সকালে গরম পানি খাওয়া কি সত্যিই শরীরের জন্য ভালো?

ধূসর রঙের ভেস্ট টপ পরা একজন তরুণী কেটলি থেকে একটি মগে গরম পানি ঢালছে
ছবির ক্যাপশান, গরম পানি খাওয়া বহু শতাব্দী পুরোনো জীবনযাত্রার অভ্যাসগুলোর একটি যা এখন আবার ভাইরাল হয়েছে
    • Author, কেইট বোয়ি
    • Role, গ্লোবাল হেলথ, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

"প্রথমে আমার সোশ্যাল মিডিয়া ফিডে আসে এটি এবং এরপর একের পর এক ভিডিও দেখতেই থাকি... তারপর ভাবলাম, কেন চেষ্টা করে দেখছি না," বলছেন ২১ বছর বয়সী মারিয়াম খান।

এটা ব্যায়াম বা ওয়ার্কআউটের কঠোর কোনো রুটিন নয়, কিংবা দামী ত্বকচর্চার উপাদানও নয়।মারিয়ামসহ আরো অনেকেই যে প্রবণতাটি অনুসরণ করছেন তা খুবই সহজ—সকালে গরম পানি পান করা।

গরম বা উষ্ণ পানি পানের স্বাস্থ্যের উপকারিতা প্রাচীন চীনা চিকিৎসা পদ্ধতি ও ভারতের আয়ুর্বেদসহ বিভিন্ন সামগ্রিক (হোলিস্টিক) চিকিৎসা ব্যবস্থায় হাজার বছরের পুরনো প্রচলিত ধারণা।

কিন্তু বছরের শুরুতে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ার পর এই প্রাচীন অভ্যাসটি এখন পৌঁছে গেছে বৈশ্বিক নতুন এক দর্শক শ্রেণির কাছে।

লাখো ভিউ পাওয়া টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে "নিউলি চাইনিজ" ও "চাইনাম্যাক্সিং"—এমন শব্দগুলো ট্যাগ করা থাকে। বেশিরভাগ ভিডিওতেই দেখা যায় তরুণ-তরুণীরা উষ্ণ পানি পান করছে, গরম নাশতা খাচ্ছে এবং স্ট্রেচিং দিয়ে দিন শুরু করছে।

কিন্তু এই সরল জীবনযাপনের অভ্যাসগুলো কি সত্যিই স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে?

'শক্তি' সংরক্ষণ

চীনের কোটি মানুষ অনুসরণ করেন এমন ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতির একটি মূল বিশ্বাস হলো—শরীরজুড়ে শক্তি বা 'চি' প্রবাহিত হয় এবং কোথাও এই প্রবাহ বাধাগ্রস্ত বা বিঘ্নিত হলে অসুস্থতা দেখা দেয়।

সমর্থকরা মনে করেন, গরম পানি—যা মুখ বা গলা পুড়ে যাওয়া এড়াতে ৪০ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সামান্য ঠান্ডা করা হয়— এটা পান করলে 'চি' আরও শক্তিশালী হয় ও সংরক্ষিত থাকে, যা স্বাস্থ্যের উন্নতি ও দীর্ঘায়ুতে ভূমিকা রাখে।

"এটাকে একটি বাড়ির মতো কল্পনা করুন," বলছেন ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসা গবেষক, প্রফেসর শুন আউ। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধারণায় ঠান্ডা খাবার খাওয়া মানে আপনার বাড়িতে ঠান্ডা বাতাস ঢোকার মতো।

এই তত্ত্বটি আরও কিছু ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসা-নির্ভর পরামর্শকে ভিত্তি দেয়, যেমন—বাড়িতে উষ্ণ স্লিপার পরা এবং দিনের শুরুতে গরম নাশতা খাওয়া।

লোহার বেড়া দেওয়া একটি বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মারিয়াম খান। তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছেন এবং তার পরনে রয়েছে চশমা, একটি গোলাপি কলারওয়ালা শার্ট, একটি মেরুন রঙের জাম্পার ও একটি সবুজ জ্যাকেট।

ছবির উৎস, Maryam Khan

ছবির ক্যাপশান, একটি ঐতিহ্যগত সকালের রুটিন ব্যস্ত দিনের মাঝেও এক ধরনের মননশীলতার মুহূর্ত এনে দিতে পারে, বলছেন মরিয়ম খান

এই অভ্যাসগুলোই মারিয়াম খানের জন্য ছিল ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসাশাস্ত্রে আগ্রহী হয়ে ওঠার পথ। লন্ডনে বসবাসরত এই স্থাপত্য সহকারী প্রথম এ ধরনের ভিডিও দেখেন টিকটকে।

তিনি বলেন, ধীর, প্রবাহমান নড়াচড়া, গভীর শ্বাসপ্রশ্বাস ও ধ্যানের সমন্বয়ে গঠিত তাই-চি দিয়ে দিন শুরু করলে এবং প্রতিদিনের চিরচেনা কফির বদলে গরম পানি পান করলে তিনি উপকার অনুভব করেন।

"ক্যাফেইন খাওয়ার পরপরই যে আমি বেশ বমিভাব অনুভব করতাম, তা আগে বুঝতে পারিনি," তিনি বলেন।

"তারপর আমি সাধারণ গরম পানি খেতে শুরু করি—কখনও এতে পুদিনা, লেবু দিতাম… আর এতে নিজেকে বেশ সতেজ লাগত," তিনি বলেন।

কাঠের টেবিলের ওপর রাখা একটি কাপে গরম পানি ঢালছেন একজন নারী, পাশে আরেকটি কাপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে

ছবির উৎস, Getty Images

মানুষ কেন ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার প্রতি ঝুঁকছে?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অনলাইনে ঐতিহ্যবাহী চীনা জীবনধারার টিপস নিয়ে আগ্রহ এক বিস্তৃত সামাজিক প্রবণতাকে প্রতিফলিত করে, বলছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গ্লোবাল ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন সেন্টারের অন্তর্বর্তী পরিচালক ড. শ্যামা কুরুবিলা।

"ইউরোপেও জনসংখ্যাভিত্তিক গবেষণা হয়েছে… জার্মানির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ মানুষ—হয়তো আরও বেশি—কোনো না কোনো ধরনের ঐতিহ্যবাহী বা পরিপূরক সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবহার করে। আর কিছু দেশে—চীন, ভারতে এই হার ৯০ শতাংশের বেশি হতে পারে," তিনি ব্যাখ্যা করেন।

আধুনিক চিকিৎসার প্রতি কিছু মানুষের অনাস্থা রয়েছে—যা আংশিকভাবে কোভিড মহামারির সময় গঠিত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণায় দেখা যায়, সেখানে জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে চিকিৎসক ও হাসপাতালের প্রতি আস্থা ২০২০ সালের ৭০ শতাংশের ওপর থেকে ২০২৪ সালে নেমে দাঁড়ায় প্রায় ৪০ শতাংশে।

আরও কিছু মানুষের কাছে বায়োমেডিকেল বা জৈব-চিকিৎসা সেবার প্রবেশাধিকার নেই, অথবা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাকে তুলনামূলকভাবে সস্তা বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেন।

এ ছাড়া অনেকেই ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার প্রতি আকৃষ্ট হন কারণ এতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। গরম পানি পান করার অভ্যাসও তাদের জন্য এমন এক স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রথম ধাপ হতে পারে, যেখানে দেহ–মন–পরিবেশের সামঞ্জস্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এই পদ্ধতিগুলোর গভীরে বহু মানুষের জন্য সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যও রয়েছে।

"অনেক ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসক, আদিবাসী সম্প্রদায়ের অনেকে বলে থাকেন, 'আমরা তো হাজার বছর ধরে এটি ব্যবহার করছি… আমরা দেখেছি এটি মানুষের উপকারে আসে'," বলেন কুরুবিলা।

ডব্লিউএইচও–র গ্লোবাল ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন সেন্টার তথ্য-প্রমাণ মূল্যায়ন করে যাতে নীতিনির্ধারক ও রোগীদের জন্য দিকনির্দেশনা দেওয়া যায়।

এটি বিশাল কাজ—কারণ বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য গবেষণার বাজেটের এক শতাংশেরও কম ব্যয় হয় ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা নিয়ে গবেষণায়, তিনি বলেন।

"প্রমাণভিত্তি উন্নত করা অত্যন্ত জরুরি," তিনি বলেন।

ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা চেষ্টা করার আগে, রোগীদের তাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সঙ্গে কথা বলা উচিত—তাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার প্রেক্ষাপটে এটি নিরাপদ কি না তা যাচাই করার জন্যই এটা দরকার, বলেন এই ডব্লিউএইচও বিশেষজ্ঞ।

তবে গরম পানি পান করার বিষয়টি কী? যদিও এ নিয়ে ডব্লিউএইচও–র সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই, তবে কুরুবিলা বলেন, এটি নির্ভর করে পানির তাপমাত্রা, কতটা পানি পান করা হচ্ছে এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্য–অবস্থার ওপর।

"সবকিছুই… প্রমাণ ও সামঞ্জস্যের ওপর নির্ভর করে," তিনি জোর দিয়ে বলেন।

একজন নরারী একটি মগ ধরে আছেন যেটি থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সামাজিক মাধ্যমে যে দাবিগুলো করা হয় যে গরম পানি পান করলে চর্বি পোড়ে, বিপাকক্রিয়া বাড়ে বা শরীর 'ডিটক্স' হয়—এগুলোর কোনো প্রমাণ নেই বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বিজ্ঞান কী বলছে?

গরম পানি পান করা কিছু উপকার দিতে পারে, বলেন ড. রোজি ব্রুকস, যিনি একজন জিপি এবং লংজেভিটি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।

"হজমে সামান্য উপকার হয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতেও কিছুটা সাহায্য করে," তিনি বলেন।

তিনি আরও জানান, অল্প কিছু প্রমাণ রয়েছে যে গরম পানি ইসোফ্যাগাস—যা গলা থেকে পাকস্থলীর সংযোগকারী নালী—সেখানে স্পাজম শান্ত করতে সহায়তা করতে পারে।

"কিন্তু অন্যথায়, ঠান্ডা হোক বা গরম—পানি পান মানে শরীরকে হাইড্রেট রাখা," তিনি ব্যাখ্যা করেন।

"ঠান্ডা পানি স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে—এমন কোনো প্রমাণও নেই," বলেন ড. সেলিনা গ্রে, যিনি যুক্তরাজ্যের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ড. হেলেন মেডিকেল–এর জেনারেল প্র্যাকটিশনার ও লাইফস্টাইল ফিজিশিয়ান।

তিনি জোর দিয়ে এটাও বলেন, সামাজিক মাধ্যমে যে দাবিগুলো করা হয় যে গরম পানি পান করলে চর্বি পোড়ে, বিপাকক্রিয়া বাড়ে বা শরীর 'ডিটক্স' হয়—এগুলোর কোনো প্রমাণ নেই।

"যদি কেউ গরম পানিকে বেশি পছন্দ করে এবং এর ফলে তারা বেশি পানি পান করে—তাহলে এটি ভালোই; কিন্তু এটি কোনো বিপাকীয় শর্টকাট নয়," যোগ করেন তিনি।

সিঙ্গাপুরে বড় হয়ে ওঠা গ্রে বলেন, যেখানে ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসাশাস্ত্র প্রচলিত—"আজও আমি মায়ের সেই কথা শুনতে পাই, 'ভেতরটা গরম রাখতে গরম পানি খাও'।"

"এই ঐতিহ্যগুলো এমন রুটিন দেয়, যা স্বাভাবিক মনে হয়, সহজলভ্য মনে হয়, আর সাংস্কৃতিক দিক থেকেও অর্থবহ," তিনি বলেন।

ধীরে চলার সুযোগ

গরম পানি পান নিয়ে প্রমাণ যদিও সীমিত, গবেষণায় দেখা গেছে যে অন্য কিছু ঐতিহ্যবাহী অভ্যাস উপকারী হতে পারে।

পরিপূর্ণ উপাদানে রান্না করা গরম নাশতা ঠান্ডা সিরিয়ালের চেয়ে পুষ্টিগুণে বেশি সমৃদ্ধ হতে পারে।

পা ঠান্ডা রাখলে রোগ হয়—এমন প্রমাণ নেই, তবে শরীর গরম ও আরামদায়ক থাকলে মানুষ বেশি স্বস্তি অনুভব করে এবং ঘুমও ভালো হয়।

আর কয়েকটি ছোট হলেও মানসম্মত গবেষণায় দেখা গেছে, ঐতিহ্যবাহী চীনা তাই-চি ও চিগং অনুশীলন শক্তি ও চলাচলের সক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

প্রফেসর শান অউ ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছেন এবং সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন। তার পরনে কলারওয়ালা শার্ট ও চশমা।

ছবির উৎস, Prof Shun Au

ছবির ক্যাপশান, "চি" বা শক্তিকে ধরে রাখা—ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসার মূল ধারণা

"প্রায়ই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মন ছুটে চলে… আমাদের শরীর আর মন যেন দুই ভিন্ন জায়গায় থাকে," বলেন চীনা চিকিৎসাবিদ অউ।

"ধ্যান, চিগং ও তাই-চির মূল লক্ষ্যই হলো এই গতি ধীর করা," তিনি যোগ করেন।

যদিও ব্রুকস মনে করেন না যে গরম পানি পান করা বিশেষ কোনো স্বাস্থ্যগত সুবিধা দেয়, তিনি স্বীকার করেন এটি মানসিকভাবে সহায়ক হতে পারে।

"এটা এক ধরনের রুটিন… যা আপনাকে নিজের জন্য কিছুটা সময় দেয়—যা ব্যস্ত জীবনে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই," তিনি বলেন।

খান বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যে এর ইতিবাচক প্রভাব তিনি অনুভব করেছেন এবং সকালে গরম পানি পান করাকে তিনি নিজের জন্য কিছু সময় নেওয়ার অংশ হিসেবে দেখেন।

"আমি এটিকে ধীরে চলার, চারপাশকে উপলব্ধি করার এবং কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে দিন শুরু করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখি।"