সাদা কালো ছবিতে মাত্র চার দশক আগের চীন

ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার এড্রিয়ান ব্র্যাডশ' প্রথম বেইজিং এসে পৌঁছান ১৯৮৪ সালে। পরবর্তী তিন দশক ধরে তিনি চীনের পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক জীবনের ছবি তুলেছেন।

তার সংগ্রহে এখন আছে প্রায় বিশ লাখ ছবি। আশির দশকে তোলা কিছু ছবি নিয়ে বেরিয়েছে সম্প্রতি তার একটি বই, "দ্য ডোর ওপেনড: আশির দশকের চীন।"

সেই বইয়ের কিছু ছবি তিনি শেয়ার করেছেন বিবিসির সঙ্গে:

ছবির উৎস, ADRIAN BRADSHAW

ছবির ক্যাপশান, সাংহাই, ১৯৮৫।

সাদা কালো এই ছবিগুলোতে যে চীনকে তিনি ধারণ করেছিলেন, সেই চীনকে এখন খুঁজে পাওয়া দুস্কর হবে। মাত্র চার দশকে যে অভূতপূর্ব পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গেছে চীন, এসব ছবি যেন তারই প্রামাণ্য দলিল।

ছবির উৎস, ADRIAN BRADSHAW

ছবির ক্যাপশান, শ্লোগান: 'মাও জেদং চিন্তাধারা দীর্ঘজীবী হোক।" ১৯৮৫ সালে এই শ্লোগান মুছে ফেলা হচ্ছে।

ওপরের ছবি সম্পর্কে এড্রিয়ান ব্র্যাডশ'র মন্তব্য: "চীনের বড় বড় রাস্তার মোড়ে মোড়ে যেসব সরকারি প্রপাগান্ডামূলক বোর্ড ছিল, সেগুলো একে একে ঢাকা পড়তে লাগলো বিজ্ঞাপনে। বেশিরভাগ বিজ্ঞাপন ছিল বিদেশি ইলেকট্রনিক সামগ্রীর, যেগুলো তখনো পর্যন্ত চীনের দোকানপাটে কিনতে পাওয়া যায় না।"

"এর উদ্দেশ্য ছিল একদিন চীনের মানুষও যে এসব পণ্য কেনার মতো ধনী হতে পারবে, সে ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করা।"

ছবির উৎস, ADRIAN BRADSHAW

ছবির ক্যাপশান, সাংহাই, ১৯৮৫: রাস্তায় ট্রাইসাইকেল চালাচ্ছে দুই শিশু।

"সে সময় চীনের সাংহাই এর মতো বড় নগরীতেও কোন বিদেশির দেখা সচরাচর পাওয়া যেত না। অথচ সাংহাই তখনো চীনের সবচেয়ে বেশি কসমোপলিটন নগরী।"

ছবির উৎস, ADRIAN BRADSHAW

ছবির ক্যাপশান, বেইজিং, ১৯৮৫। রাস্তায় এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে মোহাম্মদ আলীর মুষ্টিযুদ্ধের প্রস্তুতি।

বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন মোহাম্মদ আলী ১৯৮৫ সালে চীন সফরে যান। তখন তার সঙ্গে এক সপ্তাহ কাটিয়েছিলেন এড্রিয়ান ব্র্যাডশ'। সেই অভিজ্ঞতার পরই তিনি চীনে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

"আমাকে চীনে বেড়াতে যাওয়া যেসব মানুষের ছবি তুলতে বলা হয়েছিল, তাদের একজন ছিলেন মোহাম্মদ আলী। বেইজিং ভবিষ্যতে অলিম্পিক গেমস আয়োজনের যে স্বপ্ন দেখছিল, সেই লক্ষ্যে মোহাম্মদ আলীকে তারা যেন একজন সম্ভাব্য উপদেষ্টা হিসেবে গণ্য করছিল।"

"তখনো পার্কিনসন্সের প্রাথমিক লক্ষণগুলো তাকে অতটা ম্লান করতে পারেনি। দুনিয়ার যে কেউ তাকে দেখলেই চিনতে পারে। আলী যেখানেই যাচ্ছিলেন সেখানেই লোকে তাকে দেখে হাসি আর উল্লাসে ফেটে পড়ছিল।"

ছবির উৎস, ADRIAN BRADSHAW

ছবির ক্যাপশান, বেইজিং ১৯৮৫: এক রেস্টুরেন্টে প্রখ্যাত ফরাসী ব্রান্ড পিয়েরে কার্দার ফ্যাশন শো

"এটি সম্ভবত চীনে সংস্কার শুরু হওয়ার পর প্রথম কোন ফ্যাশন শো। যারা এটি দেখতে এসেছিলেন, তাদের মুখের অভিব্যক্তি এবং চাহনিকে অমূল্যই বলতে হবে।"

ছবির উৎস, ADRIAN BRADSHAW

ছবির ক্যাপশান, সাংহাই, ১৯৮৭: নদীতীর জুড়ে নির্মাণযজ্ঞ

"সাংহাই নদীর অপর তীরের যে ভগ্নদশা, সেটা আমাকে সত্যিই অবাক করেছিল। সেখানে একটা ব্রিজ পর্যন্ত ছিল না।

"এখন সেখানে অনেকগুলো ব্রিজ, টানেল। আছে আন্ডারগ্রাউন্ড রেল লাইন। আর সাংহাই এর আকাশরেখা এখন তো ম্যানহাটানের প্রতিদ্বন্দ্বী।"

ছবির উৎস, ADRIAN BRADSHAW

ছবির ক্যাপশান, সাংহাই, ১৯৮৫: শিশুদের বিনোদন পার্ক

"কে জানে, এই শিশুদের কেউ একজন হয়তো বড় হয়ে সত্যিকারের নভোচারী হয়েছে। সে সময় কারও কল্পনাতেই ছিল না একদিন এটা সম্ভব হবে।"

ছবির উৎস, ADRIAN BRADSHAW

ছবির ক্যাপশান, চেংডু, ১৯৮৫: ওয়াকার দিয়ে হাঁটতে শিখছে এক শিশু

"এই ছবিতে স্নেহের পরশ ছড়ানো যে মূহুর্তটি ধরা পড়েছে, সেটা অসাধারণ। কারণ এই ছবিতে যে দাদীমাকে দেখা যাচ্ছে, তিনি হয়তো এমন এক সময়ে জন্ম নিয়েছিলেন যখন চীনে মেয়েদের পা বেঁধে রেখে ইচ্ছে করে পঙ্গু করে দেয়া হতো।"

ছবির উৎস, ADRIAN BRADSHAW

ছবির ক্যাপশান, সাংহাই, ১৯৮৫: একজনের পোর্টেবল মিউজিক প্লেয়ার দেখতে রাস্তায় ভিড় জমে গেল

"ইলেকট্রনিক পণ্যসামগ্রী চীনে ছিল বিরাট সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। আমি যেখানেই যেতাম, সেখানে লোকে আমার ক্যামেরার দাম জানতে চাইতো।"

ছবির উৎস, ADRIAN BRADSHAW

ছবির ক্যাপশান, হেফেই, ১৯৮৬: কাদায় মাখামাখি রাস্তার ওপর একটি বাজার

"চীনে রাস্তার ওপর যেসব বাজার বসতো, সেগুলোতে একেকটা পণ্যের বিরাট স্তুপ থাকতো। আর কেনার সময় দরকষাকষি করা যেত।"

"বলা যেতে পারে এখান থেকেই শুরু হয়েছিল চীনের নতুন অর্থনৈতিক যুগ। কৃষকরা যদি বেশি উৎপাদন করতে পারতো, তারা অতিরিক্ত আয় করতে পারতো।"

ছবির উৎস, ADRIAN BRADSHAW

ছবির ক্যাপশান, বেইজিং, ১৯৮৫: প্রচন্ড গরমে শরীর ঠান্ডা করতে খালে ঝাঁপ দিচ্ছে এক তরুণ।

"১৯৮০র দশকে চীনে এয়ার কন্ডিশনিং এর কথা শোনাই যেত না। কাজেই গ্রীষ্মে যখন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতো, লোকজন অনেক রাত পর্যন্ত বাইরে থাকতো আর জলাশয় পেলে সেখানে শরীর ডোবাতো।"

ছবির উৎস, ADRIAN BRADSHAW

ছবির ক্যাপশান, বেইজিং, ১৯৮৫: ফরবিডেন সিটিতে 'দ্য লাস্ট এমপেরর', ছবির শ্যুটিং।

"দ্য লাস্ট এমপেরর ছবির ব্যাপারে প্রাথমিক কিছু কাজ করতে পরিচালক বার্নার্ডো বেরটোলুচ্চি যখন প্রথম বেইজিং যান, তখন আমার সঙ্গে তার দেখা হয়। আমরা ইম্পেরিয়াল প্যালেসের চারপাশে যখন হাঁটছিলাম, তখন তিনি আমাকে ব্যাখ্যা করছিলেন, কিভাবে ছোটবেলায় চীনের ক্ষমতাচ্যূত এক সম্রাটের কাহিনী শুনে অভিভূত হয়েছিলেন।