বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর আসনে বাদ পড়া ভোটারদের ৯৫ শতাংশই মুসলিম

মমতা ব্যানার্জী ও শুভেন্দু অধিকারী

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মমতা ব্যানার্জী (বাঁয়ে) ও শুভেন্দু অধিকারী (ডানে) নন্দীগ্রাম আন্দোলন করেছেন একসঙ্গে.. তবে এখন তারা প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী - ফাইল ছবি
    • Author, রূপসা সেনগুপ্ত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
  • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের সিংহভাগই মুসলমান বলে উঠে এসেছে একটি সমাজ-গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে।

পশ্চিমবঙ্গের সমাজ গবেষণা সংস্থা 'সবর ইনস্টিটিউট'এর বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের যে ভোটারদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের ৯৫.৫ শতাংশই মুসলমান।

ভোটার তালিকার যে নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর চলছে, সেই প্রক্রিয়ায় দফায় দফায় অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করছে নির্বাচন কমিশন। সেই তালিকা বিশ্লেষণ করেই এই তথ্য তারা পেয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

তারা নিয়মিতভাবেই এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে নানা বিশ্লেষণ করছে।

এই প্রতিষ্ঠানের তরফে এসআইআর নিয়ে যে গবেষণা চালানো হয়েছিল তার পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের পর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিভিন্ন 'অসামঞ্জ্যসের' বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। তারই মধ্যে নন্দীগ্রাম অন্যতম।

মুসলমান অধ্যুষিত অন্যান্য জেলাতেও বহু সংখ্যক মুসলমান ভোটারের নাম বাদ গেছে তালিকা থেকে।

বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে আছেন বাংলার নবাব মীর জাফরের পরিবারের উত্তরসূরীদের অন্তত দেড়শো জন

আবার মালদা জেলার মুসলমান অধ্যুষিত সুজাপুর আর মোথাবাড়িতে গত সপ্তাহে যে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল, সেই দুটি অঞ্চলের প্রায় দুই লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে তালিকা থেকে।

নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ই ডিসেম্বরে পশ্চিমবঙ্গে নারী, পুরুষ এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ মিলিয়ে ভোটারের সংখ্যা ছিল সাত কোটি আট লাখ ১৬ হাজার ৬৩০ জন।

নির্বাচন কমিশনের সোমবার ৬ই এপ্রিল যে তথ্য দিয়েছে, তাতে এখনো পর্যন্ত সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে বাদ ৯০ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪৫ নাম বাদ পড়েছে।

তবে নন্দীগ্রামের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে কারণ এই আসন থেকে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে ভোটে লড়ছেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী।

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন থেকে শুরু করে তৃণমূলের ক্ষমতায় আসা এবং ২০২১-এর ভোটে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে মমতা ব্যানার্জীর 'পরাজয়' এবং তারপর সেই ফলকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাওয়া মিলিয়ে নন্দীগ্রাম বরাবরই খবরের শিরোনামে থেকেছে।

গবেষক সাবির  আহমেদ

ছবির উৎস, Sabar Institute

ছবির ক্যাপশান, গবেষক সাবির আহমেদ

নন্দীগ্রামে কত ভোটার, বাদই বা গেছে কত নাম?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সবর ইনস্টিটিউটের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণে এক চরম ও উদ্বেগজনক অসামঞ্জস্য প্রকাশ পেয়েছে। নাম বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৯৫.৫ শতাংশ মুসলিম, যদিও ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত অনুপস্থিত, মৃত, একাধিক জায়গায় নাম থাকা এবং বসবাসের জন্য অন্যত্র চলে গেছেন, এরকম ব্যক্তিদের তালিকায় নন্দীগ্রামের মাত্র ৩৩.৩ শতাংশ মানুষের নাম ছিল"।

২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের তথ্য বলছে নন্দীগ্রামে আড়াই লক্ষের বেশি ভোটারের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ মুসলিম।

প্রথমে ২৮শে ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত খসড়া তালিকায় নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের ১০ হাজারেরও বেশি ভোটারের নাম বিবেচনাধীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

পরে অতিরিক্ত তালিকা মিলিয়ে নন্দীগ্রামের ভোটার তালিকা থেকে মোট ২,৮২৬ জনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৭০০ জন মুসলিম এবং ১২৬জন অমুসলিম। অর্থাৎ বাদ যাওয়া নামের ৯৫.৫ শতাংশ মুসলমান, জানিয়েছে 'সবর ইনস্টিটিউট'।

গবেষণা সংস্থাটি জানিয়েছে, "এর ফলে এসআইআর প্রক্রিয়া এবং তার প্রভাব সম্পর্কে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৮.৯ শতাংশ নারী এবং ৫১.১ শতাংশ পুরুষ, যা থেকে বোঝা যায় যে এই সমস্যা লিঙ্গ নির্বিশেষে একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রভাবিত করে।"

এই প্রসঙ্গে সবর ইনস্টিটিউটের সাবির আহমেদের সঙ্গে কথা বলেছিল বিবিসি বাংলা।

তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, "পশ্চিমবঙ্গের মতো একটা রাজ্যে যেখানে এত ডাইভার্স কমিউনিটি রয়েছে, সেখানে এত তাড়াহুড়ো করে কেন এসআইআর-এর মতো একটা প্রক্রিয়া করা হলো সেটা একটা বড় প্রশ্ন।"

"লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি মূলত এআই দিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। মুলসিমদের মধ্যে আরবি বা ফার্সি নাম যখন বাংলা থেকে ইংরেজিতে করা হয়েছে তখন বানানের পার্থক্য দেখা দিয়েছে। আরো একটা বিষয়, নির্বাচন কমিশনের তো এটা দেখার কথা নয় যে একজন ব্যক্তির কতজন সন্তান রয়েছেন একজন, দু'জন না চারজন। কিন্তু এটাও খতিয় দেখা হলো এবং ভোটারদের নাম বাদ পড়ল," বলছিলেন মি. আহমেদ।

যেসব ভোটারের নামে 'লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি' বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি আছে বলে নির্বাচন কমিশন মনে করছে, তাদের আসলে বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগসূত্র প্রমাণ করা যায়নি, নামের বানানে অসঙ্গতি বা আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে তথ্যের মিল - এরকম বেশ কিছু কারণে তাদের নাম বিবেচনাধীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

আবার বাবার বয়সের সঙ্গে সন্তানের বয়সের পার্থক্য ১৫ বছরের কম বা ৫০ বছরের বেশি কি না, তাও দেখা হয়েছে। আর সবটাই করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে।

বিবেচনাধীন নামের তালিকায় ছিলেন ৬০ লাখ ছয় হাজার ৬৭৫ জন ভোটার। সেই তালিকায় থাকা নামগুলোর নথিপত্র খতিয়ে দেখছেন পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা আর ঝাড়খন্ডের প্রায় সাতশো বিচারক।

সোমবার ১২টা পর্যন্ত ৫৯ লাখ ১৫ হাজার নিষ্পত্তি হয়েছে বলে সুপ্রিম কোর্টকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি।

মি. আহমেদের কথায়, "লজিকাল ডিস্ক্রিপেনসির পরই দেখা গেল সংখ্যালঘুদের নাম অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাদ যাচ্ছে। বিবেচনাধীনের তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তারা তাদের সমস্ত নথিপত্র দিয়েও কমিশনকে সন্তুষ্ট করতে পারেননি। আমার মনে হয় এতে পলিটিকাল মোটিভ আছে।"

"আমরা সামগ্রিকভাবে দেখেছি যারা মার্জিনালাইজড কমিউনিটি তারাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভুগী," বলছিলেন মি. আহমেদ।

নির্বাচন কমিশনের তালিকায় নাম খুঁজতে ব্যস্ত ভোটাররা

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নির্বাচন কমিশনের তালিকায় নাম খুঁজতে ব্যস্ত ভোটাররা

স্বামীর নাম আছে, স্ত্রীর নাম বাদ

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে ট্রাইবুনালে আবেদন করতে হবে। অনলাইন এবং অফলাইন- দু'ভাবেই পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করা যাবে।

নন্দীগ্রামের চম্পাইনগরের বাসিন্দা শেখ সানোয়ার আলীর নাম ভোটার তালিকায় আছে, তবে তার স্ত্রী সাবিনা বিবির নাম সম্প্রতি প্রকাশিত অতিরিক্ত তালিকায় 'বাদ পড়া'দের মধ্যে রয়েছে। সোমবার সকাল থেকে স্থানীয় এক সাইবার ক্যাফেতে বসে ছিলেন অনলাইনে আবেদনের জন্য।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমি দিন আনি দিন খাই। আজ এক সপ্তাহ ধরে খালি ছোটাছুটি করছি আমার স্ত্রীর নাম লিস্টে তোলার জন্য। কাজে যেতে পারছি না। সকাল থেকে কম্পিউটারের দোকানে বসে আছি। কী করব?"

নন্দীগ্রামের নয়নান উত্তরপাড়ার বাসিন্দা আসাদুল্লাহ খান ও তার ভাই গোলাম রসুল খানের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেলেও তার বাবা-মা এবং দুই বোনের নাম রয়েছে।

তার কথায়, "আমরা পাঁচ পুরুষ ধরে এখানকার বাসিন্দা। কোন যুক্তিতে আমাদের বাড়ির চারজনের নাম আছে আর আমাদের দুই ভাইয়ের নাম বাদ গেল বুঝতে পারছি না। আমাদের পাড়ায় কোনো হিন্দুদের নাম কিন্তু বাদ যায়নি।"

"গত ১০-১২ দিন ধরে ছোটাছুটি করছি, কাগজপত্র জোগাড় করা আর জমা দিতে গিয়ে ৩০০ টাকা খরচ হয়েছে। আমি সামান্য দর্জির কাজ করি," জানাচ্ছিলেন আসাদুল্লাহ খান।

চম্পাইনগরের কাছে একটা ছোট সাইবার ক্যাফে চালান স্থানীয় যুবক নুরুল হাসান খান। প্রতিদিন এসআইআর সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে খোঁজখবর করতে স্থানীয় মানুষেরা জড়ো হচ্ছেন সেখানে।

তার কথায়, "রোজই আমার দোকানের সামনে ২০-২৫ জন লাইন কাগজপত্র নিয়ে অনলাইনে অ্যাপ্লাই করার জন্য আসেন। এদের নাম এসআইআর-এর পর বাদ গিয়েছে।"

তার নিজের নাম ভোটার তালিকায় থাকলেও তার বাবার নাম বিবেচনাধীনের তালিকায় ছিল।

মি. খান বলেছেন, "আমার বাবা হজ করতে যান, তার পাসপোর্ট রয়েছে, অথচ তার নাম বিবেচনাধীনের লিস্টে ছিল। হিয়ারিং-এর নোটিশ আসার পর কাগজপত্র নিয়ে গিয়েছিলাম। তারপর অবশ্য আর সমস্যা হয়নি। কিন্তু আমার দোকানে যারা রোজ ভিড় করেন, তাদের দেখে খারাপ লাগে এদের বেশিরভাগই দিনমজুর।"


এসএইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বিএলও-র সঙ্গে কথা বলছেন এক বাসিন্দা

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জানুয়ারি মাসে এসআইআর ক্যাম্পের ছবি

'হিন্দুদের নামও বাদ পড়েছে'

নন্দীগ্রামের তরুণ মুনিয়ানের পরিবারের এক সদস্যের নাম বাদ গিয়েছে তালিকা থেকে। তিনি বলেছেন, "আমার ভাইয়ের নাম রয়েছে, কিন্তু তার স্ত্রী গৌরী মুনিয়ানের নাম বাদ গিয়েছে। ওরা এখন দৌড়াদৌড়ি করছে নাম তোলার জন্য।"

নন্দীগ্রামের পারুলবাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দা রবি ভুঁইয়ার বাবার নাম ভোটার তালিকায় থাকলেও এসআইআর-এর পর প্রকাশিত সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট থেকে মা শিবানী ভুঁইয়ার নাম বাদ গিয়েছে।

তার কথায়, "আমার আর আমার মায়ের নাম বিবেচনাধীনের তালিকায় ছিল। কিন্তু কয়েকদিন আগে যে লিস্ট বেরিয়েছে তাতে আমার নাম থাকলেও, মায়ের নাম ডিলিটেড ক্যাটাগরিতে আছে। অনলাইনে আবেদন করব। আসলে কেন নাম বাদ গিয়েছে তা নিয়ে বিভ্রান্তির শেষ নেই।"

সোনাচূড়া অঞ্চলের শ্যামলী মাইতির নামও ভোটার লিস্ট থেকে বাদ গিয়েছে। তার স্বামী বলেছেন, "আমার শ্বশুরের নাম বিদ্যুৎ ভূষণ জানা। কিন্তু এসআইআর-এর সময় জমা দেওয়া পরিচয়পত্রে ভূষণ ছিল না, তাই প্রথমে হিয়ারিং নোটিশ আসে তারপর বাদ গিয়েছে।"

নন্দীগ্রামের সাউদখালি চর এসসি প্রাইমারী বিদ্যালয় বুথে বিএলও উত্তম মন্ডল বলেছেন, "এই বুথে ৬৮৫ ভোটারের মধ্যে ১২০ মুসলিম ভোটার। এদের মধ্যে চারজনের নাম বাদ গিয়েছে। এরা সকলেই হিন্দু, আমার বুথে কোনো মুসলিম ভোটারের নাম বাদ যায়নি।"

ওই অঞ্চলেরই বাসিন্দা শেখ সইদুল্লাহ অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেছেন, "বিষয়টা যেভাবে দেখানো হচ্ছে, তেমনটা নয়। হিন্দু ভোটারদের নামও বাদ পড়েছে । আমরা বিডিও অফিসে আজ গিয়েছিলাম এই নিয়ে কথা বলতে।"

স্থানীয় নেতারা কী বলছেন?

"গড় চক্রবেড়িয়া, কেনেবাড়ি, দাউদপুরের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জায়গা থেকে বেশি নাম বাদ গেছে। বেছে বেছে সংখ্যালঘুদের টার্গেট করা হয়েছে কারণ এরা তৃণমূলকে ভোট দেয়," বলেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের আব্দুল আলিম অলরাজি।

তিনি নন্দীগ্রামের কালীচরণপুর ব্লকের দলটির কোর কমিটির সদস্য।

নন্দীগ্রামের বামফ্রন্টের প্রার্থী শান্তি গিরি বলেছেন, "নন্দীগ্রামে প্রায় তিন লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার বিচারাধীন। আমরা তো দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করছি, কিন্তু এই তালিকায় থাকা নাম কী করে একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয় তা বুঝতে পারছি না। এসআইআর-এর পর প্রকাশিত তালিকা থেকে নন্দীগ্রামে মূলত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরই নাম বাদ গিয়েছে। বাদ যাওয়া নামের মধ্যে কমপক্ষে ৯০ শতাংশই মুসলিম।"

এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ব্যক্তিগত উদাহরণ দিয়েছেন তিনি। তার কথায় "আমার বাবার সঙ্গে বোনের বয়সের তফাত প্রায় পঞ্চাশ বছরের। লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সির কারণে সংশ্লিষ্ট নথি দেওয়ার পরও আমরা চিন্তায় ছিলাম যে ফাইনাল ভোটার লিস্টে তার নাম বিবেচনাধীন থেকে ডিলিটেড-এর ক্যাটাগরিতে যাবে কি না। কিন্তু শেষ দেখলাম তার নাম রয়েছে। অন্যদিকে, একই যুক্তিতে মুসলিম ভোটারদের নাম কীভাবে বাদ যায় তা বোঝা কঠিন।"

সোনাচূড়ায় বিজেপির 'মন্ডল সভাপতি' চন্দন মন্ডল এই যুক্তি মানতে নারাজ। তিনি বলেছেন, "আমার অঞ্চলে ১৫ হাজার ৮৬৪ জন ভোটার। মুসলিম ভোটার আছেন ৪০০ জন। এখনো পর্যন্ত ১৪টা নাম বাদ গিয়েছে। এরমধ্যে ১০ জন হিন্দু চার জন মুসলমান। বিবেচনাধীন ৭১ জন এর মধ্যে হিন্দু ১০ জন এবং মুসলমান ৬১ জন।"

বিজেপির বিজেপির বটকৃষ্ণ দাস বলেছেন, "শুধুমাত্র মুসলমানদের নাম বাদ গিয়েছে এটা তৃণমূলের ন্যারেটিভ ছাড়া কিছু নয়। হিন্দুদের নাম বাদ গিয়েছে। কারণ নথির তথ্য মেলেনি। নির্বাচন কমিশন কেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করতে যাবে?"

ভোটমুখী রাজ্যে এসআইআর একটা বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভোটমুখী রাজ্যে এসআইআর একটা বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে

সামগ্রিক পরিস্থিতি

নন্দীগ্রামের বামপন্থি দল এসইউসিআইয়ের প্রবীন নেতা ভবানী শংকর দাস বিষয়টাকে অন্যভাবে দেখেন।

তার কথায়, "এটা ঠিক যে তুলনামূলকভাবে মুসলিমদের নাম অনেক বেশি বাদ গেছে। অনেকেরই ছোট খাটো কারণে সমস্যা হয়েছে, যেমন নামের বানান মেলেনি। কারো নাম মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, তার নাম কোনো নথিতে এমডি নুরুল ইসলাম আছে। এখন ৩০-৩৫ বছর বয়স এমন অনেকের বার্থ সার্টিফিকেট নেই।"

"আবার এটাও ঠিক যেসব বুথে বুথ স্তরের কর্মকর্তা বা বিএলওরা এবং এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা খেটেছেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাজ করেছেন সেখানে বিবেচনাধীন তালিকায় থাকা মানুষের নাম নিয়ে সমস্যা হয়নি," বলছিলেন মি. দাস।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক উজ্জ্বল রায় বলেছেন, "এখানে দেখার বিষয় দুটো। প্রথম হলো বিষয়টা নন্দীগ্রামের এবং দ্বিতীয়ত প্রশ্নগুলো নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে উঠছে। কমিশনের নিরপেক্ষ অবস্থান কাম্য, কিন্তু ক্রমাগত উঠতে থাকা প্রশ্নগুলো পরিস্থিতিকে জটিল করছে। "

নন্দীগ্রামের ভোটে এই বিষয়টা কতটা ছাপ ফেলবে সে প্রশ্নের উত্তরে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৌম্য গাঙ্গুলি বলেন, "যেহেতু সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম বাদ যাওয়ার সংখ্যা মোট ভোটারদের তুলনামূলক কম, তাই ভোট ব্যাংকে তেমন প্রভাব ফেলবে না বলেই অনুমান করা যায়।"