পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে নজর থাকবে যে ১০টি আসনে

তিনটি বড় দলের সমর্থকদের দলীয় পতাকা নিয়ে প্রচারে দেখা যাচ্ছে - তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি আর সিপিআইএম

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের জন্য প্রচার চলছে জোর কদমে - বাঁয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের, মাঝে বিজেপির আর ডানদিকে চলছে সিপিআইএম দলের প্রচার
    • Author, ময়ূরী সোম
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
  • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে জোর কদমে। একদিকে নির্বাচন কমিশন যেমন প্রস্তুতি নিচ্ছে, কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, তেমনই রাজনৈতিক দলগুলোও প্রার্থী চূড়ান্ত করে নেমে পড়েছে প্রচারে।

রাজ্য বিধানসভায় আসন রয়েছে ২৯৪টি। তবে এরমধ্যে এমন ১০টি আসনের দিকে এই প্রতিবেদনে থাকছে, যেগুলোর দিকে নজর থাকবে রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে গণমাধ্যম - সকলেরই।

১. ভবানীপুর

জেলা: কলকাতা

প্রার্থী:

  • মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় — তৃণমূল কংগ্রেস
  • শুভেন্দু অধিকারী — বিজেপি
  • শ্রীজীব বিশ্বাস — সিপিআইএম

দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর আসনটি এই বছরের বিধানসভা নির্বাচনের আগে অন্যতম হাই ভোল্টেজ লড়াইয়ের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তার মূল কারণ এই আসনের প্রার্থী তালিকা - একদিকে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা ব্যানার্জী লড়ছেন, অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন বিধানসভার প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা ও বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী।

মমতা ব্যানার্জীর বাড়িও এই অঞ্চলেই।

একসময় মিজ. ব্যানার্জীর মন্ত্রিসভার অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তবে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন তার অন্যতম কড়া সমালোচক।

সেবছর নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হওয়ার পর ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে উপনির্বাচনে প্রায় ৫৮ হাজার ভোটে জয়লাভ করেন মিজ. ব্যানার্জী।

ফলে এই আসনে দু'পক্ষের আবার মুখোমুখি হওয়া এক মর্যাদার লড়াই হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ভবানীপুর ঐতিহ্যগতভাবে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এখানে উল্লেখযোগ্য অবাঙালি ভোটারদের একটি অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকতে পারেন।

এ বছর ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন ঘিরেও বিতর্কে জড়ায় এই কেন্দ্র। মিজ. ব্যানার্জীর অভিযোগ, প্রায় ৪৪ হাজার ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং আরও প্রায় ১৪ হাজার ভোটারকে বিচারাধীন রাখা হয়েছিল।

মমতা ব্যানার্জী জনসভায় মাইক হাতে ভাষণ দিচ্ছেন — ফাইল ছবি।

ছবির উৎস, Asian News International

ছবির ক্যাপশান, নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জী— ফাইল ছবি

২. নন্দীগ্রাম

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

জেলা: পূর্ব মেদিনীপুর

প্রার্থী

  • পবিত্র কর — তৃণমূল কংগ্রেস
  • শুভেন্দু অধিকারী — বিজেপি
  • শান্তি গিরি — সিপিআই

পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রামে ২০০৭ সাল থেকে নন্দীগ্রাম রাজ্যের অন্যতম রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত।

সেবছর রাসায়নিক হাব তৈরির জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশের গুলিতে ১৪ জন গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়। শুরু হয় তীব্র আন্দোলন, যা দীর্ঘ ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসানের অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়।

নন্দীগ্রামে একসময় মমতা ব্যানার্জী ও শুভেন্দু অধিকারী একসঙ্গেই আন্দোলন করেছেন। তবে ২০২১ সালে মি. অধিকারী বিজেপি প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে খুব অল্প ব্যবধানে (১,৯৫৬ ভোটে) মিজ. ব্যানার্জীকে পরাজিত করেন।

এ বছরও মি. অধিকারী বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন নন্দীগ্রামে। কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্র ও এই নন্দীগ্রাম - দুটি আসন থেকেই লড়ছেন মি. অধিকারী। এই আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী পবিত্র কর একসময়ে তারই ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

গত নির্বাচনে এই আসনে বড় বাম দল সিপিআইএম প্রার্থী করেছিল দলের যুব নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জীকে। তবে তার আগে এই আসনটিতে সিপিআই দলই বামফ্রন্টের পক্ষে থেকে প্রার্থী দিত এবং আসনটি থেকে তারাই জয়ী হত। ২০১১ সাল থেকে অবশ্য তারা আর জিততে পারেনি।

ভবানীপুর কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী জনসংযোগে বেরিয়েছেন — ফাইল ছবি।

ছবির উৎস, Asian News International

ছবির ক্যাপশান, এবার একাধিক আসনে লড়ছেন বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী— ফাইল ছবি

৩. পানিহাটি

জেলা: উত্তর ২৪ পরগনা

প্রার্থী

  • তীর্থঙ্কর ঘোষ — তৃণমূল
  • রত্না দেবনাথ — বিজেপি
  • কলতান দাশগুপ্ত — সিপিআইএম
  • শুভাশিস ভট্টাচার্য — কংগ্রেস

কলকাতার উপকন্ঠের এই পানিহাটি এ বছর বিশেষভাবে আলোচনায় আসে বিজেপির প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর।

বিজেপি এখানে প্রার্থী করেছে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় ধর্ষণ ও খুন হওয়া চিকিৎসক 'অভয়া'র মা রত্না দেবনাথকে। তার প্রার্থী হওয়া নিয়ে অ-বিজেপি দলগুলো যেমন সমালোচনা করছে, তেমনই তার মেয়েকে ধর্ষণ ও খুনের প্রতিবাদে যে নাগরিক সমাজ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিল, তাদের একাংশেরও সমালোচনার মোকাবিলা করতে হচ্ছে মিজ. দেবনাথকে।

২০২৪ সালের ওই ঘটনার পর রাজ্যজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন হয়।

অন্যদিকে, এখানে সিপিআইএম দলের প্রার্থী হয়েছেন তরুণ বাম নেতা কলতান দাশগুপ্ত। তিনি ওই আরজি কর ধর্ষণের ঘটনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেস এই আসনে প্রার্থী করেছে তীর্থঙ্কর ঘোষকে, যিনি বর্তমান বিধায়ক নির্মল ঘোষের পুত্র।

৪. রাসবিহারী

জেলা: কলকাতা

প্রার্থী

  • দেবাশিস কুমার — তৃণমূল কংগ্রেস
  • স্বপন দাশগুপ্ত — বিজেপি
  • মানস ঘোষ — সিপিআই(এমএল) লিবারেশন

দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম অভিজাত এলাকা রাসবিহারীতে এ বছর নাটকীয় ত্রিমুখী লড়াই দেখা যাচ্ছে তৃণমূলের বর্ষীয়ান নেতা এবং বিরোধী 'বুদ্ধিজীবীদের' মধ্যে।

তৃণমূলে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা দেবাশিস কুমার ২০২১ সালে ২০ হাজারেরও বেশি ভোটে এই আসন থেকে জয়ী হন। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে কলকাতা পৌর নিগমের ওয়ার্ড কাউন্সিলর, মেয়র পরিষদের সদস্য পর্যন্ত নানা দায়িত্ব সামলেছেন। বর্তমানে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের কলকাতা দক্ষিণ জেলা সভাপতি।

মি. কুমারের বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী করেছে স্বপন দাশগুপ্তকে। তিনি সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার প্রাক্তন এমপি। কেমব্রিজ থেকে পড়ে আসা ইতিহাসবিদ তিনি এবং পদ্মভূষণও পেয়েছেন। হিন্দুত্ববাদী চিন্তাধারার এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে তিনি পরিচিত।

এই কেন্দ্রে বামফ্রন্টের সরাসরি কোনো প্রার্থী নেই, তবে তাদের সহযোগী দল - নকশালপন্থি সিপিআই (এমএল) - লিবারেশন এই আসনে প্রার্থী করেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মানস ঘোষকে।

সিপিআইএম-সহ বামফ্রন্টের দলগুলো মি. ঘোষকে সমর্থন করছে। মি. ঘোষ ছাত্রজীবন থেকেই বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে রাসবিহারী কেন্দ্রে শিল্পীরা দেয়ালে আকঁছেন — ফাইল ছবি।

ছবির উৎস, Asian News International

ছবির ক্যাপশান, নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে রাসবিহারী কেন্দ্রে শিল্পীরা দেয়ালে আকঁছেন — ফাইল ছবি

৫. শিলিগুড়ি

জেলা: দার্জিলিং

প্রার্থী

  • গৌতম দেব — তৃণমূল কংগ্রেস
  • শঙ্কর ঘোষ — বিজেপি
  • শরদিন্দু চক্রবর্তী — সিপিআই(এম)
  • অলোক ধারা — কংগ্রেস

শিলিগুড়ি উত্তরবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর যা উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত।

একসময় এটি বামফ্রন্টের শক্ত ঘাঁটি ছিল, তারপরে তৃণমূল কংগ্রেস সেখানে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তবে ২০২১ সালে বর্তমান বিধায়ক শঙ্কর ঘোষের জয়ে এখানে রাজনৈতিক বদল ঘটে। তিনি ওই নির্বাচনে ৫০.০৩ শতাংশ ভোট পেয়ে শিলিগুড়ি কেন্দ্রে জয়লাভ করেন।

শঙ্কর ঘোষ আগে সিপিআইএমেরই নেতা ছিলেন, তবে ২০২১ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন এবং সদ্যসমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় দলের চিফ হুইপ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস দাঁড় করিয়েছে প্রার্থী গৌতম দেবকে, যিনি দলের প্রবীণ নেতা এবং বর্তমানে শিলিগুড়ি শহরের মেয়র। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি শহর লাগোয়া ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি কেন্দ্রে তার বিজেপি প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে পরাজিত হন।

এর আগে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে তিনি পর্যটন ও উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের দায়িত্বও সামলেছেন।

সব মিলিয়ে, বিরোধীদের কাছ থেকে এই আসনটি পুনরুদ্ধার করতে তৃণমূলের প্রচেষ্টার প্রেক্ষাপটে শিলিগুড়িতে এক তীব্র নির্বাচনী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

৬. কালীগঞ্জ

জেলা: নদীয়া

প্রার্থী

  • আলিফা আহমেদ — তৃণমূল কংগ্রেস
  • বাপন ঘোষ — বিজেপি
  • সাবিনা ইয়াসমিন — সিপিআইএম
  • কবিল উদ্দিন শেখ — কংগ্রেস

নদীয়া জেলার কালীগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রটি এ বছরের নির্বাচনে মূলত প্রার্থীদের কারণেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সিপিআইএম এই আসনে প্রার্থী করেছে সাবিনা ইয়াসমিনকে।

গত বছর এই বিধানসভা আসনে উপনির্বাচন হয়েছিল এবং তৃণমূল কংগ্রেসের বিজয় মিছিল থেকে ছোঁড়া বোমার আঘাতে মিসেস ইয়াসমিনের ১০ বছর কন্যা তামান্না মারা যায়। নিহত তামান্নার মা হিসাবেই তাকে প্রার্থী করেছে বামফ্রন্ট।

গত বছর উপনির্বাচনে যে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীর বিজয় মিছিল থেকে বোমা ছোঁড়া হয়েছিল বলে অভিযোগ, সেই আলিফা আহমেদকে এবারও তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী করেছে এই কেন্দ্র থেকে।

তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী ও বিদায়ী বিধায়ক আলিফা আহমেদ, দলেরই প্রয়াত প্রাক্তন বিধায়ক নাসিরুদ্দিন আহমেদের কন্যা। তার মৃত্যুর কারণেই ২০২৫ সালে ওই আসনে উপনির্বাচন হয়েছিল।

৭. বাগদা (তপশীলি জাতির জন্য সংরক্ষিত)

জেলা: উত্তর ২৪ পরগনা

প্রার্থী

  • মধুপর্ণা ঠাকুর — তৃণমূল কংগ্রেস
  • সোমা ঠাকুর — বিজেপি
  • গৌর বিশ্বাস — বামফ্রন্ট
  • প্রবীর কীর্তনিয়া — কংগ্রেস

মতুয়া ভোটারের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির জন্য পরিচিত বাগদা বিধানসভা কেন্দ্র। এই বছর এখানে মতুয়াদের ধর্মগুরু ঠাকুর পরিবারের দুই সদস্যের মধ্যে নির্বাচনী লড়াই হতে চলেছে।

তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী করেছে বর্তমান বিধায়ক মধুপর্ণা ঠাকুরকে, যিনি ২০২৪ সালের উপনির্বাচনে এই আসনে জয়ী হন। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার এমপি এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের একটি অংশের নেত্রী মমতা বালা ঠাকুরের মেয়ে।

অন্যদিকে, বিজেপির প্রার্থী সোমা ঠাকুর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বনগাঁর বিজেপি সংসদ সদস্য শান্তনু ঠাকুরের স্ত্রী।

দুই প্রার্থীই মতুয়া ধর্মগুরু ঠাকুর পরিবারের সদস্য। হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুর পূর্ব বঙ্গে, বর্তমানের বাংলাদেশের ওলাকান্দিতে নমঃশুদ্র হিন্দুদের নিয়ে মতুয়া সম্প্রদায়ের সূচনা করেছিলেন। দেশভাগের পরে ঠাকুর পরিবার ও তাদের ভক্তরা ভারতে চলে আসতে শুরু করেন। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া, হাওড়া, কোচবিহার এবং মালদা জেলার মতো সীমান্তবর্তী অঞ্চলেই মূলত তাদের বসবাস।

সাম্প্রতিককালে ঠাকুর পরিবারকে ঘিরে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়। ২০১৯ সালে পাশ হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এই প্রেক্ষাপটে মতুয়া বিজেপি নেতা শান্তনু ঠাকুর ২০১৯ ও ২০২৪—দুইবারই বনগাঁ লোকসভা আসনে জয়ী হন।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়েও মাতুয়া সমাজে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের অনেকের নাম হয় তালিকা থেকে বাদ গেছে, বা বিবেচনাধীন তালিকায় রয়েছেন।

উত্তরপাড়ার সিপিআইএম প্রার্থী মীনাক্ষী মুখার্জী ভাষণ দিচ্ছেন — ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Asian News International

ছবির ক্যাপশান, উত্তরপাড়ার সিপিআইএম প্রার্থী মীনাক্ষী মুখার্জী— ফাইল ছবি

৮. উত্তরপাড়া

জেলা: হুগলি

প্রার্থী

  • শীর্ষাণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় — তৃণমূল কংগ্রেস
  • দীপাঞ্জন চক্রবর্তী — বিজেপি
  • মীনাক্ষী মুখার্জি — সিপিআই(এম)

পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত উত্তরপাড়া আসনটি একসময় বামফ্রন্টের শক্ত ঘাঁটি ছিল, তবে গত কয়েকটি নির্বাচনে তা তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে আসে। এ বছর এখানে তিনজন উল্লেখযোগ্য প্রার্থীর মধ্যে জোরদার প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যেতে পারে।

তৃণমূল কংগ্রেস নতুন মুখ হিসেবে প্রার্থী করেছে আইনজীবী শীর্ষাণ্য ব্যানার্জীকে, যিনি দলের প্রবীণ সংসদ সদস্য কল্যাণ ব্যানার্জীর ছেলে।

তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মীনাক্ষী মুখার্জি - দীর্ঘদিনের বাম যুবনেত্রী, সিপিআইএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং রাজ্যের এক পরিচিত বামপন্থি নেত্রী। ২০২৪ সালে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার প্রতিবাদে ন্যায়বিচারের দাবিতে অন্যতম আন্দোলনকারী ছিলেন তিনি।

বিজেপি প্রার্থী দীপাঞ্জন চক্রবর্তী দেশের এলিট কমান্ডো বাহিনী এনএসজি প্রাক্তন সদস্য ও টেলিভশনের পর্দায় নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসাবে পরিচিত মুখ। মাত্রই কিছুদিন আগে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিন মি. চক্রবর্তী।

৯. আউশগ্রাম (তপশীলি জাতির জন্য সংরক্ষিত)

জেলা: পূর্ব বর্ধমান

প্রার্থী

  • শ্যামপ্রসন্ন লোহার — তৃণমূল কংগ্রেস
  • কলিতা মাজি — বিজেপি
  • চঞ্চল মাঝি — সিপিআইএম

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে আউশগ্রাম কেন্দ্রটি চর্চিত হয় মূলত বিজেপি প্রার্থী কলিতা মাজিকে ঘিরে।

তিনি পেশায় গৃহকর্মী এবং মাসে মাত্রই চার হাজার টাকা আয় করেন বলে জানা যায়। তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং নাগরিক পরিষেবার মতো বিষয়গুলোকে তার নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেছেন।

২০২১ সালে তিনি তৃণমূলের অভেদনন্দ থান্ডারের কাছে প্রায় ১১,৮১৫ ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন। এ বছর তার প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূলের শ্যামপ্রসন্ন লোহার এবং সিপিআইএম-এর চঞ্চল মাঝি।

বহরমপুর কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থী এবং দলের বর্ষীয়ান নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী — ফাইল ছবি।

ছবির উৎস, Asian News International

ছবির ক্যাপশান, বহরমপুর কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থী এবং দলের বর্ষীয়ান নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী — ফাইল ছবি।

১০. বহরমপুর

জেলা: মুর্শিদাবাদ

প্রার্থী

  • নাড়ুগোপাল মুখার্জী — তৃণমূল কংগ্রেস
  • সুব্রত মৈত্র — বিজেপি
  • আবুল কাশেম শেখ — সিপিআই(এমএল)
  • অধীর রঞ্জন চৌধুরী — কংগ্রেস

বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রটি এ বছর পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

প্রবীণ কংগ্রেস নেতা এবং বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রের পাঁচবারের সংসদ সদস্য অধীর রঞ্জন চৌধুরী প্রায় তিন দশক পর বিধানসভা নির্বাচনে এই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নেমেছেন।

দীর্ঘদিন ধরেই তিনি একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠানের কাছে পরাজিত হন।

এবারের নির্বাচনে তিনি বর্তমান বিজেপি বিধায়ক সুব্রত মৈত্র এবং তৃণমূল কংগ্রেসের নাড়ুগোপাল মুখার্জীর সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ ত্রিমুখী লড়াইয়ে নেমেছেন।

একসময়ে বহরমপুর-সহ মুর্শিদাবাদ জেলাতে শক্তিশালী ছিল কংগ্রেস দল। পাশাপাশি বামপন্থিদেরও ঘাঁটি ছিল এই জেলা।

কিন্তু কংগ্রেস থেকে অনেক নেতা কর্মী, যারা অধীর চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তারা তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর থেকেই দলটি দুর্বল হতে শুরু করে।