শিব কুমার শর্মা: কাশ্মীরের লোকজ বাদ্যযন্ত্র সন্তুরকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে উন্নীত করেছিলেন শিব কুমার শর্মা
ছবির উৎস, Getty Images
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা
যে যন্ত্রের বাজনা শুনলেই মনে হয় যেন একটা পাহাড়ি নদীর স্রোত বয়ে চলেছে, সেই সন্তুর আর শিব কুমার শর্মা ছিলেন অবিচ্ছেদ্য। তবে মঙ্গলবার সকালে সেই যন্ত্র আর যন্ত্রীর বিচ্ছেদ ঘটল।
কাশ্মীরের লোকজ বাদ্যযন্ত্র সন্তুরকে শিবকুমার শর্মাই শাস্ত্রীয় বাদ্যযন্ত্রে উন্নীত করেন।
দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সঙ্গীত জগত শিব কুমার শর্মার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।
সরোদ শিল্পী ওস্তাদ আমজাদ আলি খান যেমন লিখেছেন পণ্ডিত শিব কুমার শর্মার প্রয়াণে একটি যুগের অবসান হল।
আরও পড়তে পারেন:
ছবির উৎস, Getty Images
'সন্তুরকে একটা শিখরে পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন শিব কুমার শর্মা'
মোহন-বীণা তারবাদ্যটির আবিষ্কারক বিশ্ব মোহন ভাট স্মরণ করছিলেন সন্তুর যন্ত্রটিকে কোথা থেকে কোথায় পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন শিব কুমার শর্মা, তা অনেকের কল্পনারও অতীত।
"সন্তুরকে একটা শিখরে পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন শিব কুমার শর্মা। কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিলেন যন্ত্রটিকে - এটা এক অনবদ্য কাহিনী। তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তার লয়কারীর জন্য, রাগদারির জন্য। এত কঠিন লয়কারী বোধহয় কোনও শিল্পীই ভাবতেই পারবেন না," জানাচ্ছিলেন বিশ্ব মোহন ভাট।
শিব কুমার শর্মার জন্ম হয় ১৯৩৮ সালের ১৩ জানুয়ারি জম্মুতে।
তার বাবা ছিলেন সেই সময়কার একজন নামকরা শিল্পী। বছর পাঁচেক বয়স থেকেই বাবার কাছে সঙ্গীত প্রশিক্ষণ শুরু মি. শর্মার।
সন্তুর শিক্ষার শুরু বাবার কাছে
কাশ্মীরি এই বাদ্যযন্ত্রটি তিনি শিখতে শুরু করেন ১৩ বছর বয়সে। সেই সময়ে তার বাবা উমা দাত শর্মা সন্তুর নিয়ে গবেষণা করছিলেন আর ওই লোকজ যন্ত্রটিকে কীভাবে শাস্ত্রীয় বাদ্যযন্ত্রে রূপান্তরিত করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছিলেন। তা থেকেই নিজের ছেলেকে তিনি সন্তুরের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন।
ছবির উৎস, Getty Images
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গবেষক অম্লান দাশগুপ্ত বলছিলেন ওই যন্ত্রটি থেকে কীভাবে এরকম সুর বার করতেন শিব কুমার শর্মা, তা অবাক করে দেবার মত।
"ওই যন্ত্রটা থেকে কীভাবে যে উনি শব্দ তৈরি করতেন, তা আমাদের অবাক করত। তবে এরকম বাদ্যযন্ত্রকে আরও কেউ কেউ জনপ্রিয় করে তুলেছেন। যন্ত্রটাকে পরিচিত করেছিলেন বলে নয়, নিজের সাংগীতিক চিন্তা কীভাবে প্রকাশ করতেন, সেটাই বড় কথা। ওর ক্ষেত্রে নিজের সঙ্গীত ভাবনাকে প্রকাশ করার মাধ্যম হিসাবে তিনি যন্ত্রটাকে ব্যবহার করেছেন," বলছিলেন অধ্যাপক দাশগুপ্ত।
তার কথায়, "সেটাই শিব কুমার শর্মার সব থেকে বড় কন্ট্রিবিউশন বলে আমি মনে করি।"
'কাশ্মীরিয়াৎ জীবন্ত হয়ে উঠত তার সঙ্গীতে'
কাশ্মীরি ওই শিল্পী একটা পর্যায়ে মুম্বাইতে বাস করতে শুরু করেন আর তার মাধ্যমে সন্তুরের পরিচিতিও বাড়তে থাকে।
তবে রবিশঙ্করের একটি জীবনী গ্রন্থের লেখক ও সঙ্গীত গবেষক শঙ্করলাল ভট্টাচার্য বলছিলেন কাশ্মীরিয়াৎ বা কাশ্মীরের মানুষের আদব-কায়দা ফুটে উঠত শিব কুমার শর্মার সঙ্গীতের মাধ্যমে।
ছবির উৎস, Getty Images
"কাশ্মীর মানেই একটা সংঘাত, একটা রাজনীতি। তবে কাশ্মীরের আওয়াজ বলতে যদি কিছু বোঝায়, যাকে কাশ্মীরিয়াৎ বলে, সেটাই বেরিয়ে আসত তার সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে। কাশ্মীরের মানুষদের প্রতি যে আরও শ্রদ্ধা-ভালবাসা, অন্তরঙ্গতা থাকা উচিত, সেটাই বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন এই কাশ্মীরি ভদ্রলোক," বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জগতে যেমন সন্তুর যন্ত্রটিকে তিনি পরিচিত করাতে থাকেন, তেমনি দেশ বিদেশেও তার অনুষ্ঠান বিস্তৃতি পেতে থাকে। বলিউডের সিনেমাতেও কাজ করতে থাকেন তিনি।
শিব - হরি জুটি
শিব কুমারে শর্মা সঙ্গীত পরিচালনা করেন বেশ কিছু সিনেমাতেও - তার সঙ্গী ছিলেন প্রখ্যাত বাঁশি শিল্পী হরি প্রসাদ চৌরাসিয়া।
শিব-হরি জুটির সন্তুর আর বাঁশির এই যুগলবন্দী যেমন ছিল সঙ্গীত প্রেমীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়, তেমনই এই দুই শিল্পী ছিলেন অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। আবার দুজনেই পণ্ডিত রবিশঙ্করের খুব প্রিয় ছিলেন।
আবার দিকপাল তবলা বাদক জাকির হুসেইনের সঙ্গেও শিব কুমার শর্মার যুগলবন্দী সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে ছিল খুবই লোভনীয় উপস্থাপনা।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের কথায়, শিব কুমার শর্মা আর হরি প্রসাদ চৌরাসিয়া - এই দুজনের প্রায় একক প্রচেষ্টায় দুটি যন্ত্র হয়ে উঠেছে ভারতের সর্বোচ্চ মানের সঙ্গীত যন্ত্র।
ছবির উৎস, Getty Images
'বাজনা শুনলেই মনে হত যেন জলের মধ্যে দিয়ে আওয়াজ বেরিয়ে আসছে'
"সন্তুরটা একেবারেই লৌকিক যন্ত্র। কিন্তু শিব কুমার শর্মা যা করলেন, তা হল একেবারে সেতার সরোদের মতো শাস্ত্রীয় যন্ত্রের পাশাপাশি বাজানোর জায়গায় পৌঁছিয়ে দিলেন। বাজনা শুনলেই মনে হত যেন জলের মধ্যে দিয়ে আওয়াজ বেরিয়ে আসছে। আর তিনি সেটাকে ক্যাপচার করতেন," বলছিলেন মি. শঙ্করলাল ভট্টাচার্য।
ওই শিব-হরি জুটির একজনের বাজনা আজ বন্ধ হল।
তার দুই পুত্র - রোহিত ও রাহুল জানিয়েছেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বুধবার তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে মুম্বাইতে।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট