হিন্দু মন্দিরে ভারতের টি-২০ বিশ্বকাপের ট্রফি নিয়ে যাওয়াকে ঘিরে বিতর্ক

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, সাবেক ক্রিকেটার কীর্তি আজাদের (ডানে) বক্তব্যে ক্ষুব্ধ কোচ গৌতম গম্ভীর (বাঁয়ে)
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ট্রফি মন্দিরে নিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন ভারতের সাবেক ক্রিকেটার ও বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেস দলের সংসদ সদস্য কীর্তি আজাদ। পাল্টা জবাব দিয়েছেন কোচ গৌতম গম্ভীর ও ঈশান কিষান, যাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় ক্রিকেটমহলে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

কপিল দেবের নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী টিমের সদস্য ছিলেন কীর্তি আজাদ। তিনি বলেছেন ওই টিমে যেহেতু হিন্দু, মুসলমান, শিখ ও খ্রিস্টান ধর্মের খেলোয়াড়রা ছিলেন, তাই মন্দিরে ট্রফি নিয়ে যাওয়া ভারতীয় টিমের জন্য লজ্জাজনক।

কীর্তি আজাদের এই বক্তব্য শুধু খেলার জগতে নয়, রাজনৈতিক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।

গুজরাটের আহমেদাবাদে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে, ৮ই মার্চ রোববার নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচে জয়লাভ করে ভারত।

তার পরের দিন ট্রফিটি নিয়ে আহমেদাবাদের একটি হনুমান মন্দিরে যান ক্যাপ্টেন সূর্যকুমার ইয়াদভ ও কোচ গৌতম গম্ভীর। সঙ্গে ছিলেন আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ।

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, মন্দিরে সূর্যকুমার ইয়াদভ, জয় শাহ ও গৌতম গম্ভীর

কীর্তি আজাদের পোস্ট

সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্ট শেয়ার করে কীর্তি আজাদ লেখেন, "শেইম অন টিম ইন্ডিয়া। আমরা ১৯৮৩ সালে কপিল দেবের নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জিতেছি। আমাদের টিমে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান ও শিখ ধর্মাবলম্বী মানুষ ছিলেন।"

"আমরা ট্রফিটি আমাদের জন্মভূমি তথা মাতৃভূমি ভারতে নিয়ে এসেছিলাম।"

"কিন্তু এখন কেন ট্রফিকে মন্দিরে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? মসজিদ, চার্চ বা গুরুদ্বারাতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না কেন?"

Skip X post
X কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: বিবিসির নয় এমন ওয়েবসাইটের কনটেন্টের জন্য বিবিসি দায়ী না

End of X post

আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহকে তীক্ষ্ণ আক্রমণ করে কীর্তি আজাদ লেখেন, "দলটা ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে, জয় শাহের পরিবারের নয়।"

প্রসঙ্গত, আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপির শীর্ষ নেতা অমিত শাহের পুত্র।

"সিরাজ ট্রফিটিকে কখনো মসজিদে নিয়ে যাননি, সঞ্জু চার্চেও নিয়ে যাননি। ট্রফিটি সব ধর্মের ১৪০ কোটি ভারতীয়র। কোনও একটি ধর্মের নয়", বলে পোস্টটি শেষ করেন মি আজাদ।

কী প্রতিক্রিয়া কোচ গৌতম গম্ভীর, ঈশান কিষানের

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সংবাদ সংস্থা এএনআই-এর একটি পডকাস্টে এসে মি. গম্ভীর জানিয়েছেন, "এই ব্যাপারে আমি আর কী বলব। এর উত্তর দেওয়া অপ্রয়োজন।"

তার কথায়, "আপনার প্রশ্নের উত্তরে এটাই বলতে পারি যে, এটি আমাদের দেশের জন্য একটি বিরাট বড় মুহূর্ত। আমার মনে হয়েছে কাপ জয়ের উৎসব পালন করা উচিত। এই প্রসঙ্গটি তোলা অনুচিত কারণ এতে তাঁদের (টিম ইন্ডিয়ার খেলোয়াড়দের) জয়ের আনন্দকে ছোট করা হয়।"

"আপনি যদি আমাদের ১৫ জন ছেলের জয়ের আনন্দকে খাটো করতে চান, কাল আবার অন্য কেউ নতুন কোনো বয়ান দেবে। এই সব বিষয়ে আমরা বেশি মাথা ঘামালে টিমের জন্য সেটা হিতকর নয়," বলেছেন মি. গম্ভীর।

দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ম্যাচে হারের পরে ভারতীয় টিম চাপে ছিল বলে জানান কোচ গৌতম গম্ভীর। তবুও তাঁরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।

মি. গম্ভীরের মতে, এই ধরনের বয়ান তাঁদের সাফল্যকে 'ডিগ্রেড' করবে।

ম্যাচ জয়ের পরে পাটনা এয়ারপোর্ট পৌঁছে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন খেলোয়াড় ঈশান কিষান।

কীর্তি আজাদের উত্থাপিত প্রশ্নের প্রসঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, "আমরা কত সুন্দর ম্যাচ জিতেছি। ভাল কিছু প্রশ্ন করুন। কীর্তি আজাদ কী বলেছেন তাতে আমি কী বলতে পারি?"

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, এএনআই-এর পডকাস্টে গৌতম গম্ভীর

শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক

কীর্তি আজাদকে সমর্থন জানিয়ে কংগ্রেস সংসদ সদস্য তারিক আনোয়ার বলেছেন, "কীর্তি একদম সঠিক বলেছেন। তাঁর সম্পূর্ণ বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত।"

"ট্রফি নিয়ে মন্দির-মসজিদের মতো ধার্মিক জায়গায় যাওয়ার কোনো পরম্পরা আমাদের নেই। এটি ভুল পরম্পরার সূচনা করবে," বলেছেন ওই কংগ্রেস নেতা।

অবশ্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং বলেন, "এটি কে করেছেন আমি জানি না, তবে ভারতের পরিচয় সনাতনী পরম্পরার সঙ্গেই যুক্ত। মুসলমান বা খ্রিস্টান ধর্মের সঙ্গে নয়।"

শিবসেনা নেতা কৃষ্ণা হেগড়ে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, "এই ঘটনাকে ধর্মের সঙ্গে জুড়ে দেখাটা ঠিক নয়। জয় করা ট্রফি যেখানে খুশি নিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা ভারতীয় টিমের আছে।"

"এতে কীর্তি আজাদের অনুমতির দরকার নেই। এই রকম উস্কানিমূলক ভাষণ দিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরি করছেন। এটি করা উচিত নয়", বলেন মি হেগড়ে।

কীর্তি আজাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার ও বর্তমানে আম আদমি পার্টির রাজ্যসভা সাংসদ হরভজন সিংও।

তাঁর বক্তব্য, "ওঁর কথা শোনার কোনো প্রয়োজন নেই। খেলা আর রাজনীতিকে আলাদা রাখলেই ভাল। আপনি আপনার আস্থা অনুযায়ী মন্দির, মসজিদ, গুরুদ্বারা যেখানে খুশি যান। যদি তাঁরা (ভারতীয় টিমের কোচ ও ক্যাপ্টেন) কোথাও গিয়ে থাকেন সেটা তাঁদের নিজস্ব ইচ্ছা।"

আহমেদাবাদের ওই হনুমান মন্দিরের মহন্ত ঈশ্বরদাস মহারাজ বলেছেন, "এটি আমাদের আস্থা, বিশ্বাস ও দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। যাঁরা এটি বোঝেন না তাঁরাই প্রশ্ন তোলেন।"

ছবির উৎস, Sanchit Khanna/Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তৃণমূলের সমাবেশে কীর্তি আজাদ (ফাইল ছবি)

কীর্তি আজাদ কে?

ইএসপিএন ক্রিকইনফো-র তথ্য অনুসারে, কীর্তি আজাদ একজন ডানহাতি ব্যাটসম্যান ও অফ-ব্রেক বোলার ছিলেন। তিনি ভারতের জন্য ৭টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন যাতে উনি মোট ১৩৫ রান করেছেন।

৬ ডিসেম্বর ১৯৮০ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ওয়ানডে ম্যাচে তিনি তাঁর ক্রিকেট কেরিয়ার শুরু করেন।

১৯৮১ সালে নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওয়েলিংটনে তিনি নিজের টেস্ট কেরিয়ারের সূচনা করেছিলেন।

২৫টি ওয়ানডে ম্যাচে তিনি ভারতের হয়ে খেলে তিনি মোট ২৬৯ রান করেছিলেন। ওয়ানডে ক্রিকেটে মি. আজাদের সর্বোচ্চ রান ছিল অপরাজেয় ৩৯।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খুব বেশি সাফল্যের মুখ দেখেননি কীর্তি আজাদ। তবে ১৯৮০ থেকে ১৯৯০-র মাঝামাঝি পর্যন্ত দিল্লি ক্রিকেট দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন কীর্তি আজাদ। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৯১-১৯৯২ সালে দিল্লি ১৬ বছর পরে রঞ্জি ট্রফি জিতেছিল।

২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ভারতের জাতীয় টিমের সিলেকশন কমিটিতে ছিলেন কীর্তি আজাদ।

ছবির উৎস, Sondeep Shankar/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন কোচ অংশুমান গায়কোয়াড়ের সাথে কীর্তি আজাদ (বামে) (আর্কাইভ)

তিনি ভারতীয় দলের সিলেকশন কমিটিতে থাকাকালীন এমএস ধোনি, পার্থিব প্যাটেল, এল বালাজি, আকাশ চোপড়া, ইরফান পাঠান, গৌতম গম্ভীর ও শ্রীসন্তের মতো খেলোয়াড়রা ভারতীয় টিমে জায়গা করে নিয়েছিলেন।

তবে আইপিএল টুর্নামেন্টের কট্টর সমালোচক বলে পরিচিত কীর্তি আজাদ। তিনি এই আইপিএলকে 'ফিক্সিং দুর্নীতির টুর্নামেন্ট' বলে কটাক্ষ করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন।

বিসিসিআই-এর সঙ্গে যুক্ত থাকায় তিনি লজ্জিত বলেও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছিলেন কীর্তি আজাদ।

ক্রিকেট থেকে অবসরের পরে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগদান করেন। তাঁর বাবা ভগবৎ ঝা আজাদ ১৯৮৮ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনকাল থেকেই কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ভগবৎ ঝা আজাদ।

রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে কয়েক বছর কীর্তি আজাদ বিজেপির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস পার্টির সদস্য ও পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান-দুর্গাপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য।