'পোশাক কারখানায় নিরাপত্তা দিতে সরকার এখনো প্রস্তুত নয়' - আন্তর্জাতিক গবেষণা
ছবির উৎস, Kristof Vadino/ Clean Clothes
ক্লিন ক্লোদস সহ আন্তর্জাতিক কয়েকটি শ্রমিক অধিকার সংগঠনের এক গবেষণা রিপোর্টে বলা হচ্ছে বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে সেদেশের সরকার এখনো একেবারই প্রস্তুত নয়।
সরকারের পরিদর্শন এবং নজরদারি ব্যবস্থা এখনো কতটা দুর্বল তা প্রমাণ করতে এই গবেষণায় ২৪শে ফেব্রুয়ারির চকবাজার অগ্নিকান্ড এবং চৌঠা মার্চ আশুলিয়ায় আনজির নামে একটি পোশাক কারখানায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চারটি শ্রম অধিকার সংগঠন - ক্লিন ক্লোদস, আন্তর্জাতিক লেবার রাইটস ফোরাম, মারকুইয়া সলিডারিটি ফোরাম এবং ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়াম - ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে এই গবেষণাটি চালিয়েছে।
মূলত এই সংগঠনগুলোর চাপেই পোশাক ক্রেতাদের প্রতিনিধি হিসেবে দুটি সংস্থা - আ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্স - বাংলাদেশে শত শত গার্মেন্ট কারাখানায় গত কয়েক বছর ধরে ব্যাপক পরিদর্শন করে নিরাপত্তার ঘাটতি সংশোধনে সুপারিশ করেছে। সেই সাথে সংশোধন করা হয়েছে কিনা সেটাও নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু অ্যাকর্ডের কার্যক্রম বন্ধ করার দাবি করে একজন পোশাক ব্যবসায়ীর করা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আগে ঐ গবেষণায় বলা হচ্ছে আ্যাকর্ড চলে গেলে বাংলাদেশে শ্রমিকদের নিরাপত্তা বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
বাংলাদেশের পোশাক কারখানার মালিকরা দাবি করেন, পোশাক কারখানার নিরাপত্তা পরিদর্শন করার সক্ষমতা এখন সরকারের হয়েছে, ফলে বিদেশীদের ভূমিকার এখন আর প্রয়োজন নেই। সরকারের ভেতরেও অনেকেই ধরনের মনোভাব জোরালো হচ্ছে।
তবে শ্রম অধিকার সংগঠনগুলোর গবেষণায় রিপোর্টে বলা হচ্ছে, শত শত পোশাক কারখানায় অগ্নি নিরাপত্তা সহ অন্যান্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে এখনো বড় প্রশ্ন রয়েছে। তাছাড়া, সরকারি আওতাধীন কারখানাগুলোতে পরিদর্শনের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ছবির উৎস, Reuters
গবেষণা রিপোর্টে বলা হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের ভিন্ন ভিন্ন দুটো ডাটাবেজে পোশাক কারখানায় পরিদর্শন এবং নিরাপত্তার ঘাটতি সংশোধন নিয়ে যে সব তথ্য রয়েছে সেগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য নেই। তাছাড়া, প্রথম পরিদর্শনের পর করা সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে কিনা তা দেখার জন্য ফলো-আপ পরিদর্শন সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই ।
বলা হয়েছে - যে ৭৪৫টি কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের হাতে ছিল, গত তিন থেকে পাঁচ বছরেও সেসব কারখানার অনেকগুলোতেই বেরুনোর দরজায় তালা লাগিয়ে রাখার মতো মারাত্মক কিছু নিরাপত্তা ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে।
১১৪টি পোশাক কারখানায় নিরাপত্তার জন্য এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল যে আ্যাকর্ড সেগুলোকে তাদের পরিদর্শন কার্যক্রম থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছিল, অর্থাৎ সেগুলোকে কার্যত তালা লাগিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সোমবার প্রকাশিত গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে - সরকারি পরিদর্শনের আওতায় থাকলেও সেই ১১৪টি কারাখানার অর্ধেকই এখনও চালু রয়েছে।
রিপোর্টে আরও বলা হচ্ছে ২০১৩ সালে থেকে বিভিন্ন কারখানায় নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে আ্যাকর্ড যেখানে ১১৫২ টি অভিযোগ পেয়েছেন, সরকার পেয়েছে মাত্র ১৮টি। বলা হচ্ছে- সরকারি ব্যবস্থাপনায় যেহেতু অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা হয়না, সেহেতু শ্রমিকরা অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেনা।
নিরাপত্তা সুপারিশ বাস্তবায়ন সম্পর্কে যে তথ্য বাংলাদেশের সরকার বিভিন্ন ফোরামে দিচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে এই গবেষণায়।
"বিভিন্ন পাবলিক ফোরামে সরকার বলছে নিরাপত্তার জন্য কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্ধন-পরিমার্জনের ২৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু সরকারের নিজস্ব ডেটা তা বলছে না। যে ৪০০ কারখানার তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ৩৪৬টি কারখানায় ২০ শতাংশ কাজ হয়েছে। ৫২টি কারখানার কোনও তথ্যই নেই।"
বাংলাদেশে অ্যাকর্ডের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া নিয়ে যে মামলাটি বাংলাদেশে হয়েছে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রোববার এই মামলায় রায় হওয়ার কথা রয়েছে।
শ্রমিক নেতা আমিরুল হক আমিন বিবিসিকে বলেছেন, সরকারি পরিদর্শন অস্বচ্ছ। "আ্যাকর্ড থাকলে বাংলাদেশের লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই।
বাংলাদেশ ছাড়ার জন্য আ্যাকর্ডের ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে তা নিয়ে এসপিরিটি, এইচ অ্যান্ড এম, আ্যাডিডাস সহ এক ডজনেরও বেশি বিদেশী ব্রান্ড উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
কি বলছে পোশাক খাত
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, গত পাঁচ বছরে দেশে পোশাক খাতে কোনো বড় দুর্ঘটনা হয়নি, ফলে আ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্সের নজরদারির এখন আর প্রয়োজন নেই।
বিজিএমইএ'র সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট শহিদুল্লাহ আজিম বিবিসিকে বলেন, "বাংলাদেশের পোশাক খাতকে নিরাপদ করতে অ্যাকর্ড অনেক ভালো কাজ করেছে, তবে এখন বাংলাদেশ সেই সক্ষমতা অর্জন করেছে।"
পোশাক রপ্তানিকারকদের অভিযোগ - এই দুই সংস্থা নিরাপত্তার জন্য যে সব ব্যবস্থা নিতে বলছে তাতে তাদের ব্যবসার খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ফলে, ভিয়েতনাম বা ভারতের মত দেশগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট