বিশ্বকাপ ফুটবল: ২০১৮ সালের প্রধান ৮ দাবিদারের শক্তি ও দুর্বলতা

ছবির উৎস, MLADEN ANTONOV

ছবির ক্যাপশান, মস্কোতে বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে বিশেষ পাতাল ট্রেন

বিশ্বকাপ ফুটবল শুরুর আগে ফেভারিট হিসাবে যে কয়টি দলের নাম মিডিয়াতে ঘুরেফিরে উচ্চারিত হচ্ছে, সেগুলো হলো : ব্রাজিল, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, স্পেন, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, পর্তুগাল এবং ইংল্যান্ড ।

বিবিসির সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক মিহির বোস সেই ফেভারিটের তালিকায় ডেনমার্কের নাম যোগ করতে চান। এমনকি ইংল্যান্ডেরও আগে ডেনমার্কের নাম রাখার পক্ষে তিনি।

অন্যদিকে বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক কোচ একেএম মারুফুল হক মনে করছেন, ইংল্যান্ড এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম প্রধান দাবিদার। তিনি এমনকি ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার চেয়েও ইংল্যান্ডকে এগিয়ে রাখছেন।

তবে এই দুই বিশ্লেষকেরই এক নম্বর ফেভারিট- বর্তমান শিরোপাধারী জার্মানি।

আরো পড়ুন:

ছবির উৎস, MIGUEL MEDINA

ছবির ক্যাপশান, ইটালির উত্তরে জিরলান শহরে অনুশীলন করছে জার্মানির ২০১৮ বিশ্বকাপ স্কোয়াড

জার্মানি

যে কোনো বড় টুর্নামেন্টে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের সাম্প্রতিক সাফল্যের ইতিহাস অসামান্য। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ জেতার আগের দুবার ইউরোতেই (২০১০ এবং ২০১২) তারা সেমিফাইনালিস্ট ছিল। ২০১৬ তেও তারা সেমিফাইনালে উঠেছে।

মারুফুল হক বলছেন, "জার্মানির বৈশিষ্ট্য হলো সবসময়ই তাদের দলে তারুণ্য এবং অভিজ্ঞতার আদর্শ মিশ্রণ থাকে, এবারও তার ব্যতিক্রম নেই"।

তরুণ প্রতিভাবানদের মধ্যে জশুয়া কিমিচ (বায়ার্ন মিউনিখ) এ মুহূর্তে নিজের ক্লাবের শীর্ষ তারকা। সেই সাথে রয়েছেন গতবারের জয়ের নায়ক টনি ক্রুস (রেয়াল মাদ্রিদ), ম্যাট হামেল (বায়ার্ন) টমাস মুলার (বায়ার্ন) এবং মেসুত ওজিল (আর্সেনাল)। আর গোলে ম্যানুয়াল নয়া হলেন (বায়ার্ন) ভরসার অন্য নাম।

মিহির বোস মনে করেন, ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের দলটি জার্মানি এবারও প্রায় অক্ষত রেখেছে। "আমি মনে করি এবারও জার্মানি ফাইনাল খেলবে।"

বিশ্বকাপ নিজের কাছে রেখে দেওয়া কঠিন কাজ। তবে বর্তমানের কোনো দল যদি সেই অসাধ্য সাধন করতে পারে, সেটি হবে জার্মানি।

ছবির উৎস, Buda Mendes

ছবির ক্যাপশান, রিও ডি জেনিরোতে অনুশীলনের সময় ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের সাথে কোচ টিটে

ব্রাজিল

ব্রাজিল একমাত্র দল যারা প্রতিটি বিশ্বকাপ খেলেছে এবং পাঁচবার তারা এই কাপ জিতেছে- যে রেকর্ড এখনো কোনো দল ছুঁতে পারেনি। ।

২০১৪ সালের বিশ্বকাপে নিজের মাঠে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের পরাজয়ের অপমান কাটানোর জন্য মরিয়া হবে ব্রাজিল।

দলে প্রতিভাবানের অভাব নেই। বিশেষ করে তাদের আক্রমণভাগ, অনেক বিশ্লেষকের মতে, সবচেয়ে ভয়াবহ। নেইমার (পিএসজি), ফিলিপে কুটিনিও (বার্সেলোনা), গ্যাব্রিয়েল যেজুজ (ম্যান সিটি) এবং রবার্তো ফার্মিনিও প্রায় অপ্রতিরোধ্য। মধ্যমাঠে রয়েছেন পলিনিও, কাসেমিরো এবং ফার্নান্দিনিও।

মারুফুল হক বলছেন - "ব্রাজিলের বর্তমান মধ্যমাঠে অসামান্য ক্রিয়েটিভিটি রয়েছে। বিরোধী পক্ষের শক্তি বুঝে তারা তাদের ফরমেশন যখন তখন বদলে ফেলতে পারে।"

মিহির বোস বলছেন, "ব্রাজিলের সমস্যা এখন মনস্তাত্ত্বিক...নিজের মাঠে সাত গোল খাওয়ার ধাক্কা তারা কাটিয়ে উঠছে কিনা , সেটা দেখতে হবে।"

ব্রাজিল শক্ত দল, কোয়ালিফাইং রাউন্ডে খুবই ভালো খেলেছে, কিন্তু ব্রাজিল কাপ জিতবে কিনা তা নিয়ে বিশ্লেষকরা সন্দিহান।

ছবির উৎস, Marcelo Endelli

ছবির ক্যাপশান, বুয়েনস আয়ারসে আনুশীলনের সময় ক্ষুদে ফ্যানদের সাথে ছবি তুলছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ দল

আর্জেন্টিনা

লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার মধ্যমনি, কিন্তু তিনি ছাড়াও দলে রয়েছে মার্কোস রোহো (ম্যান ইউ), গোনজালো হিগুইন (ইয়ুভেন্টাস), ডি মারিয়া (পিএসজি) এবং আগুয়েরোর (ম্যান সিটি) মত প্রতিভাবান তারকারা।

তারপরও কাপের দাবিদার হিসাবে মিহির বোস খুব একটা ভরসা করছেন না আর্জেন্টিনার ওপর। "এটা ঠিক যে আর্জেন্টিনা শুধু মেসি নয়, কিন্তু কেন যেন এই তারকারা ইউরোপে তাদের ক্লাবের হয়ে যেভাবে গোল করতে পারে, আর্জেন্টিনার জন্য তেমন করতে পারেনা।"

ব্রাজিল বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "আমি তাদের প্রতিটি ম্যাচ দেখেছিলাম। মনে হতো মেসি না খলতে না পারলে অন্যরাও খেলতে পারেনা...অতিমাত্রায় মেসি নির্ভর হয়ে পড়েছে তারা, কিন্তু একজন মেসির পক্ষে বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব নয়।"

বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাসে নাম লেখানোর শেষ সুযোগ এটা মেসির জন্য। সুতরাং জান-প্রাণ দিয়ে তিনি চেষ্টা করবেন, সন্দেহ নেই।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০১৮ বিশ্বকাপের জন্য মাদ্রিদে দল ঘোষনা করছেন স্পেনের কোচ লোপেটিগুই

স্পেন

২০১০ সালের বিশ্বকাপ এবং তার আগে পরে দু-দুটো ইউরো জিতে ফুটবল বিশ্বে ঝড় তুলেছিল স্পেন।

কিন্তু তারপর থেকে সাফল্যের খরা চলছে তাদের। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের কাছে ৫-১ গোলে হেরে গ্রুপ পর্যায় থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল স্পেনকে।

তবে এবার স্পেন এমনই শক্ত দল যে ফ্যাব্রেগাজের মত ফুটবলারেরও দলে জায়গা হয়নি।

মিহির বোস বলছেন, "স্পেন আমার ফেভারিট দল, তাদের গোলকিপার ডেভিড দ্য হায়া বিশ্বের এক নম্বর। দারুণ সব প্লেয়ার দলে।"

স্পেন দলে রেয়াল এবং বার্সেলোনার একগাদা তারকার ভিড় - জেরার্ড পিকে (বার্সা), জোডি আলভা (রেয়াল) ড্যানি কারভাল (রেয়াল) সের্জিও রামোস (রেয়াল) এবং এনিয়েস্তা (বার্সা)।

মারুফুল হক বলছেন - বার্সা যে টোটাল ফুটবল খেলে, স্পেনের জাতীয় দলের খেলাতেও সেই একইরকম খেলা চোখে পড়ে। "দুর্দান্ত দল, নি:সন্দেহে কাপের অন্যতম দাবিদার তারা।"

ছবির উৎস, BRUNO FAHY

ছবির ক্যাপশান, টুবিজ শহরে অনুশীলন শুরু করেছে বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ স্কোয়াড

বেলজিয়াম

২০১৪ সালের বিশ্বকাপে অন্যতম ফেভারিট ছিল বেলজিয়াম, কিন্তু সমর্থকদের হতাশ করেছিলো তারা।

মারুফুল হক মনে করেন গত বিশ্বকাপে অভিজ্ঞতার ঘাটতি কাটিয়ে উঠেছে বেলজিয়াম। "গত ইউরোতে তাদের ম্যাচগুলো দেখেছি, বিশ্বকাপের কোয়ালিফাইং ম্যাচগুলো দেখেছি, অনেক অভিজ্ঞ হয়ে গেছে বেলজিয়াম।"

বেলজিয়ামের থিবো কোরতোয়া (চেলসি) বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলকিপার। কেভিন দ্য ব্রুইন বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। ডিফেন্সে রয়েছেন অভিজ্ঞ ভিনসেন্ট কোম্পানি (ম্যান সিটি) এবং ভার্মেলেন (বার্সা)। সম্মুখভাগে এডিন আজার্ড (চেলসি) এবং রোমেরু লুকাকু (ম্যান ইউ)।

মিহির বোস বলছেন, "দারুণ দল বেলজিয়াম, একটাই সমস্যা যে তাদের বিশ্বকাপ জেতার অভিজ্ঞতা নেই।"

ছবির উৎস, GERARD JULIEN

ছবির ক্যাপশান, প্যারিসের কাছে ক্লেয়ারফনটেইন ইভলিনে অনুশীলন করছে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ স্কোয়াড

ফ্রান্স

কোচ দিদিয়ের ডেসম্পের হাতে এবার একগুচ্ছ অসামান্য প্রতিভা রয়েছে।

গোলে হুগো লোরিস (টটেনহ্যাম), মাঝমাঠে এনগোলো কান্টে (চেলসি), পল পগবা (ম্যান ইউ) এবং আন্তোয়ান গ্রীজম্যান (এ্যাটলেটিকো)। সম্মুখভাগে ক্ষিপ্র গতির ডেমবেলে (বার্সা) এবং এমবাপে (পিএসজি)।

যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্য চরম হুমকি তৈরি করবে ফ্রান্স। কিন্তু তারপরও কাপের দাবিদার হিসাবে মিহির বোস খুব একটা ভরসা করতে পারছেন না ফ্রান্সের ওপর।

"নিজের মাঠে তারা ইউরো জিততে পারেনি, জেতা উচিৎ ছিল। তাছাড়া দলের কয়েকজনের বয়স কিছুটা বেশি হয়ে গেছে, সেটা একটা সমস্যা।"

ছবির উৎস, AFP Contributor

ছবির ক্যাপশান, পর্তুগালের প্রধান ভরসা ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো

পতুর্গাল

পর্তুগাল ক্রিস্টিয়ানো রোনান্ডোর দল, কিন্তু তিনি ছাড়াও দলে তুখোড় আরো বেশ কজন খেলোয়াড় রয়েছে - পেপে (বেসিকটাস), রাফায়েল (ডর্টমুন্ড), বার্নাডো সিলভা (সিটি), অন্দ্রে সিলভা (এসি মিলান)।

"পর্তুগালকে আপনি কখনই খাটো করে দেখবেন না। যেভাবে তারা ২০১৬ সালের ইউরো জিতলো, তা অবিশ্বাস্য," বলছেন মিহির বোস।

"পর্তুগাল দলে টিম স্পিরিটের একটা অভাব ছিল। ২০০৪ সালের বিশ্বকাপে শক্তিশালী দল নিয়েও তারা গ্রীসের কাছে হেরে গিয়েছিল। ইউরোতে তাদের মধ্যে বেশ টিম স্পিরিট দেখা গেছে।"

ছবির উৎস, ANDY BUCHANAN

ছবির ক্যাপশান, ইংল্যান্ড দলের অধিনায়ক হ্যারি কেইন

ইংল্যান্ড

তরুণ বেশ কজন প্রতিভাবান ফুটবলার রয়েছে ইংল্যান্ড দলে যারা ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে এবার প্রচুর গোল পেয়েছেন - হ্যারি কেইন (টটেনহ্যাম) ডেলি আলি (টটেনহ্যাম), রাহিম স্টার্লিং (সিটি), র‍্যাশফোর্ড (ম্যান ইউ), জেমি ভার্ডি (লেস্টার)।

মারুফুল হকের কাছে ইংল্যান্ড এবার অন্যতম ফেভারিট দল। "এত ভালো ফরোয়ার্ড নিয়ে ইংল্যান্ড বহুদিন বিশ্বকাপে যায়নি। ইংল্যান্ড সবসময়ই ভালো দল, তবে কেন যেন গোল পেতে তাদের অসুবিধে হয়, এবার মনে হয় তারা অনেক গোল পাবে।"

তবে মিহির বোস অতটা ভরসা করছেন না। "অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে দলে, বিশ্বকাপের জন্য সেটা বিরাট একটি বিষয়।"

তাছাড়া, তিনি মনে করেন, "গোলকিপার বড় সমস্যা হতে পারে। ইংল্যান্ড দলে সবসময় একজন ভালো অভিজ্ঞ গোলকিপার থাকতো, সেটা এবার নেই।"

মিহির বোস এবং মারুফুল হক দুজনেই মনে করেন, রাশিয়ায় ফাইনাল খেলবে দুই ইউরোপিয়ান দল।

মিহির বোসের মতে - ল্যাটিন আমেরিকার ফুটবলের সেই যাদু এখন আর তেমন নেই। "ইউরোপ এখন তাদের শক্তির ফুটবলের সাথে ল্যাটিন যাদুর সংমিশ্রণ ঘটিয়ে অনেক ভালো ফুটবল খেলছে, সে কারণে আফ্রিকায় গিয়ে শিরোপা জিতেছে স্পেন, ব্রাজিলে গিয়ে জয়ী হয়ে এসেছে জার্মানি।"

মিহির বোসের ধারণা - ফাইনালে খেলবে স্পেন এবং জার্মানি। মারুফুল হক মনে করেন, ফাইনালে জার্মানির প্রতিপক্ষ হবে ইংল্যান্ড।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ভিডিওর ক্যাপশান, রাশিয়ার বিশ্বকাপ ফুটবল আসরে ৩২টি দেশ খেলছ। বিশ্বকাপ নিয়ে অন্য গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যাগুলো কী?
ভিডিওর ক্যাপশান, মুসলমান ফুটবল ভক্তদের জন্য তৈরি যে রুশ শহর