অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে রোগ সারছে না, বাংলাদেশের শিশুদের জন্য 'অশনি সংকেত'
ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
মিসেস তাসমিন নাহার মিথুনের আট বছরের মেয়ে গত কয়েকদিন ধরে ঢাকার শিশু হাসপাতালে আছে। সাধারণ ইউরিন ইনফেকশনের সমস্যা নিয়ে তাকে এখানে ভর্তি করা হয়েছিল।
কিন্তু ডাক্তারি পরীক্ষায় ধরা পড়ে যে মেয়েটি 'মাল্টিপল অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট' - অর্থাৎ তার শরীরের জীবাণু ধ্বংস করতে বেশ কয়েক ধরণের ওষুধ এখন আর কাজ করবে না।
এমন অবস্থায় চিকিৎসকরা তার মেয়ের জন্য কিছু ওষুধ দিয়ে পুনরায় পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন।
দ্বিতীয় পরীক্ষাতেও সেখানে দেখা যায় যে, শিশুটির শরীরে জীবাণু ধ্বংস করতে ওষুধটির যে শক্তিকে কাজ করার কথা ছিল, সেটা তেমনটা কাজ করছেনা।
এখন তৃতীয় ধাপের ওষুধ ও ডাক্তারি পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে মিসেস মিথুনের মেয়েকে। তার পুরোপুরি সেরে ওঠা নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা জানান মিসেস মিথুন,
"ইউরিন কালচারে ১৮টা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে টেস্ট করা হয় এর মধ্যে ১১টাই রেসিস্ট্যান্ট আসে। যেগুলো রেসিস্ট্যান্ট নয়, সেগুলোর মধ্যে একটা ঠিকমতো কাজ করছে না। আমি ভাবতেও পারিনি, আমার মেয়ের এমন অবস্থা হবে" - বলছিলেন মিসেস তাসমিন নাহার।
আরও পড়তে পারেন:
ছবির উৎস, NurPhoto
সম্প্রতি ঢাকার একটি হাসপাতালে এক নবজাতকের মেডিকেল পরীক্ষাতেও দেখা যায় যে শিশুটি প্রায় ১৮টি অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট।
এ থেকে ধারণা করা যায় যে, এই অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স বাংলাদেশের জন্য এখন নতুন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স কি?
চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে অ্যান্টিবায়োটিক হচ্ছে সেই সব ঔষধ - যা রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা পরজীবী ধ্বংস করে।
এখন এই ওষুধ যদি সঠিক নিয়মে প্রয়োগ করা না হয় - তাহলে এক পর্যায়ে ওই জীবাণু সেই ওষুধের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। ফলে সেই ওষুধে আর কোন কাজ হয়না।
একেই বলে 'অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স' - অর্থাৎ যখন ব্যাকটেরিয়ার ধ্বংস করার ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা থাকে না।
ছবির উৎস, NurPhoto
শিশুরা কেন এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট হয়?
আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী মনিরুল আলম জানান, প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি আসা রোগীদের একটি বড় অংশের মধ্যেই এই সমস্যা দেখা যায়।
"আমরা এরকম শিশুদের পরীক্ষা করেছি, যারা আমাদের কাছে আসার তিন মাস আগেও কোন অ্যান্টিবায়োটিক খায়নি। অথচ তাদের শরীরের ব্যাকটেরিয়াগুলো মাল্টিপল ড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট।"
"এর মানে শিশু এন্টিবায়োটিক না খেলেও প্রকৃতি-পরিবেশে থাকা এসব ড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট জীবাণু তাদের শরীরে প্রবেশ করছে এবং ওষুধ কাজ করছে না। অর্থাৎ আমরা কেউই অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট নই। শিশুরা তো নয়ই।"
বর্তমান পরিস্থিতিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ধরণের অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোঃ সায়েদুর রহমান।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, বিশ্বে যে হারে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা হচ্ছে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হারে বাড়ছে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স। যার ফলে অদূর ভবিষ্যতে সামান্য হাঁচি-কাশি-জ্বরেও মানুষের মৃত্যু ঝুঁকি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ড. সায়েদুর রহমান।
"একটা অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করতে লাগে ১৫ বছর, ওটার বিপরীতে ব্যাকটেরিয়া রেসিস্ট্যান্স হতে লাগে এক বছর। আগামী সাত বছরে দুইবারের বেশি অ্যান্টিবায়োটিক আসার সম্ভাবনা নেই। এক সময় দেখা যাবে, রোগের জীবাণুকে কোন ওষুধ দিয়েই ধ্বংস করা যাচ্ছে না।"
ছবির উৎস, Sean Gallup
পরিবেশে এই রেসিস্ট্যান্স কিভাবে তৈরি হয়?
শিশুদের এমন অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট হওয়ার পেছনে জেনেটিক বা বংশগত কোন কারণ না-ও থাকতে পারে।
তবে আমরা যেসব প্রাণীর মাংস বা শাকসবজি খাই - সেইসব প্রাণীর শরীরে বা সবজির উৎপাদনে যদি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, সেগুলো রেসিস্ট্যান্স তৈরি করে, যার প্রভাব মানুষের ওপর পড়ে।
ডা. রহমান জানান, "মানুষের প্রোটিনের জন্য যেহেতু, মাছ, মুরগি, গরু দরকার এবং সেগুলোকে সস্তায় বাঁচানোর জন্য অ্যান্টিবায়োটিক দরকার। অর্থাৎ মানুষকে তার প্রোটিনের জন্যে ভবিষ্যতকে ঝুঁকিগ্রস্ত করা হচ্ছে।"
এছাড়া হাসপাতাল থেকে শুরু করে রেসিস্ট্যান্ট ব্যক্তির হাঁচি-কাশি মল-মূত্র থেকেও তা ছড়াতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:
ছবির উৎস, NurPhoto
করণীয় কি?
চারটি প্রাথমিক সচেতনতা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে বলে জানান ড. সায়েদুর রহমান।
প্রথমত, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া এন্টিবায়োটিক কেনা/বিক্রি বন্ধ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সকল অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের প্যাকেটের রং লাল করতে হবে। এবং অন্যান্য ওষুধ থেকে আলাদা রাখতে হবে, যেন মানুষ সহজেই পার্থক্য করতে পারে।
তৃতীয়ত, অ্যান্টিবায়োটিকের ডোজ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাবেন না, ডোজ সম্পূর্ণ করতে হবে এবং নিয়ম মেনে খেতে হবে।
চতুর্থত, জ্বর, সর্দি, কাশি ও ডায়রিয়া এই চারটি রোগ সারাতে অ্যান্টিবায়োটিকের কোন প্রয়োজন নেই। তাই চিকিৎসককে এই চারটি কন্ডিশনে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, ওষুধ সেবন করার বিষয়ে যথার্থ জ্ঞান ও তার প্রয়োগের মাধ্যমে এই ভয়াবহ অভিশাপ ঠেকানো সম্ভব।
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট