড়ে যায়। ফুসফুস সংকুচিত হয়ে লেবুর আকারের সমান হয়ে যায়।
ডাইভারের বাহু এবং পা থেকে রক্ত সরে যেতে থাকে। এ সময় বুকের দিকে মনোযোগ দিতে হয়। যেন বুকের গহ্বর ভেঙ্গে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যায়।
তবু হার্বার্ট নিশ তার নিজের রেকর্ডটি ভাঙতে ২৫৩ মিটার গভীরে নামেন।
তবে উঠে আসার সময় নানা সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে।
ফেরার পথে তিনি নাইট্রোজেন নারকোসিস নামক একটি নিস্তেজ অবস্থায় চলে যান।
অতিরিক্ত চাপের কারণে কিছু গ্যাসের প্রভাবে এই অনুভূতিহীন অবস্থা দেখা দেয়।
নারকোসিসকে কখনও কখনও "মার্টিনি এফেক্ট" বলা হয় -অর্থাৎ ডুবুরিরা যত গভীর যান, তারা ততোই 'মাতাল' বা আচ্ছন্ন অনুভব করতে থাকেন।
ছবির উৎস, herbertnitsch.com
মাতাল লাগছে
"আপনি যখন স্কুবা ডাইভ করবেন বা গভীরে ফ্রি ডাইভ করবেন তখন আপনি নাইট্রোজেন নারকোসিসের স্বাদ পাবেন।
আপনার নিজেকে মাতাল মনে হবে। এই মাদকতা আর শিথিলতার সংমিশ্রনে আমি ৮০ মিটার গভীরে ঘুমিয়ে পড়ি। ২৬ মিটার গভীরে উদ্ধারকারী ডাইভাররা আমাকে খুঁজে পান।"
বাতাসের অভাবের কারণে নিশ মারা গেছে এমন আশঙ্কা করা হচ্ছিল।
সুরক্ষা দলটি তাকে এক মিনিটের প্রয়োজনীয় ডিকম্প্রেশন স্টপের জন্য গভীরে ফেলে না রেখে যতো দ্রুত সম্ভব ওপরে তুলে আনেন।
ওপরে উঠতে থাকার এক পর্যায়ে নিশ জেগে উঠেছিলেন এবং ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর পরে তিনি জানতেন যে তার কী করতে হবে।
আরও পড়তে পারেন:
ছবির উৎস, herbertnitsch.com
ডিকম্প্রেশন
"আমি অক্সিজেন এবং একটি মাস্ক চাই এবং ডিকম্প্রেস করতে খুব তাড়াতাড়ি পানির নীচে নেমে যাই।"
সাধারণত ডাইভাররা যদি খুব দ্রুত ভূপৃষ্ঠে উঠে আসেন তাহলে তাদের ডিকম্প্রেশন সিকনেস অথবা দ্য বেন্ডস অর্থাৎ শরীর বেঁকে যাওয়ার সমস্যা হতে পারে।
যদি ডুবুরি খুব দ্রুত ওপরে উঠে আসেন, তাহলে রক্ত প্রবাহে এবং শরীরের টিস্যুতে নাইট্রোজেনের বুদবুদ সৃষ্টি হয়।
জয়েন্টে ব্যথা এই সমস্যার একটি সাধারণ লক্ষণ এবং এর কারণে আক্রান্তদের শরীর বেঁকে যায়, না হলে কুকড়ে যায়।
যদি সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা করা না হয় তবে এটি মারাত্মক হতে পারে।
ডিকম্প্রেশনের জন্য পানির নিচে ২৫ মিনিট সময় কাটানোর পরও কোনও লাভ হয়নি। তাই তিনি তার দলকে সেফটি প্রোটোকল চালু করতে বলেন।
কয়েক বছরের প্রশিক্ষণ এবং ডাইভারদের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ তাঁকে এ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছে, তবে তিনি তখনও মারাত্মক বিপদে ছিলেন।
ছবির উৎস, Getty Images
কোমা
নিশকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে এথেন্সের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়, তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তিনি কোমায় পড়ে যান।
চিকিৎসকরা অবিলম্বে তাঁর চিকিৎসা শুরু করেন। চিকিৎসকরা নিশের বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারকে জানিয়েছিলেন যে তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।
"আমি বুঝতে পারছিলাম না কি হচ্ছে। প্রথম সাত দিন আমি কোমায় ছিলাম।
প্রথমদিকে আমার স্বল্পমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিগুলি মুছে গিয়েছিল। এমনকি আমার প্রিয় বন্ধুদের নামও আমি মনে করতে পারছিলাম না।"
যখনই তিনি গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠেছিলেন তখনই তাঁর একজন কাছের বন্ধু তাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে তার রেকর্ড অক্ষত আছে।
"ডিকম্প্রেশন অসুস্থতার কারণে আমি মস্তিষ্কে স্ট্রোকের মতো লক্ষণের শিকার হয়েছিলাম। পরিস্থিতি সম্পর্কে আমি পুরোপুরি অবগত ছিলাম না। এটি অনেকটা এমন যে আপনি জেগে উঠেছেন ঠিকই কিন্তু আপনি আপনার চারপাশের কিছুই জানেন না।"
তিনি হাঁটতে পারতেন না এবং উঠে দাঁড়াতে কিংবা দাঁড়ানো থেকে বসতে তাকে অনেক কষ্ট করতে হতো।
তিনি হুইল চেয়ারে আটকা পড়েছিলেন। তাঁর কথাবার্তা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছিল।
"ভাগ্যক্রমে আমি আমার পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলাম না। যখন আমি কিছুটা সচেতন হতে শুরু করি তখন আমি ডাক্তারদের বলতে শুনি, যে আমার সেরে ওঠার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ।"
চিকিৎসকরা তাকে বলেছিলেন যে তিনি আর কখনও হাঁটতে পারবেন না এবং তিনি কখনই ফ্রি ডাইভিংয়ে ফিরতে পারবেন না।
কিন্তু হারবার্ট এটি বিশ্বাস করেননি। তিনি কী করতে পারবেন না, এ বিষয়ে মানুষের কাছ থেকে অনেক কথা শুনতে তিনি অভ্যস্থ ছিলেন।
ছবির উৎস, Getty Images
ফিরে আসার লড়াই
হার্বার্ট সব ধরণের প্রতিকূলতাকে অস্বীকার করে ফিজিওথেরাপি শুরু করেন, শক্তি এবং সমন্বয় বাড়ানোর জন্য সাঁতার কাটতে শুরু করেন।
নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আগ পর্যন্ত তিনি সব ধরণের চেষ্টা চালিয়ে যান।
তার শারীরিক অগ্রগতি তাকে উৎসাহিত করেছিল।
নিজের বিশ্ব রেকর্ডটি ভেঙে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার প্রায় দু'বছর পরে, পৃথিবীর গভীরতম স্থানে বিচরণকারী মানুষটি আবার গভীরে চলে যান।
যদিও তিনি আর প্রতিযোগিতামূলক ডাইভিংয়ে অংশ নিতে পারবেন না, তবুও তিনি 'পৃথিবীর গভীরে বিচরণকারী মানুষ' হিসাবে পরিচিতি পেয়েছেন এবং ফ্রি ডাইভিংয়ে ৩৩টি বিশ্ব রেকর্ড করেছেন।
আজ, সাত বছর পরে, নিশ অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
নড়াচড়া এবং সমন্বয়ে তার এখনও কিছু সমস্যা রয়েছে তবে তিনি এখনও খেলাধুলার প্রতি ভালবাসা থেকে ডাইভ করে যান। এবং তার কাছে এটা অনেকটা মুক্তির অভিজ্ঞতার মতো।
"পানির মধ্যে সবকিছু ঠিক থাকে। পানির মধ্যে আমার নিজেকে একজন শিশু মনে হয়।"
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট