আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
দিনে আট ঘণ্টার বেশি কাজের চাপ কি মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করে?
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- পড়ার সময়: ১০ মিনিট
অফিসে আট ঘণ্টা কাজের নিয়ম থাকলেও অনেক কর্মীকে দেখা যায়, তারা এর চাইতেও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন এবং সেটা নিয়মিত।
এভাবে দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ সংক্রান্ত প্রথম বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৬ সালে দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সাত লাখ ৪৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
জাপানে এর একটি নাম আছে 'কারোশি', যার মানে অতিরিক্ত কাজ করতে করতে মৃত্যু। সরকারিভাবেই কারোশিতে আক্রান্ত হয়ে ২০১৭ সালে ২৩৬ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে জাপান সরকার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় বলা হয়, দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানুষ।
যারা সপ্তাহে ৩৫ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজ করেন তাদের তুলনায় যারা সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করেন তাদের স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৫ শতাংশ বেড়ে যায় এবং হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৭ শতাংশ বেশি থাকে বলে গবেষণায় পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সঙ্গে যৌথভাবে করা এই গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় কাজের কারণে যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই মধ্যবয়সী বা বয়স্ক পুরুষ।
অনেক ক্ষেত্রে, দীর্ঘ সময় কাজ করার অনেক বছর পর, কখনো কখনো দশক পর, এই মৃত্যুগুলো ঘটে।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন
দীর্ঘ সময় কাজ করলে যে ক্ষতি হয়
ব্রিটেনের ব্যাংক কর্মকর্তা ৪৫ বছর বয়সী জনাথন ফ্রস্টিকের একটি লিঙ্কডইন পোস্ট সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনায় আসে।
একদিন কাজের প্রস্তুতি নেয়ার সময় হঠাৎ তার বুক চেপে আসে, গলা, চোয়াল ও হাতে ব্যথা হতে থাকে আর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।
"আমি কোনোভাবে বিছানায় শুয়ে পড়ি এবং আমার স্ত্রীকে ডাকি। সে জরুরি নম্বরে ফোন করে।", তিনি বলেন।
হার্ট অ্যাটাক থেকে সুস্থ হওয়ার পর নিজের কাজের ধরন বদলানোর সিদ্ধান্ত নেন জনাথন। তিনি লিঙ্কডইন পোস্টে লেখেন, "আমি আর সারাদিন জুমে বসে থাকি না।"
তার এই পোস্ট অনেক মানুষের মনে দাগ কাটে। অনেকে নিজেদের অতিরিক্ত কাজের অভিজ্ঞতা এবং এর ফলে স্বাস্থ্যের ক্ষতির কথা শেয়ার করেন।
ফ্রস্টিক তার দীর্ঘ সময় কাজের জন্য নিজের কোম্পানিকে দোষ দেননি। তবে একজন মন্তব্য করেন, "কোম্পানিগুলো অনেক সময় মানুষের ব্যক্তিগত সুস্থতার কথা না ভেবে তাদের সীমার বাইরে ঠেলে দেয়।"
পরে জনাথনের ব্যাংক তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করে এবং সবাইকে নিজেদের সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা জানায়।
দেখা গিয়েছে করোনা মহামারির পর অতিরিক্ত কাজ করার প্রবণতা অনেক বেড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টেকনিক্যাল অফিসার ফ্র্যাঙ্ক পেগা বলেন, "আমাদের কাছে কিছু প্রমাণ আছে যে, যখন কোনো দেশে লকডাউন হয়, তখন কাজের সময় প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যায়।"
দীর্ঘ সময় কাজ করা মোট কাজ-সংক্রান্ত রোগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী। তাই বলা যায়, দীর্ঘ সময় কাজ করা পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
গবেষকরা বলেছেন, দীর্ঘ সময় কাজ করলে দুইভাবে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়: প্রথমত, অতিরিক্ত চাপ থেকে শরীর ও মনে সরাসরি প্রভাব পড়ে। মানসিক চাপ বাড়ায় অবসাদ দেখা দিতে পারে, শরীরেও ব্যথা হয়, এমনকি কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ল্যানসেট জার্নালে উঠে এসেছে, এতে হার্টের সমস্যা,উচ্চ রক্তচাপ সংক্রামক রোগ, ডায়াবেটিস ও পেশীর সমস্যাও দেখা দেয়।
দ্বিতীয়ত, বেশি সময় কাজ করলে মানুষ ধূমপান, মদ পান, কম ঘুম, কম ব্যায়াম এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার মতো ক্ষতিকর অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রাহাত হোসেন বলেন, তার আগের চাকরিতে দীর্ঘ সময় কাজ তার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলেছিল।
তিনি বলেন, "সপ্তাহে ৬০ থেকে ৬৫ ঘণ্টা কাজ করাটা ছিল স্বাভাবিক। অনেক সময় টানা কয়েক সপ্তাহ বাড়ির বাইরে থাকতে হতো।"
"কাজের এতো স্ট্রেস নিতে নিতে আমি ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছিলাম, সব সময় মেজাজ খুটখুটে থাকতো, কাজ শেষে শরীর মন সব ভেঙে পড়তো।" চার বছর পর তিনি সেই চাকরি ছেড়ে দেন
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে নিয়োগদাতাদের এখন এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া উচিত।
ফ্র্যাঙ্ক পেগা আরও বলেন, কাজের সময় সীমিত করা নিয়োগদাতাদের জন্যও ভালো, কারণ এতে উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
তার মতে, "অর্থনৈতিক সংকটের সময় কাজের ঘণ্টা বাড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।"
দীর্ঘ সময় কাজের চক্রে বন্দী
আসল সমস্যা হলো, অনেক মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় কাজ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগই নেই।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ১৮০ কোটি কর্মরত মানুষের মধ্যে ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ সপ্তাহে ৪৯ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করেন, যা মোট কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ।
আবার অনেক মানুষের কাজের ধরণই এরকম যে তারা দীর্ঘ সময় কাজ করার চক্রে আটকে পড়েছেন। জীবিকা নির্বাহ করতে এবং বিল দিতে তাদেরকে বেশি সময় কাজ করতে বিশেষ করে ক্লায়েন্ট যদি অন্য টাইম জোনে থাকে, সেক্ষেত্রে রাতভর কাজ করতে বাধ্য করে।
উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার 'গিগ ইকোনমি' কর্মীদের ক্ষেত্রে এটি সাধারণ বিষয়।
তারা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের কোম্পানি বা উদ্যোক্তাদের জন্য ফ্রিল্যান্সার প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কোডিং, ব্লগ লেখা, ওয়েবসাইট বানানো বা সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্টের মতো কাজ করে থাকে।
ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানে আইটি বিভাগে কাজ করেন সাজ্জাদ তানজিদ। ভিন্ন টাইম জোনের কারণে তার অফিস শুরু হয় বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা থেকে। শেষ হয় সকাল ৭টায়। সেটা কখনো ৮টা,নয়টায় গড়ায়।
এভাবে রাতের পর রাত জাগার কারণে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কথা জানান তিনি। "আমার কাজের ধরনটা এমন যে আমি চাইলেই এই সময়টা বদলাতে পারবো না। এভাবে আমার ঘুমের সমস্যা তো হচ্ছেই, সারাদিন ক্লান্ত লাগে, কোথাও যেতে পারি না। জরুরি ফোন কল ধরতে পারি না। কিন্তু কিছুই করার নেই। "
অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের অ্যালেক্স জে উডের নেতৃত্বে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম মানুষকে অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করে।
একজন কর্মী বলেছিলেন: "আমি এতটাই টাকার অভাবে আছি, যখন কেউ কাজ দিতে চায়, তখন মনে হয়, কেন আমি দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজ করব না?"
এই প্ল্যাটফর্মে আপনার র্যাঙ্কিং যত ভালো, কাজ পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি। কিন্তু ভালো রিভিউ পেতে হলে কর্মীদের ক্লায়েন্টের সব চাওয়া মেনে নিতে হয়, তাদের যেকোনো সময় যোগাযোগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়, খুব কম সময়ের ডেডলাইনও মেনে নিতে হয়।
না হলে খারাপ রেটিং দেওয়া হয়, যা ভবিষ্যতে কাজ পাওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেয়।
যদি কর্মী শীর্ষ র্যাংকে না থাকে, তবে চাপ আরও বেড়ে যায়। কেউ কেউ বেশি কাজ পেতে খুব কম দামে সেবা দেয়, যার ফলে তারা কম অর্থে দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য হয়।
এছাড়া, অনেকেই প্রোফাইল তৈরি, গিগের জন্য বিড করা, নতুন দক্ষতা অর্জনের মতো অনেক কাজের জন্য সময় দেন। সব মিলিয়ে এটি এক দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর রুটিন তৈরি করে।
বাংলাদেশের গাড়ি/বাস চালকদের বেশি বেশি ভাড়ার লোভে অতিরিক্ত সময় কাজ করা এবং এর কারণে রাস্তাঘাটে নানা ধরনের দুর্ঘটনার মুখে পড়া নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বার বার চালকদের নিয়মের মধ্যে আনার কথা বলা হলেও বাস্তবে এর প্রতিফল দেখা যায় না।
উড বলেন, "দীর্ঘ সময় কাজের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে ঘুমে," এভাবে কম ঘুম এবং দীর্ঘ সময় কাজের দুষ্টচক্র চলতেই থাকে।
আবার কাজের চাপ সামলাতে না পারা, নিজের কাজে মতামত দেওয়ার সুযোগ না থাকা, বস বা সহকর্মীদের কাছ থেকে সাহায্য না পাওয়া, অফিসে সবার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না থাকা, কাজের দায়িত্ব হঠাৎ বদলে যাওয়া এবং প্রতিষ্ঠান বারবার পরিবর্তন হওয়াও এই দীর্ঘ সময় কাজ ও মানসিক চাপ বাড়ার বড় কারণ বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
'ক্লান্তিকে গর্ব হিসেবে দেখা বিপজ্জনক'
এক সাক্ষাৎকারে উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক জানান, তার ৪৭তম জন্মদিন কেটেছে কারখানায় সারারাত কাজ করে। তিনি বলেন, "কোন বন্ধু ছিল না, কিছুই না।"।
এমনকি তিনি স্বীকার করেন, প্রতি সপ্তাহে ১২০ ঘন্টা কাজ করা তার জন্য স্বাভাবিক বিষয় ছিলো।অতিরিক্ত কাজের কারণে তার সন্তান ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো কমে গেছে।
তার কিছু ভক্ত মনে করেন, বড় কিছু অর্জনের জন্য এটা স্বাভাবিক, বিশেষ করে সিলিকন ভ্যালির মতো জায়গায়। মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর স্বপ্ন আর সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির মতো বড় লক্ষ্য অর্জনের পেছনে এমন ত্যাগকে তারা স্বাভাবিক বলে মনে করেন।
কিন্তু ক্লান্তিকে গর্বের বিষয় হিসেবে দেখানো আসলে বিপজ্জনক, বলছেন গবেষকরা।
সিলিকন ভ্যালির স্টার্টআপ সংস্কৃতিতে দিন-রাত কাজ করা, ছুটির দিনেও কাজ করা, এগুলো এখন একধরনের ট্রেন্ড হয়ে গেছে, যা ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে।
সমস্যা হলো, এই 'দীর্ঘ সময় কাজ' করার সংস্কৃতি আসলে বেশি কাজ করার উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে দিতে পারে, অথবা এর জন্য চরম মূল্য দিতে হয়।
অনেক প্রমাণ আছে যে অতিরিক্ত সময় কাজ করলে উৎপাদনশীলতা কমে যায়, মানুষের শরীর খারাপ লাগে এবং বাস্তবেও অসুস্থ হয়ে পড়ে। এমনকি নানা ধরনের রোগ হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
তারপরও, লাখ লাখ কর্মী এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারছেন না ডাক্তার থেকে শুরু করে গিগ ইকোনমির কর্মী ও ফ্রিল্যান্সার অনেকেই এই চক্রে আটকে আছেন। তখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, এর পরিণতি কী হবে?
যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ বছরের চাকরির তথ্য বিশ্লেষণ করে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ওভারটাইম করা চাকরিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি ৬১ শতাংশ বেশি, সেইসব চাকরির তুলনায় যেগুলোয় ওভারটাইম নেই।
যদিও এই গবেষণায় সরাসরি বলা হয়নি যে ঝুঁকির পেছনে ক্লান্তিই মূল কারণ, কিন্তু অনেক প্রমাণ থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে ক্লান্তিই বড় ভূমিকা রাখে।
ধরা যাক, আপনি সকাল ৮টা থেকে জেগে আছেন এবং পরদিন রাত ১টা পর্যন্ত অর্থাৎ টানা ১৭ ঘণ্টা জেগে কাজ করেছেন।
এই অবস্থায় আপনার শরীরের পারফরম্যান্স ততোটাই খারাপ হবে, যতোটা একটা মাতাল মানুষের ক্ষেত্রে হয়।
অতএব, এক রাত জেগে কাজ করলে আপনার শরীর ঠিকমতো কাজ করে না। শরীরের প্রতিক্রিয়া ও সমন্বয় খারাপ হয়ে যায়। যেমন মদ্যপ হয়ে গাড়ি চালানো ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ।
হয়তো কম্পিউটারে টাইপ করা তেমন ঝুঁকিপূর্ণ নয়, কিন্তু হাতে-কলমের কাজ বা এমন কাজ যেখানে মনোযোগ দরকার, সেখানে দীর্ঘ সময় কাজ করা ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
কাজের বাইরেও অতিরিক্ত কাজ
একটা সময় ছিলো যখন অফিস থেকে বের হওয়া মানেই কাজ শেষ। সময় এখন আর আগের মতো নেই। এখন কাজের বাইরেও কাজের মেসেজ দেখে উত্তর দিতে হয়।
অনেকেই মনে করেন, এতে তারা অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকতে পারেন আবার পরিবারকে সময় দিয়েও কাজের সাথে যুক্ত থাকতে পারেন।
২০০৬ সালে বার্লিনের গবেষক ইয়ান টাওয়ার্সের একটি একাডেমিক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, মোবাইল প্রযুক্তি আসার পর থেকে ম্যানেজার ও সহকর্মীরা প্রত্যাশা করে যে কর্মীরা সবসময় কাজের জন্য প্রস্তুত থাকবেন।"
কিন্তু 'অন কল' থাকা মানে কাজ থেকে মুক্ত হওয়া নয়, এবং আমাদের শরীর এই দুই অবস্থায় ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া করে।
২০১৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, 'অন কল' থাকা মানুষের কোর্টিসল হরমোনের (যা মানসিক বাড়ায়) স্তর সকালে দ্রুত বেড়ে যায়, এমনকি তারা দিনের শেষ পর্যন্ত কাজ না করলেও এর প্রভাব থাকে।
সাধারণত ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে মানুষের কর্টিসলের মাত্রা বাড়তে থাকে। দিন যতো গড়ায় কর্টিসলের মাত্রা ততোই কমে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রতিদিন চাপে থাকলে হরমোনের চক্রে এর প্রভাব পড়ে। যদি আপনি দীর্ঘসময় ধরে চাপে থাকেন, হরমোন সবসময় বেশি থাকে। আর যদি অতিরিক্ত চাপের কারণে আপনার বার্নআউট হয়, তখন এই হরমোন ঠিক মতো বাড়ে না।
ফলস্বরূপ, 'অন কল' থাকা মানুষেরা কাজ থেকে মানসিকভাবে আলাদা হতে পারেন না। নিজের পছন্দমতো কাজ বা বিশ্রাম নিতে পারেন না।
যারা সবসময় 'অন কল' থাকেন, তারা ভাবতেই পারেন না যে এই সময়টা আসলে তার নিজের। এভাবে মানসিক চাপ আরো বাড়ে। ফলে অন কলের দিনগুলোকে অবসর সময় ধরা যায় না।
কারণ অবসর সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ শরীর ও মনকে বিশ্রাম দেওয়া।
তবে আপনি যদি এই কাজটি করে আনন্দ পান, বা এ থেকে প্রমোশনের মতো বড় কোনো লাভ হতে পারে তাহলে এই অতিরিক্ত কাজ খুব একটা খারাপ বলা যাবে না।
এক্ষেত্রে কাজের দুটি ধরণকে আলাদা করতে হবে। এই কাজ হয় আপনাকে শক্তি দেয়, নাহলে আপনার শক্তি নষ্ট করে।
তাই অতিরিক্ত কাজ করার ক্ষেত্রে নিজেকে প্রশ্ন করুন, এই কাজ আপনাকে কি ধরণের সুবিধা দিচ্ছে? অনেক বেশি টাকা দিচ্ছে? কাজের পারফরম্যান্স অনেক সহজ করে দিচ্ছে? প্রমোশনের ক্ষেত্রে এগিয়ে রাখছে?
এমনটা হলে কিছুটা বাড়তি সময় কাজ করাই যায় তবে সেটাও সীমা বজায় রেখে।
মালিহা নূর সবে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি জীবনে প্রবেশ করেছেন, তিনি অফিসের বাইরেও বাড়তি কাজ করে সুবিধা পাওয়ার কথা বিবিসি বাংলাকে জানান।
তিনি বলেন, "চাকরি শুরুর পর থেকেই বুঝলাম এখানে সবার থেকে এগিয়ে থাকতে আমাকে বাড়তি কিছু করতে হবে। আমি অফিসের বাইরে কাজ সম্পর্কিত ব্লগ পড়ি, পডকাস্ট দেখি, আমি আলাদাভাবে ইংরেজি শিখছি। শুদ্ধ উচ্চারণ শিখছি, যাতে আমি অফিসে আরো আত্মবিশ্বাসী হতে পারি। "
মালিহা মনে করেন, এই অতিরিক্ত কাজ তাকে অফিসের উচ্চপদস্থদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে সাহায্য করেছে।
কী করা উচিত?
টানা দিনরাত কাজ করা বা একাধিক দিন টানা কাজ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এমনকি ইলন মাস্কের মতো মানুষের ক্ষেত্রেও নয়। মাস্কের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে শঙ্কার কারণে টেসলার শেয়ার আট দশমিক আট শতাংশ পড়ে যায়।
তাই একে সতর্কবার্তা হিসেবে নিন।
যদি আপনি একাধিক দিন পরপর কাজ করা এড়িয়ে যেতে পারেন, তবে তা করুন, টানা কাজ করলে কোনো লাভ নেই, না স্বাস্থ্যে, না মানসিকভাবে, না উৎপাদনশীলতায়।
অনেক কর্মী অফিসের বাইরে, নিজের ব্যক্তিগত সময়ে ছোটখাটো কাজ করেন যাতে তারা এগিয়ে থাকতে পারেন। এই ধরনের অতিরিক্ত কাজ এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
টরন্টোর একটি আন্তর্জাতিক মার্কেটিং ম্যানেজার ভ্রমণ করতে গেলেও কাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হন না।
তিনি সরাসরি কাজ না করলেও, নিজের ব্যক্তিগত সময়ে টিমের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করেন বা কাজ সম্পর্কিত অনেক পডকাস্ট শোনেন।
এসব বিষয় কাজ মনে না হলেও এগুলো কাজ। আর এই অতিরিক্ত পরিশ্রম ধীরে ধীরে প্রত্যাশায় রূপ নিলে, কর্মীদের জন্য তা দূর করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে কখনো পুরোপুরি ছুটি নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এক্ষেত্রে পূর্ণ ছুটি কাটানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকরা।
নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে চার দিন কাজ করলে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং কাজের পারফরম্যান্সও বাড়ে।
গবেষকরা বলছেন, অনেক দেশে মানুষ অতিরিক্ত কাজের চাপ, ক্লান্তি এবং পরিবারকে সময় দিতে না পাওয়ার কারণে নানা সমস্যায় পড়েন। সপ্তাহে চার দিন কাজ এই সমস্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের কাজের সময় কমানো হয়েছে, তারা বেশি সুস্থ থাকেন, ঘুমের সমস্যা থাকে না, ক্লান্তি ভর করতে পারে না। ফলে উৎপাদনশীলতা বাড়ে সেইসাথে কাজের প্রতি সন্তুষ্টি বাড়ে। যারা আট ঘণ্টার কম কাজ করেছেন, তারা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছেন।
সব মিলিয়ে, চার দিনের সপ্তাহ স্বাস্থ্যের জন্য ভালো এবং কর্মজীবনও ভারসাম্যপূর্ণ রাখে।