বাংলাদেশে মহাসড়কে বাসে ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় এখনই কী করা যায়

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, যাত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল

যে খবরটি বহু মানুষকে দুদিন হলো নাড়িয়ে দিয়েছে তা হলো, বৃদ্ধ বাবার সাথে বাসে করে আশুলিয়া থেকে টাঙ্গাইল যাচ্ছিলেন এক নারী।

পথে বাস থেকে বাবাকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণটা তিনি কিছুই বুঝে ওঠার আগে মধ্যবয়স্ক মেয়েকে নিয়ে চলে গেছে যাত্রীবাহী বাসটি।

তারপর ঐ নারীর মৃতদেহ পাওয়া গেছে। মহাসড়কে বাসে নারীকে ধর্ষণ করে তার ঘাড় মটকে, খুন করে মরদেহ ফেলে যাওয়া হয়েছে জঙ্গলে।

আহত যাত্রীকে তুলে গোপনে পানিতে ফেলে দেয়া, চোখে ঝাল অথবা মলম মেখে সর্বস্ব লুট, এমন বেশ কিছু ভয়াবহ ঘটনা কাছাকাছি সময়ে ঘটেছে বাংলাদেশের মহাসড়কে।

আর এর সবগুলোতেই জড়িয়ে আছে পরিবহন ব্যবস্থার সাথে শ্রমিকেরা।

মহাসড়কে যাত্রীদের জন্য কী ধরনের নিরাপত্তা এখন আছে?

বাংলাদেশে হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মোহাম্মদ আতিকুল ইসলামের সাথে কথা হচ্ছিলো।

তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো এই মুহূর্তে বাংলাদেশে মহাসড়কে যানবাহনে কি ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।

তিনি বলছেন, দূরপাল্লার যে বাস দিনে অথবা রাতে চলাচল করে, যাদের টিকেট কাউন্টার ব্যবস্থা আছে তাদের টিকেট কাউন্টারে সিসিটিভির ব্যবস্থা রয়েছে।

কিন্তু সেটি যাত্রীদের ছবি তুলছে। তিনি বলছেন, দূরপাল্লার গাড়ি নয়, আঞ্চলিক মহাসড়কে এমন ঘটনা বেশি ঘটছে।

পুরনো বাস যেগুলো ঐ এলাকার বাস নয় বা সড়কে চলাচলের যোগ্য না সেগুলোতেই এমন ঘটনা বেশি ঘটছে।

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান, বাস সম্পর্কে দেখেশুনে বাসে ওঠার জন্য পরামর্শ দিচ্ছে হাইওয়ে পুলিশ।

তিনি জানিয়েছে মহাসড়কে এগুলো ঠেকানোর জন্য নির্দিষ্ট কিছু কিছু যায়গায় তাদের তল্লাসি চৌকি থাকে।

তবে তিনি যাত্রীদের পরামর্শ দিচ্ছেন একটু দেখেশুনে বাসে ওঠার জন্য।

কী ব্যবস্থা এখনই নেয়া সম্ভব?

যতটুকু ব্যবস্থা এখন বাংলাদেশে রয়েছে তা যে খুবই অপ্রতুল তা ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোই বলে দেয়।

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামসুল হক বলছেন, এখন দুটো জিনিস খুবই সস্তা ও সহজলভ্য।

তার তা হল সিসিটিভি ও ট্র্যাকিং যন্ত্র। সাধারণ প্রাইভেট কারেও বহুদিন ধরে চালক ও গাড়ির গতিবিধি জানার জন্য মালিকরা অনেক ধরেই এই ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহার করছেন।

বহুদিন ধরেই বাংলাদেশে এটি পাওয়া যায়। এতে গাড়িটি কোথায় যাচ্ছে বা থামছে তার একটি ইতিহাস তৈরি হয়।

আর সিসিটিভি বাংলাদেশে এখন এমনটি ছোটখাটো দোকানেও লাগানো থাকে।

তিনি কয়েকটি বড় যানবাহন কোম্পানি নাম উল্লেখ করে বললেন যে তারা এই ব্যবস্থা চালু করেছে কোথাও গাড়ি অযথা দেরি হচ্ছে কিনা, কোন কারণে বাস রুট বদলে অন্য কোথাও চলে গেলো কিনা, বেশি গতিতে গাড়ি চলছে কিনা সেসব বোঝার জন্য তারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন ।

অধ্যাপক হক মনে করেন মালিকদেরকে এটা বোঝাতে হবে অর্থনৈতিক লাভ ব্যাখ্যা করে। তারা কোটি কোটি টাকা দিয়ে গাড়ি কিনছেন।

গাড়ির চালকের বিশৃঙ্খল ব্যবহারের জন্য এত দামি সম্পদ রক্ষা করার ধারনাটি দিয়েও যদি এসব প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু হয় সেটি যাত্রীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে।

অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, Rokon Khan

ছবির ক্যাপশান, মহাসড়কে সিসিটিভি বসাতে চায় হাইওয়ে পুলিশ।

এর বাইরে টিকেট ব্যবস্থা ডিজিটাল করলেও যাত্রীর কোন বাসে চড়ছে তার একটি রেকর্ড তৈরি হবে।

এসব যে খুব সহজেই বাংলাদেশে চালু করা যায় তা ইতিমধ্যেই কিছু কোম্পানি করে দেখিয়েছে।

যানবাহন খাতে শৃঙ্খলা

তবে অধ্যাপক হক বলছেন, প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়াও আর একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যানবাহন খাতকে অল্প কিছু কোম্পানির আওতায় নিয়ে আসা।

তিনি বলছেন, বাংলাদেশে হাজার হাজার গাড়ির হাজার হাজার মালিক।

একটি বাস নিয়ে ব্যবসায় আসতে চাইলেও তাকে রুট পারমিট আর লাইসেন্স দিয়ে দেয়া হচ্ছে।

এই মালিকেরা কন্ট্রাক্টে শ্রমিকের কাছে গাড়িটি দিয়ে দিচ্ছে। গাড়িটি থাকছে তাদের নিয়ন্ত্রণে যারা দিনে একটি নির্দিষ্ট আয় মালিককে দিচ্ছেন।

এমন গাড়ির সংখ্যা এত বেশি তাদের উপরে এমনকি সরকারি কর্তৃপক্ষেরও নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

তার মতে নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানি যদি কাজটি নেয় তবে তারা নির্দিষ্ট নিয়োগপত্র ও বেতনে একটি গোছানো পদ্ধতিতে শ্রমিক নিয়োগ দেবে।

এতে কোন চালক কোন গাড়ি কোনদিন চালাচ্ছে, সে কোন রুটে কয়টা থেকে কয়টা পর্যন্ত আছে এসব সম্পর্কেও একটি তথ্য থাকবে।

কটি গাড়ি রাস্তায় থাকছে তারও তথ্যও সঠিকভাবে থাকবে। গাড়ির চালক কোথায় থাকে বা তার পরিচয়টিও নিশ্চিত হবে।

এটি যানবাহন খাতে শৃঙ্খলা আনবে। বহু মালিক থাকলে সেটি সম্ভব নয়।

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN

ছবির ক্যাপশান, বিশেষজ্ঞরা বলছেন বহু মালিক ব্যবস্থা বদলে দরকার কয়েকটি কোম্পানি।

কী পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের?

ডিআইজি মোহাম্মদ আতিকুল ইসলাম বলছেন, কিছু যায়গা রয়েছে যেগুলো 'ক্রিটিকাল এরিয়া' বলে চিহ্নিত করেছেন তারা।

যেখানে যানজট, দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা-জনিত ঘটনা বেশি ঘটে সেখানে সিসিটিভি বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

মেঘনা-গোমতী সেতু এলাকা দিয়ে এটি শীঘ্রই শুরু হবে বলে তিনি জানান।

এছাড়া বেশকিছু মহাসড়কে সিসিটিভি লাগানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পুরোটাই যতটা সম্ভব সিসিটিভির আওতায় আনা হবে।

তিনি মনে করছেন এতে করে নজরদারি বাড়বে এবং তাতে এক ধরনের সহায়তা পাওয়া যাবে।

এর বাইরে আপাতত শুধু বাসের ভেতরে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর জন্য কাজ করছেন তারা।

পরিবহন মালিকদের সাথে এটি নিয়ে বেশ কবার আলাপ হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

তিনি মনে করছেন, মালিকরা নিজেরাই যদি এটি বসান তাহলে তাদেরই মঙ্গল।