চীনে সিজারিয়ানের মাধ্যমে মা হওয়ার হার কমছে যে কারণে

ছবির উৎস, CHINA PHOTOS

ছবির ক্যাপশান, চীনে কমছে সিজারিয়ান অপারেশন।

এক দশকেরও কম সময় আগে সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেবার হার বিবেচনায় চীন বিশ্বে অন্যতম শীর্ষ দেশ ছিল, যে কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল দেশটিকে।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্বব্যাপী চিকিৎসক ও গবেষকেরা যখন সন্তান জন্ম দিতে সিজারিয়ান বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে চলেছেন, চীন সেসময় সফল ভাবে এ হার কমিয়ে আনতে পেরেছে।

যদিও চীনে সিজারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেবার হার এখনো স্ক্যান্ডেনেভিয় দেশগুলোর তুলনায় দ্বিগুণ, এবং এ হার বাড়ছে।

কিন্তু চীনের সাফল্য হচ্ছে, দেশটিতে সিজার বাড়ার হার দ্রুত কমছে।

চীনে সিজারিয়ান কমার কারণ কী?

গবেষকেরা বলছেন, চীন উল্লেখযোগ্যভাবে এ হার কমিয়ে আনতে সক্ষম হচ্ছে, যেখানে ব্রাজিলের মত দেশ এ ক্ষেত্রে কোন অগ্রগতিই করতে পারেনি।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুশান হেলেরস্টেইন যৌথভাবে চীনের দশ কোটির বেশি শিশু জন্মের তথ্য নিয়ে গবেষণা করেছেন।

ছবির উৎস, DAISY LAN

ছবির ক্যাপশান, চীনে মধ্যবিত্ত পরিবারে স্বাস্থ্য সচেতনতা বেড়েছে।

২০১৭ সালে চীনে প্রায় পৌনে দুই কোটি শিশুর জন্ম হয়েছে স্বাভাবিক উপায়ে, অর্থাৎ সিজারিয়ান ছাড়াই।

অধ্যাপক হেলেরস্টেইন বলছেন, চীনে সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেবার প্রবণতা কমে আসার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।

• মাতৃস্বাস্থ্য খাতে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ

• চীনের শহরাঞ্চলে মধ্যবিত্তের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি

• সিজারে উদ্বুদ্ধ করলে শাস্তির ব্যবস্থা

দেশটিতে এখন হাসপাতালে সিজার করতে ইচ্ছুক মায়েদের একেবারে শেষ পর্যায়েও নিরুৎসাহিত করেন চিকিৎসক ও নার্সেরা।

সরকারী নীতি

চীনে ২০১২ সাল থেকে ক্রমে এ হার কমে আসছে। ২০১২ সালে যেখানে প্রথমবার মা হতে যাওয়া ৬৭ শতাংশ নারী সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিতেন, ২০১৬ সালে সে সংখ্যা ৪৯ শতাংশতে নেমে এসেছে।

এর মধ্যে ২০১৩ সালে চীনে এ সন্তান নীতি শিথিল করা হয়, এবং ২০১৫ সালে সেটি বাতিল করা হয়।

কিন্তু সিজার কমাতে সরকারের নেয়া নীতিকেই প্রধান কারণ মনে করা হয়।

ছবির উৎস, EILEEN WANG

ছবির ক্যাপশান, প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে সন্তান জন্ম দেয়া এবং বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো নিয়ে প্রচারণা

২০০১ সালে চীনের স্বাস্থ্য নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। দেশটির সরকার এজন্য দশ বছরব্যপী এক পরিকল্পনা নেয়, যাতে সিজারিয়ানের হার কমানো অন্যতম একটি লক্ষ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

সে বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, চীনে সিজারিয়ানের মাধ্যমে ৪৬ শতাংশ মা সন্তান জন্ম দেন।

এখন দেশটিতে গর্ভবতী নারীদের প্রাকৃতিক উপায়ে সন্তান জন্ম দেয়া এবং বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য বাধ্যতামূলক ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সেই সঙ্গে এজন্য ধাত্রীদের প্রশিক্ষণ দেবার ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে।

বর্তমানে দেশটিতে ধাত্রী প্রশিক্ষণের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, দেশটির হাসপাতালগুলোকে এজন্য সরকারের কাছে নিয়মিত জবাবদিহি করতে হয়।

কোন হাসপাতালে সিজারিয়ানের সংখ্যা বাড়লে সেই হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলসহ নানা ধরণের শাস্তি ও জরিমানার মুখে পড়তে হয়। অনেক হাসপাতাল বন্ধও করে দেয়া হয়েছে এজন্য।

সিজারিয়ানে সমস্যা কী?

অনেক ক্ষেত্রে সিজারিয়ানকে জীবন রক্ষাকারী উপায় বলা হয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটি ঝুঁকিপূর্ণও।

কারণ যেকোন বড় সার্জারির মত এ ক্ষেত্রেও একজন মানুষের সেরে উঠতে সময় লাগে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুদিন ধরেই বলে আসছে, একদম অপরিহার্য বা স্বাস্থ্যগতভাবে অত্যাবশ্যক না হলে সিজার করা উচিত নয়।

কিন্তু এখনো অনেক দেশেই সিজারিয়ানের সময় মাতৃমৃত্যুর ঘটনা ঘটে। বলা হয় যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঐসব মায়েদের সিজারিয়ান করানোর ব্যাপারটি স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণে চিকিৎসক পরামর্শ দেননি।

স্ক্যান্ডেনেভিয়ান অনেক দেশে সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেবার হার অনেক কম, কারণ সেসব দেশের প্রথা স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দেয়া।

কিন্তু ব্রাজিলের মত অনেক দেশেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান জন্ম দেয়ার ব্যাপারটি ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে।

ভিডিওর ক্যাপশান, বাংলাদেশে কেন বাড়ছে সিজারিয়ান প্রসব?