বাইক থেকে নৌযান, বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে যেসব ক্ষেত্রে

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ইরান যুদ্ধের জের ধরে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে এবং জীবনযাত্রার নানা ক্ষেত্রে প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট এর মধ্যেই বেড়েছে। পাশাপাশি শহরের রাইড শেয়ারিং থেকে শুরু করে গ্রামীণ ক্ষেতখামার, পরিবহন খাত, গ্রাম ও শহরের কর্মসংস্থান- বিভিন্ন ক্ষেত্রে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

তারা বলছেন, ধানের ফুল আসার এ সময়ে সেচ না দেওয়ার কারণে পানির ঘাটতি হলে সামনে সংকট তীব্রতর হওয়ার আশঙ্কা আছে, যদিও বৃষ্টি হওয়ার কারণে কিছুটা স্বস্তি এসেছে কৃষকদের মধ্যে।

আবার, কোনো কারণে ডিজেলের ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে কৃষকের সেচের পাম্প ছাড়াও সংকট হতে পারে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও। এর মধ্যেই কিছু এলাকায় পণ্যবাহী ট্রাকগুলো পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছে না বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে।

যদিও সরকার বলছে, ডিজেলের সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই এবং সরকারি হিসেবে শুক্র ও আজ শনিবার নতুন করে প্রায় ৬১ হাজার টন ডিজেল চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেছেন, এপ্রিল মাসে জ্বালানির কোনো সংকট হবে না- এটি তারা নিশ্চিত।

কিন্তু প্রভাব কেমন দেখা যাচ্ছে

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে। বরং মোটরসাইকেল ও গাড়ি নিয়ে তেলের জন্য অপেক্ষমাণ চালকদের লাইন দীর্ঘতর হচ্ছে।

আবার ঢাকার বাইরে থেকে পণ্য পরিবহনেও সংকটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

ছোটো-বড় পণ্যবাহী যান্ত্রিক নৌযানও একই ধরনের সমস্যায় পড়েছে বলে খবর আসছে। বিশেষ করে মালবাহী ট্রলারগুলো পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠছে।

ঢাকায় রাইড শেয়ারে বাইক চালান বনশ্রীর মোহাম্মদ শাহাব উদ্দিন। শনিবার ঢাকার গুলশানে যাত্রী নামানোর পর তিনি জানান, স্বাভাবিক সময়ে ৭/৮ ঘণ্টা বাইকে অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন করে তিনি যে আয় করতেন, এখন সেই একই পরিমাণ আয় হচ্ছে না ১৫ ঘণ্টাতেও।

"আগে পাম্পে গিয়ে চাহিদা অনুযায়ী তেল নিতাম। এখন খুঁজতে হয় কোন পাম্পে তেল দিচ্ছে। আপনি দেখেন বাইকই কমে গেছে রাস্তায়। কারণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা তো চলে যাচ্ছে তেলের জন্যই," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

এবার যুদ্ধ শুরুর পর পর সরকার যে রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছিল তাতে মোটরসাইকেল চালকদের একবারে দুশো টাকার তেল দেওয়া হতো। পরে মহানগর এলাকায় রাইড শেয়ার করা মোটরসাইকেলের জন্য এটি বাড়িয়ে দিনের সীমা সর্বোচ্চ পাঁচ লিটার করা হয়।

ওদিকে, শহরে রাইড শেয়ারের মতো তেলের সংকট তৈরি হয়েছে দেশের গ্রামীণ কৃষিখাতে ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে। বিশেষ করে এখন বোরো ধানের জন্য সেচ জরুরি হলেও অনেক জায়গাতেই সেচ পাম্পের জন্য ডিজেল মিলছে না।

মাগুরার কৃষক সুজন দাস বিবিসি বাংলাকে বলছেন, সামনে যারা পাট চাষের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তারাও প্রয়োজনীয় ডিজেলের অভাবে আশঙ্কায় পড়েছে।

"আমরা ডিজেলের জন্য পাম্পে যাচ্ছি। সামনে পাট চাষ করতে হবে। বিঘার পর বিঘা জমি আমাদের। অথচ এখন পাম্পে গেলে ১০ লিটার ডিজেল দেয়। সেচের জন্য ডিজেল না পেলে চাষ করতে পারবো না। তেল থাকার খবর পেলেই সেখানে যাচ্ছি। কিন্তু বাড়তি দামেও কেনা যাচ্ছে না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

আবার রাজশাহীর বানেশ্বরের আমচাষী জিল্লুর রহমান বলছেন, প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় তিনিসহ তার এলাকার অনেক চাষিই আমগাছে দরকারি স্প্রে করতে পারেননি।

"আপনার গাছগুলো দেখে যান। গাছে স্প্রে করতে হয় এই সময়টায়। কিন্তু আমরা পারিনি। সব নষ্ট হচ্ছে। এবার আমের ফলন খুবই কম হয়ে যাবে," বলেছেন মি. রহমান।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার রাণীখার গ্রামের দক্ষিণবিলে সেচ পাম্প চালান একই গ্রামের বাসিন্দা সৈয়দ ফোরকান। তিনি জানান, বাড়ির কাছের ধরখার বা তন্তর বাজারের বেশিরভাগ ডিজেলের দোকান এখন বন্ধ থাকে। যেগুলো খোলা থাকে সেগুলোতে চাহিদামতো তেল পাই না।

গত পুরো সপ্তাহে তিনি একাধিকবার বাজারে গিয়েও তেল পাননি দাবি করে বলেন, " আখাউড়ার মোগড়া বাজারে গিয়ে ১২ লিটার চাহিদার বিপরীতে পেয়েছি মাত্র পাঁচ লিটার। তবে এর জন্য প্রতি লিটারে অতিরিক্ত ২০ টাকা গুনতে হয়েছে"।

পাশের গ্রাম ঘোলখারের কৃষক হেলাল মিয়া বলেন, "ডিজেলের জন্য প্রতিদিন এক বাজার থেকে আরেক বাজারে ঘুরছি। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণ ডিজেল সংগ্রহ করতে পারছি না"।

তিনি জানান, এই সময়টা ধানের দানা গঠনের সময়। এসময়ে সেচ অব্যাহত না রাখলে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

তবে কিছু কিছু এলাকায় ডিজেল চালিত সেচের বদলের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সেচের কাজ করার চেষ্টা চলছে।

যশোর অঞ্চল শাক সবজিসহ নানা ফলনের জন্য সুপরিচিত। ওই জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলছেন, সেচের জন্য ডিজেলের ব্যবস্থা তারা করছেন।

"সেচ কার্যক্রমে আপাতত কোনো সমস্যা নেই। বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প আছে এবং সব পাম্পে লোক রাখা হয়েছে। আশা করি সমস্যা হবে না," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ও সমাজ গবেষক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলছেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলেও জ্বালানি সংকটের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব দেখা যেতে শুরু করেছে।

"বৃষ্টি হওয়ায় হয়তো সংকট তীব্র হয়নি। কিন্তু আর কিছুদিন পর যখন পানির চাহিদা আরও বাড়বে, তখন সংকট তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। সেচ সুবিধা স্বাভাবিক না হলে এর প্রভাব পড়বে কৃষি অর্থনীতিতে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবির বলছেন, পরিস্থিতির উত্তরণ না হলে কৃষি কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

"আর সেটি হলে সেবাখাতসহ সব সেক্টরই ক্ষতিগ্রস্ত হবে," বলেছেন মি. কবির।

ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওয়াকিলুর রহমান বলছেন, সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে এবং গত কয়দিন কিছু বৃষ্টিপাত হওয়ার সুফল পাওয়া যাবে।

"কিন্তু এরপরেও পানির ঘাটতি হলে কৃষির ক্ষতি হবে। যদিও আশা করি আমাদের কৃষকরা পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এটি ম্যানেজ করবে এবং সেচ ব্যবস্থা চলমান থাকবে। কমিউনিটি লেভেলের ট্রাস্টকে কাজে লাগিয়ে শস্যকে রক্ষা করতে হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. রহমান।

প্রসঙ্গত, জ্বালানি সংকটজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার অফিসের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে সকাল নয়টা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক লেনদেন সকাল নয়টা থেকে বিকাল তিনটা পর্যন্ত এবং দোকানপাট ও শপিংমলসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে বলে জানিয়েছে সরকার।

এছাড়া জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে সরকারি ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্তও সরকার নিয়েছে। হয়েছে। সেইসাথে, বিয়ে বা উৎসবে কোনো আলোকসজ্জা করা যাবে না বলে সরকার বলেছে।

গত দোসরা এপ্রিল সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই। তবে গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে প্রাথমিক অন্যান্য কারণসহ জ্বালানির ঘাটতির কারণে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিতে পারে। এ সময় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে।

তবে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ সরকার বিকল্প উৎস থেকেও আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং কাজাখস্তান থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে গত বৃহস্পতিবার জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।