কেন মন্দির বানানোর পক্ষে রায় দিল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট?

ছবির উৎস, ROBERT NICKELSBERG

ছবির ক্যাপশান, বাবরি মসজিদ, যা ১৯৯২ সালে হিন্দু মৌলবাদীরা ভেঙে ফেলে
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি, কলকাতা

অযোধ্যায় বিতর্কিত ধর্মীয় স্থানটিতে একটি হিন্দু মন্দির বানানোর পক্ষেই রায় দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। এই রায়ের পক্ষে আদালতের যুক্তিগুলো কী ছিল?

সুপ্রিম কোর্টের ৫ সদস্যের বেঞ্চ এক সর্বসম্মত রায়ে বলেছে, অযোধ্যার যে ২.৭৭ একর জমি নিয়ে বিতর্ক ছিল বহুকাল ধরে সেখানে রামমন্দিরই হবে। আর মুসলমানদের মসজিদের জন্য ৫ একর জমি দেওয়ার নির্দেশও দেয়া হয় রায়ে।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে যে কীসের ভিত্তিতে ওই রায় দিল সর্বোচ্চ আদালত। বেঞ্চ নিজেই এই প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছে।

এক হাজার পঁয়তাল্লিশ পাতার ওই রায়ের প্রায় শেষের দিকে আদালত বলেছে: তাদের সিদ্ধান্তের অন্যতম মূল ভিত্তি ছিল পুরাতাত্বিক প্রমাণসমূহ।

ভারতীয় পুরাতাত্বিক দফতর বা আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া যে সব প্রমাণ পেশ করেছে আদালতের কাছে, তা থেকে স্পষ্ট যে খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকেও অযোধ্যার ওই অঞ্চলে একাধিক সভ্যতা ছিল। সে সব নিদর্শন মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে।

দ্বাদশ শতকের একটি বড় কাঠামো মাটির নীচে পাওয়া গেছে, যেটি মোট ৮৫টি স্তম্ভ ছিল।

রায়ে বলা হয়, ওই কাঠামোটি হিন্দু ধর্মের কোনও স্থাপনা হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। যে মসজিদ নিয়ে বিতর্ক, সেটির ভিত তৈরি হয়েছিল আগে থেকে নির্মিত কোনও কাঠামোর ওপরে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আদালতের রায়ে বলা হয় ভারতের হিন্দুরা বিশ্বাস করে যে অযোধ্যার ওই জায়গাটি ভগবান রামচন্দ্রের জ্ন্মভূমি

ধাপে ধাপে যখন খনন কার্য চালানো হয়েছে, তখন একটি গোল উপাসনাস্থল পাওয়া গেছে, যেখানে একটি 'মকর প্রণালী'ও ছিল। সেখানে অষ্টম থেকে দশম শতাব্দী সময়কালে হিন্দুরা পুজো করতেন এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।

রায়ে বলা হয়, যদিও পুরাতাত্বিক জরিপ সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী মন্দিরের মতো একটি কাঠামো পাওয়া গেছে, তবে সেই রিপোর্টে এটা স্পষ্ট হয় নি যে ওই পুরনো কাঠামোটি কীভাবে ধ্বংস হয়েছিল।

তা ছাড়া 'ওই কাঠামোটি ভেঙেই মসজিদ তৈরী হয়েছিল কি না', সেই প্রমাণও পাওয়া যায় নি।

ছবির উৎস, Hulton Deutsch

ছবির ক্যাপশান, পুরনো ছবিতে বাবরি মসজিদ

রিপোর্টটিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ 'টাইম গ্যাপ' রয়েছে বলেও আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়।

আদালত বলেছে, মাটির নীচে থাকা পুরনো কাঠামোটি যদি দ্বাদশ শতাব্দীর হয়, তাহলে ষোড়শ শতাব্দীতে মসজিদ তৈরির সময়ের সঙ্গে চারশো বছরের একটা ফারাক থাকছে।

ওই চারশো বছরে কী হয়েছিল, তা জানা যায় না রিপোর্ট থেকে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিতর্কিত ওই জায়গাটিতে একটি রামমন্দির নির্মাণের জন্য আগে থেকেই বানিয়ে রাখা হয়েছে পাথরের স্তম্ভ

পুরাতত্ব সর্বেক্ষণ বা এ এস আইয়ের রিপোর্ট থেকে বারে বারে উদ্ধৃত করলেও আদালতের রায়ে বলা হয়, শুধুমাত্র পুরাতাত্বিক প্রমাণের ওপরে কোনও আদালত জমির মালিকানা নির্ধারণ করতে পারে না।

সেজন্য ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে অষ্টাদশ শতাব্দীর দুই পর্যটকের লেখাকেও আমলে নিয়েছে কোর্ট। সেগুলি থেকে আদালত কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেছে:

প্রথমত, হিন্দুরা বিশ্বাস করেন যে বিতর্কিত জমিটিতেই ভগবান রামের জন্ম হয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, আশেপাশের কয়েকটি উপাসনাস্থল - যেমন সীতা রসোই, স্বর্গদ্বার প্রভৃতি দেখেও মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে ওই জায়গাতেই ভগবান রামের জন্ম হয়েছিল।

তৃতীয়ত, বিতর্কিত জমিটিতে যে পুজা-অর্চনা হত, আর নানা ধর্মীয় উৎসবে ওই জায়গায় বহু মানুষের সমাগম হত।

চতুর্থত, ব্রিটিশরা আওধের (অযোধ্যা) দখল নেওয়ার আগে থেকেই ভক্ত সমাগম আর পুজো হত ওই জমিতে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাবরি মসজিদ ভাঙার পর ভারতে দাঙ্গায় অন্তত ২ হাজার লোক নিহত হয়

আদালতের কাছে যা তথ্য প্রমাণ হাজির করা হয়েছে, তা বিচারপতিদের সিদ্ধান্ত যে, মসজিদ থাকা সত্বেও হিন্দুরা সেখানে পুজা-অর্চনা করা বন্ধ করে দেন নি।

আবার সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড যে প্রমাণ হাজির করেছে, তা থেকে স্পষ্ট হয় যে মসজিদে নামাজ পড়া শুরু হয় ১৮৫৬-৫৭ সাল থেকে।

দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ সরকার একটি ইঁটের দেওয়াল তৈরি করে দেয়।

এই বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট এটাও বলেছে যে "ষোড়শ শতাব্দীতে যে সেখানে একটি মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল, যার ওপরে 'আল্লাহ' শব্দটি খোদাই করা ছিল, সেটাও অস্বীকার করা যায় না।"

শীর্ষ আদালত মন্তব্য করেছে, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর সেটি ধ্বংস করাটাও ছিল আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।

বিবিসি বাংলায় আরো খবর: