আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বিষাক্ত কীটনাশক থেকে যে বিপর্যয় নেমে এসেছিল কেরালা রাজ্যে, তারই কিছু ছবি
- Author, শেরিল্যান মোলান
- Role, বিবিসি সংবাদদাতা
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবিগুলি পাঠকদের অস্বস্তির কারণ হতে পারে
কোনো শিশুর হাত-পা বিকৃত, কারও মাথা ফুলে রয়েছে – এরকমই কিছু ছবি টাঙানো রয়েছে ভারতের কেরালা রাজ্যের কোচি শহরের একটি ছবির প্রদর্শনীতে।
এই ছবিগুলি ১৯৯০-এর দশক আর এই শতাব্দীর প্রথম দশকে তোলা। কেরালার কাসারগড় জেলায় ফসলের খেতে এন্ডোসালফান নামে একটি সস্তা, অথচ ভীষণ বিষাক্ত একটি কীটনাশক প্রয়োগ করার ফলেই মানুষের শরীরে বিষক্রিয়ার ছবি এগুলি। চিত্র সাংবাদিক মধুরাজ (যিনি একটি নামই ব্যবহার করে থাকেন) সেই সময়ে ছবিগুলি তুলেছিলেন।
১৯৭০-এর দশক থেকে শুরু করে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্ল্যান্টেশন কর্পোরেশন অফ কেরালা এন্ডোসালফান নামের ওই কীটনাশকটি কাসারগড় জেলার কাজুবাদাম খেতগুলিতে বছরে দুই থেকে তিনবার করে প্রয়োগ করত। পরে চা, ধান আর আম চাষেও ব্যবহার করা শুরু হয় এই কীটনাশকটি।
১৯৯০ এর দশক থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা জানাতে শুরু করেন যে সদ্যোজাত শিশু এবং জীবজন্তুদের জন্মের সময়েই নানা অঙ্গবিকৃতি দেখা যাচ্ছে। সেরিব্রাল পলসি, মৃগী আর মস্তিষ্কে জল জমার মতো শারীরিক এবং নার্ভের সমস্যা দেখা দিতে থাকে অনেকের। কিছু বাসিন্দা আবার শরীরে ফুসকুড়ি বেরোতে থাকে, হরমোন সংক্রান্ত সমস্যা, হাঁপানি এবং ক্যান্সারও দেখা যায়। পরিবেশ নিয়ে কাজ করে, এমন কয়েকটি সংগঠন তখনই বিষয়টা নজর দেয়, পরে কেরালার সরকারও এগুলিকে এন্ডোসালফিন বিষক্রিয়ার ফল বলে জানায়।
'স্টকহোম কনভেনশন অন পার্সিসটেন্ট অর্গ্যানিক পলিউট্যান্টস' ২০১১ সালে এই কীটনাশক উৎপাদন আর ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দেয়। সেবছরই ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সারা দেশেই এন্ডোসালফিন উৎপাদন, বিক্রি, ব্যবহার আর রফতানি নিষিদ্ধ করে।
ভারতের শীর্ষ আদালত ২০১৭ সালে প্রায় পাঁচ হাজার জন ক্ষতিগ্রস্তের প্রত্যেককে ভারতীয় মুদ্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে কেরালার সরকারকে নির্দেশ দেয়। তবে চিত্র সাংবাদিক মি. মধুরাজকে ক্ষতিগ্রস্তদের কেউ কেউ জানিয়েছেন যে, তারা সবাই এখনও ওই অর্থ পাননি।
প্রতিক্রিয়া জানতে বিবিসি কেরালার স্বাস্থ্য দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির অনেকেই গরিব শ্রমিক। এদের অনেকেই আবার সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা জাতি এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। তাদের না আছে প্রয়োজনীয় পুষ্টির যোগান, না পান চিকিৎসার যথাযথ সুযোগ।
'কোচি-মুঝিরিস বিয়েনালে' শীর্ষক ছবির ওই বার্ষিক প্রদর্শনীতে সমসাময়িক শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়ে থাকে।
প্রায় কুড়ি বছর ধরে মি. মধুরাজ কাসারগড় জেলার এন্ডোসালফানের প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির কাছে বারবার গিয়ে তাদের জীবন এবং তাদের শরীরে এই বিষাক্ত কীটনাশকের কী প্রভাব পড়েছে, তা বোঝার চেষ্টা করেছেন তিনি।
তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, "এই কীটনাশকটা কীভাবে গোটা পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে, মানুষগুলিকে কীভাবে অশক্ত করে দিয়েছে, সেসব আমি নিজের চোখে দেখেছি।
"অনেক পরিবারে এমনও দেখেছি যে শারীরিক আর মানসিকভাবে একাধিক বিশেষভাবে-সক্ষম সন্তানকে দেখাশোনা করতে হচ্ছে বাবা-মাকে। তাদের পক্ষে এ ধরনের সন্তানদের যত্ন নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আমি এমনও বয়স্ক মানুষও দেখেছি, যার স্ত্রী বা স্বামী দীর্ঘদিন ধরে ওই কীটনাশকের সংস্পর্শে আসার ফলে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এ ধরনের অসুস্থ মানুষকে যত্ন করতে তার স্বামী বা স্ত্রীদের কঠিন লড়াই চালাতে হয়," বলছিলেন মি. মধুরাজ।
গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মি. মধুরাজ যে-সব ছবি তুলেছেন আক্রান্তদের, তারই কিছু এখানে তুলে ধরা হলো।
সতর্কতা : এই ছবিগুলিতে কিছু পীড়াদায়ক দৃশ্য আছে, সেগুলি পাঠকদের অস্বস্তির কারণ হতে পারে
গত শতকের নয়ের দশকের শেষের দিক থেকে দুই হাজারের শুরুর কয়েকটা বছর সুশীল সমাজ সংগঠনগুলি, পরিবেশ কর্মী আর সাধারণ মানুষ এন্ডোসালফান নিষিদ্ধ করার দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখান। যে-সব বাবা-মায়েরা মনে করতেন যে ওই কীটনাশক ব্যবহারের কারণেই তাদের সন্তানদের ক্ষতি হয়ে গেছে, তারা বছরের পর বছর ধরে ওই বিক্ষোভগুলিতে যোগ দিতেন, অনেকেই সঙ্গে অসুস্থ সন্তানদেরও নিয়ে যেতেন মিছিলগুলিতে। তাদের দাবি ছিল চিকিৎসা আর সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়।
মি. মধুরাজ বলছিলেন, এইসব বাবা-মায়েরা অনেক বছর ধরে ঘরে – বাইরে লড়াই চালিয়ে গেছেন। সবথেকে কঠিন লড়াইটা অবশ্য ছিল নিজের সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।
"প্রত্যেকবার যখনই ওই এলাকাগুলোয় যেতাম, তখনই মনে হত যে চিকিৎসা ক্ষেত্রে কেরালা এত উন্নতি করেছে, তবুও এন্ডোসাফান আক্রান্তদের সঙ্গে সুবিচার হয়নি," বলছিলেন মি. মধুরাজ
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
হৃদয়বিদারক একটা ঘটনা মিজ. বিমলা আর তার কন্যা রেশমা। ২৮ বছর বয়সে মিজ. রেশমা মারা যান। এন্ডোসালফান কতবড়ো ক্ষতি করেছে, তারই একটা উদাহরণ এই পরিবারের ঘটনাটি।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, মিজ. রেশমা জন্ম থেকেই মানসিক দিক থেকে বিশেষভাবে সক্ষম। তার মা যখন কাজে যেতেন, তখন তার দাদি দেখাশোনা করতেন। ছোটোবেলাতেই মিজ. রেশমার বাবা মারা গিয়েছিলেন। আর তার দাদি মারা যান ২০১৪ সালে।
মিজ. রেশমা যে বিশেষ স্কুলটিতে যেতেন, সেটাও করোনা মহামারি চলাকালীন ২০১৯ সালে বন্ধ হয়ে যায়।
পুলিশ জানাচ্ছে, ২০২২ সালে তার মা মিজ. বিমলা সম্ভবত মেয়েকে হত্যা করে নিজেও আত্মহত্যা করেন। পুলিশকে উদ্ধৃত করে সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশিত হয়েছিল যে একার পক্ষে মেয়েকে সামলানো মিজ. বিমলার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।
মি. মধুরাজ বলছেন, এন্ডোসালফানের ভয়াবহতার এই ছবিগুলি তিনি কোচির প্রদর্শনীতে দেখাতে চেয়েছেন, যাতে এই ঘটনা সম্পর্কে আরও মানুষ জানতে পারেন।
"এ ধরনের বিপর্যয়ের ফলে মানুষকে কত মূল্য দিতে হয়েছে, তা যেন কখনই ভুলে না যায় কেউ," বলছিলেন মি. মধুরাজ।