ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে চুমুর উৎপত্তি ২১ মিলিয়ন বছর আগে

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান, গবেষকরা চুমুকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ঠোঁটের সাথে ঠোঁটের কিংবা মুখের সাথে মুখে স্পর্শ হিসেবে
    • Author, ভিক্টোরিয়া গিল
    • Role, বিজ্ঞান বিষয়ক সংবাদদাতা, বিবিসি নিউজ
  • পড়ার সময়: ৩ মিনিট

চুমু— মানুষ, বানর, এমনকি মেরু ভল্লুক, সব প্রাণীই চুমু খায়। আর এখন গবেষকরা চুম্বন বা চুমুর বিবর্তনমূলক উৎপত্তির বিষয়টি নতুন করে তুলে ধরেছেন

তাদের গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ২১ মিলিয়ন বা দুই কোটি ১০ লাখ বছরেরও বেশি সময় আগে ঠোঁটের সাথে ঠোঁট লাগিয়ে চুমুর বিকাশ ঘটে। সম্ভবত মানুষ ও 'এপ' (বানর) গোত্রীয় অন্যান্য প্রাণীর পূর্বপুরুষদের মধ্যেও তা প্রচলিত ছিল।

একই গবেষণায় আরও জানা গেছে, নিয়ান্ডারথালরাও চুমু খেত—এমনকি মানুষ ও নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেও হয়তো চুমুর বিনিময় হতো।

চুমু নিয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণার কারণ হলো, বিবর্তনের দিক থেকে চিন্তা করলে এটি এক ধরনের ধাঁধা। বেঁচে থাকা বা প্রজননের ক্ষেত্রে এর সুস্পষ্ট কোনো সুবিধা নেই। তবুও এটি কেবল মানব সমাজেই নয়, প্রাণিজগতের মধ্যেও ব্যাপকভাবে দেখা যায়।

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান, গবেষকরা একাধিক প্রজাতির মধ্যে চুমু খাওয়ার প্রমাণ পেয়েছেন

অন্য প্রাণীদের মধ্যেও চুমু খাওয়ার প্রবণতা দেখে বিজ্ঞানীরা 'ইভাল্যুশনারি ফ্যামিলি ট্রি' বা 'বিবর্তনের বংশতালিকা' নির্মাণ করেছেন, যেন বোঝা যায় এই আচরণটি কোন সময়ে সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়েছিল।

বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে এই আচরণের তুলনা করতে গিয়ে গবেষকদের 'চুমুর' অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং আবেগহীন সংজ্ঞায়ন করতে হয়েছে।

ইভাল্যুশন অ্যান্ড হিউম্যান বিহেভিয়ার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় তারা চুমুকে সংজ্ঞায়িত করেছেন, ঠোঁটের সাথে ঠোঁটের স্পর্শ হিসেবে যেটি আক্রমণাত্মক নয় এবং "যেখানে ঠোঁট বা মুখের কিছু অংশের নড়াচড়া থাকলেও কোনো ধরনের খাবার বিনিময় হয় না"।

"মানুষ, শিম্পাঞ্জি এবং বনোবো (বানর গোত্রীয় প্রাণী)—সবাই চুমু খায়," বলছিলেন , অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তন বিষয়ক জীববিজ্ঞানী ও প্রধান গবেষক ড. ম্যাটিল্ডা ব্রিন্ডল। সেখান থেকে তার ধারণা–– "সম্ভবত তাদের সবশেষ অভিন্ন পূর্বপুরুষরাও চুমু খেত"।

"আমাদের ধারণা, বৃহৎ বনমানুষদের মধ্যে প্রায় দুই কোটি ১৫ লাখ বছর আগে চুমুর বিকাশ হয়েছিল"।

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান, গবেষকরা বলছেন, এই আচরণটি মানুষ না এমন আত্মীয়দের সঙ্গেও আমরা শেয়ার করি

বিজ্ঞানীরা এই গবেষণায় তাদের বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞার সঙ্গে মিলে যায় এমন আচরণ খুঁজে পেয়েছেন নেকড়ে, এক ধরনের কাঠবিড়াল, মেরু ভল্লুক এমনকি অ্যালবাট্রস পাখির মধ্যেও।

তারা প্রাইমেট, বিশেষ করে বানরগোত্রীয় প্রাণীদের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন যাতে করে মানুষের চুমুর উৎসের একটি বিবর্তনগত চিত্র তৈরি করা যায়।

একই গবেষণায় আরও জানা গেছে, আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রাচীন আত্মীয় নিয়ান্ডারথাল, যারা প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গেছে— তারাও চুমু খেত।

নিয়ান্ডারথাল ডিএনএ নিয়ে আগে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক মানুষ ও নিয়ান্ডারথালদের মুখগহ্বরের লালায় এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে।

"এর অর্থ হলো, দুই প্রজাতি আলাদা হয়ে যাওয়ার পরও শত-সহস্র বছর ধরে তারা একে অপরের সঙ্গে লালা বিনিময় করতো," ব্যাখ্যা করেন ড. ব্রিন্ডল।

ছবির উৎস, Chester Zoo

ছবির ক্যাপশান, বানরগোত্রীয় প্রাণীদের চুমু খেতে দেখা যায়

এই গবেষণায় চুমুর বিকাশ কখন ঘটেছিল তা জানা গেলেও এটি 'কেন' ঘটেছিল সেই প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি।

এ নিয়ে ইতোমধ্যেই কয়েকটি তত্ত্ব রয়েছে যে এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের পরিচর্যা-সংক্রান্ত আচরণ থেকে উদ্ভূত হতে পারে, অথবা এটি সঙ্গীর স্বাস্থ্যের অবস্থা এমনকি সামঞ্জস্যতা ঘনিষ্ঠভাবে যাচাই করার একটি মাধ্যম হতে পারে।

ড. ব্রিন্ডল আশা করেন যে এই গবেষণা সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার নতুন পথ খুলে দেবে।

"আমাদের জন্য এই বিষয়টি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে এই আচরণটি মানুষ নয় এমন জ্ঞাতিদের সঙ্গেও আমরা শেয়ার করি," বলেন তিনি।

"আমাদের এই আচরণটি নিয়ে গবেষণা করা উচিত; মানুষের কাছে রোমান্টিক মনে হয় বলে একে তুচ্ছ বা হাস্যকর হিসেবে খারিজ করে দেওয়া উচিত নয়"।