ইয়েমেনে ইসরায়েলি হামলায় তাদের প্রধানমন্ত্রী নিহত হয়েছেন - নিশ্চিত করল হুথিরা

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিশ্চিত করেছে যে তাদের ঘােষণা করা প্রধানমন্ত্রী আহমেদ গালেব নাসের আল-রাহাভি চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন।

ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি জানিয়েছে যে, বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের রাজধানী সানায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফের হামলায় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া তাদের আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।

আইডিএফ জানিয়েছে, রাজধানী সানা এলাকায় একটি বৈঠকে অংশ নেওয়ার সময় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান হামলা চালিয়ে রাহাভিসহ হুথিদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের 'নিশ্চিহ্ন' করা হয়েছে।

২০১৪ সাল থেকে হুথি বিদ্রোহীরা উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর তারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সানা থেকে উৎখাত করে এবং দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

হুথিরা নিশ্চিত করেছে, ইসরায়েলি হামলায় প্রধানমন্ত্রী রাহাভিসহ তাদের কয়েকজন মন্ত্রী নিহত হয়েছেন। যদিও অন্যদের নাম প্রকাশ করা হয়নি।

সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যম আল-হাদাত জানিয়েছে যে, নিহতদের মধ্যে হুথিদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও বিচার, যুব ও ক্রীড়া, সামাজিক কল্যাণ এবং শ্রম মন্ত্রী রয়েছেন।

হুথিদের প্রেসিডেন্ট মাহদি আল-মাশাতের কার্যালয় জানিয়েছে, ওই হামলায় আরও বেশ কয়েকজন মন্ত্রী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ গুরুত্বরভাবেও আহত হয়েছেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হুথিদের উপ-প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ আহমেদ মিফতাহ রাহাভি দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন।

রাহাভি ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এই পদে ছিলেন। তবে তাকে মূলত প্রতীকী প্রধান হিসেবে দেখা হতো।

সামরিক অভিযান পরিকল্পনাসহ উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন না।

বৃহস্পতিবারের হামলায় হতাহতের মধ্যে হুথি আন্দোলনের সর্বোচ্চ নেতা আব্দুল-মালিক আল-হুথি, সেইসাথে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং কর্মী বাহিনীর প্রধানের নাম নেই বলেও জানা গেছে।

শনিবার রাতে এক বিবৃতিতে আইডিএফ জানিয়েছে যে, ওই বৈঠকের গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা হামলা চালায়।

তবে এখনও পুরো অভিযানের প্রভাব মূল্যায়ন চলছে - বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।

গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হুথিরা নিয়মিত ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে এবং লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজকে টার্গেট করে আসছে।

তাদের দাবি, এটি ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের অংশ।

জবাবে ইসরায়েলও হুথি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা চালাচ্ছে, যার উদ্দেশ্য হুথিদের হামলা সীমিত করা।

হুথি বিদ্রোহী কারা?

ইয়েমেনের সংখ্যালঘু শিয়া মুসলিম জায়েদিদের পক্ষে কথা বলা সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী হুথি।

তাদের দাবি, ইরান-নেতৃত্বাধীন "প্রতিরোধ অক্ষ"-এর অংশ তারা। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও বৃহত্তর পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এই অক্ষে হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো মধ্যপ্রাচ্যের আরও সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে তারা আনসারুল্লাহ, যার অর্থ আল্লাহর পক্ষে, নামে পরিচিত। নব্বইয়ের দশকে জন্ম নেওয়া গোষ্ঠীটির নাম এসেছে তাদের প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন আল-হুথির নাম থেকে। তার ভাই আবদুল মালিক আল-হুথি তাদের বর্তমান নেতা।

২০০০ সালের শুরুর দিকে হুথিরা ইয়েমেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহ এর বিরুদ্ধে একের পর এক বিদ্রোহ করে।

তারা দেশের উত্তরাঞ্চলে নিজেদের এলাকায় সালেহ এর কর্তৃত্ববাদী শাসনের বাইরে আরও স্বায়ত্তশাসন চাইছিল।

২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় হওয়া গণবিক্ষোভ প্রেসিডেন্ট সালেহকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে। সেসময় তার ডেপুটি আব্দ্রাব্বুহ মানসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।

হাদির শাসনকালে হুথিরা ক্ষমতাচ্যুত সালেহ ও তার অনুগত নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে জোট গঠন করে এবং উত্তরাঞ্চলের শাদা প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং রাজধানী সানা দখল করে।

২০১৫ সালে বিদ্রোহীরা পশ্চিম ইয়েমেনের বড় একটি অংশ দখল করে এবং প্রেসিডেন্টকে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করে।

প্রতিবেশী সৌদি আরবের শঙ্কা ছিল যে, হুথিরা পুরো ইয়েমেন দখল করে একে ইরানের প্রভাবাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করবে।

এ কারণে আরব দেশগুলোর একটি জোট গঠন করে সৌদি আরব ইয়েমেন যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে। কিন্তু বহু বছরের বিমান হামলা ও স্থলযুদ্ধ সত্ত্বেও অধিকৃত অধিকাংশ এলাকা থেকে হুথিদের সরানো যায়নি।

বর্তমানে সৌদি আরব হুথিদের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তির চেষ্টা করছে। আর ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি অস্ত্রবিরতি কার্যকর রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন এন্ড ইভেন্ট ডাটা প্রজেক্টের (এসিএলইডি) তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৪০ লক্ষের বেশি মানুষ।

ইটালিয়ান ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল স্টাডিজের মতে, ইরান ইয়েমেনে ড্রোন তৈরির কারখানা গড়ে তুলতে হুথিদের সহায়তা করেছে।

হুথিরা লেবাননের ইসলামপন্থী গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর কাছ থেকেও সামরিক পরামর্শ ও সহায়তা পেয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি একাডেমির যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কমব্যাটিং টেরোরিজম সেন্টার।

২০২৫ সালের জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় অতর্কিত হামলা চালায় ইসরায়েল। এর জবাবে ইরান ইসরায়েলের ওপর বিমান হামলা চালায়।

মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ১২ দিনের এই যুদ্ধ শেষ হয়। হামলার ফলে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্ভবত উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ইসরায়েল লেবাননের হিজবুল্লাহর উপর একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল।

ইরান এবং হিজবুল্লাহর উপর ইসরায়েলের আক্রমণ তাদের হুথি মিত্রদের যে কোনো সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ইসরায়েলের উপর বারবার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার জবাবে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বিমান হামলা চালায়।