খুন, মারামারি, বাঁশঝাড় গোয়ালঘরে মজুত- তেল নিয়ে যত তেলেসমাতি বাংলাদেশে
ছবির উৎস, Bloomberg via Getty Images
ইরান যুদ্ধের জের ধরে জ্বালানি তেল, বিশেষ করে অকটেন ও পেট্রোলের জন্য এখনো দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে এবং এই সংকটকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের ঘটনার খবর আসছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।
ফিলিং স্টেশনে তেল না পেয়ে পাম্প ম্যানেজারকে ট্রাকচাপায় খুনের অভিযোগ উঠেছে, আবার সাইকেলে করে মোটরসাইলের ট্যাংকি নিয়ে এসে তেল সংগ্রহের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
জোর করে পাম্প থেকে তেল নেওয়ার অভিযোগ যেমন প্রতিনিয়তই আসছে, পাশাপাশি দেশের বেশ কয়েকটি জায়গায় বসতবাড়ি, গোয়ালঘর কিংবা বাঁশঝাড়ের নিচে তেল মজুতের ঘটনাও উদঘাটন করেছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিতই 'তেলের কোনো সংকট নেই' দাবি করা হলেও ঢাকাসহ সারাদেশে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য প্রতিদিনই দীর্ঘ লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের।
যদিও বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জাতীয় সংসদে দেওয়া বিবৃতিতে বলেছেন, "ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন প্রকৃত পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়। বরং অতিরিক্ত ক্রয় ও মজুতের প্রবণতায় 'কৃত্রিম সংকট' তৈরি হয়েছে"।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের পাশাপাশি জেলা প্রশাসন থেকে 'ফুয়েল কার্ড' দেওয়ার কর্মসূচি শুরুর পর সেই কার্ড নিয়েও মারামারির ঘটনা ঘটেছে কয়েকটি জেলায়।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব (অপারেশন্স) মনির হোসেন চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলছেন, জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই জানার পরেও এসব ঘটনা ঘটার কারণ "অনেকটাই মনস্তাত্ত্বিক", যার সমাধান তাদের হাতে নেই বলে মনে করেন তিনি।
"যুদ্ধ হয়তো অনেককে আতঙ্কিত করেছে প্যানিক বায়িংয়ের ক্ষেত্রে। যে কারণে কেউ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছে, আবার কেউ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে তেলের কোনো ঘাটতি নেই," বলছিলেন মি. চৌধুরী।
এর আগে বিবিসি বাংলার সাথে আলাপকালে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেছিলেন, তেল মজুত করে একটি গোষ্ঠী সংকট তৈরির চেষ্টা করছে।
সমাজ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌহিদুল হক বলছেন, বাংলাদেশে কোনো কিছুর সংকট হলে অসৎ ও অভিনব চর্চা দেখা যায়, বিশেষ করে পণ্যের ক্ষেত্রে লাভের লোভ কিংবা আতঙ্ক থেকে মানুষ অতিরিক্ত সংগ্রহ করতে শুরু করে।
"এখন ফিলিং স্টেশনে মারামারি কিংবা আচরণগত অস্থিরতা বা একে অন্যকে দোষারোপ- এগুলো দেখা যাচ্ছে। এটি সামাজিক বৈকল্যের বহিঃপ্রকাশ। যে কোনো সংকট প্রয়োজনীয় সঠিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ করা যায় না বলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। যার প্রভাব সবার ওপর পড়ে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
আলোচনায় যেসব ঘটনা
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর থেকেই দেশে তেল নিয়ে অস্থিরতা শুরু হতে দেখা যায় এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে তেল আসা নিয়েও এক ধরনের উৎকণ্ঠা তৈরি হয়।
ওই পরিস্থিতিতে হুট করেই মোটরসাইকেল ও গাড়ি ছাড়াও বোতল, ড্রামে করে তেল কেনা শুরু হলে সরকার পরিস্থিতি সামলাতে তেল কেনায় সীমা, অর্থাৎ রেশনিং চালু করে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরবরাহও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
তখন থেকেই ফিলিং স্টেশনগুলোতে যে দীর্ঘ লাইন শুরু হয়েছে তা এই এক মাস পরে এসেও আর কমেনি, যদিও এর মধ্যেই রেশনিং পদ্ধতি তুলেও নিয়েছে সরকার।
এর মধ্যেই ঢাকাসহ সারাদেশে অনেক জায়গায় 'তেল বা অকটেন নেই' এমন প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখা কিংবা এক বেলা করে নির্দিষ্ট পরিমাণে জ্বালানি বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে বহু ফিলিং স্টেশনকে।
ফলে যখন যেই ফিলিং স্টেশনে তেল বিক্রি শুরু হয়েছে সেখানেই এক সাথে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে বহু মানুষ। ফলে স্টেশনগুলো শত শত বাইকের ভিড় কিংবা গাড়ির দীর্ঘ লাইন -এমন ছবি ও ভিডিওতে সয়লাব হয়ে গেছে সামাজিক মাধ্যম।
আবার এর মধ্যেই অভিযোগ উঠেছে, এক জায়গা থেকে তেল নিয়ে সেই তেল খোলা বাজারে বিক্রি করে আবার অন্য পাম্প থেকে তেল নেওয়ার কাজে জড়িত হয়ে পড়েছে কেউ কেউ।
খোলাবাজারে এসব তেল লিটারপ্রতি দুশো টাকার বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে এবং অনেকেই ফিলিং স্টেশনের দীর্ঘ লাইন এড়াতে অনেক বেশি দামে অস্থায়ী এসব কালোবাজারিদের কাছ থেকে তেল সংগ্রহ করছেন।
তবে যে ঘটনার ভিডিও সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছে তা হলো নড়াইলে তেল না পেয়ে বাগবিতণ্ডার জেরে পেট্রল পাম্প ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার অভিযোগ।
ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images
গত ২৯শে মার্চ নড়াইল-যশোর মহাসড়কের তুলারামপুর এলাকায় মের্সাস তানভীর ফিলিং স্টেশনের পাশে এ ঘটনা ঘটে বলে জানায় নড়াইল থানা পুলিশ। এই ঘটনায় মামলা হয়েছে ও ট্রাকচালক গ্রেফতারও হয়েছেন।
ফরিদপুর সদর উপজেলার দুটি পাম্পে অভিযান চালিয়ে ২৮ হাজার লিটার তেল উদ্ধার করা হয়েছে গত ২৮শে মার্চ। এদের মধ্যে একটি ফিলিং স্টেশনে 'তেল নাই' লেখা প্ল্যাকার্ড লাগিয়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল।
নাটোরের সিংড়া উপজেলায় বাঁশঝাড়ের মধ্যে মাটির নিচে পানির ট্যাংক বসিয়ে ১০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল লুকিয়ে রাখার অভিযোগ পাওয়া যায় রুবেল হোসেন নামের এক জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। খবর পেয়ে সেখানকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গত ৭ই মার্চ দুপুরে অভিযান চালিয়ে অর্থদণ্ড করেন ওই ব্যবসায়ীকে।
আবার ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার জামগড়া মোড় এলাকায় এক মুদি দোকানির বাড়িতে অভিযান চালিয়ে জ্বালানি তেল জব্দ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ওই তেল পরে বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
ওদিকে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় এসেছেন গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বাচ্চু মিয়া। তিনি তার মোটরসাইকেলের ট্যাংক খুলে বাইসাইকেলে লাগিয়ে জেলার সদর উপজেলার পুলিশ লাইন এলাকার হাছনা ফিলিং স্টেশনে গিয়েছিলেন তেল নেওয়ার জন্য।
এরপর থেকে দেশের কয়েকটি জায়গায় অনেককে শুধু বাইকের ফুয়েল ট্যাংক নিয়ে এসে তেল সংগ্রহ করতে দেখা যাচ্ছে।
ছবির উৎস, MD. ZILLUR RAHMAN PALASH
পরিস্থিতি সামলাতে সরকার প্রাথমিক পর্যায়ে বাইকারদের জন্য 'ফুয়েল কার্ড' দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যা কয়েকটি জেলায় ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলায় সেই ফুয়েল কার্ড সংগ্রহ করতে এসে বখতিয়ার নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে গত মঙ্গলবার। কার্ড সংগ্রহ করতে এসে উপজেলা মাঠে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত একটি ক্লিনিকে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আবার চুয়াডাঙ্গাতেই ফুয়েল কার্ডের জন্য জেলা প্রশাসকের সামনে অপেক্ষমাণ মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে মারামারির দৃশ্য ভাইরাল হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে।
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
লালমনিরহাটে তেল নিয়ে দুই দল ব্যক্তির মারামারি গড়িয়েছে কাদামাটি পর্যন্ত। হাতাহাতি থেকে শুরু হয়ে সেটি গড়িয়েছিল দলবদ্ধ মারামারিতে।
আবার নীলফামারীতে অবৈধ তেল বিক্রির দায়ে তিন সহকর্মীকে কারাদণ্ড ও জরিমানা করার প্রতিবাদে গত রোববার সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট শুরু করেছিলেন ট্যাংক-লরি শ্রমিকরা। এর ফলে উত্তরাঞ্চলের আট জেলায় জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ যায়।
পরে অবশ্য প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর সেই ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, প্যানিক বায়িং আর মজুতদারির চেষ্টার কারণেই পাম্পগুলোকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটেছে।
"পর্যাপ্ত তেল আছে। পুরো এপ্রিলে এতটুকু ঘাটতি হবে না। তারপরেও মানুষ এসব করছে কেন আমাদের জানা নেই," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী।
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট