ফেনীর 'ইসলামি ভাস্কর্য' নিয়ে এত আলোচনার কারণ কী?
ছবির উৎস, channel I
ফেনীতে উদ্বোধন হওয়া একটি ইসলামিক স্থাপনা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
সামাজিক মাধ্যমে 'ইসলামি ভাস্কর্য' বলে বর্ণনা করা এ স্থাপনার নাম শান্তি চত্বর এবং এটি ফেনী শহরকে ‘আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন’ করার উদ্যোগের একটি অংশ বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন পৌর মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী।
উদ্বোধনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এই স্থাপনাটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। অনেকেই সেটির ছবি ফেসবুকে শেয়ার করছেন।
বাংলাদেশে কয়েক বছর আগে দেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়ে দেশের ইসলামপন্থীদের সাথে সরকারের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল।
সেসময় দেশের ইসলামী চিন্তাবিদদের একটি অংশ বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন, "মানবমূর্তি ও ভাস্কর্য যে কোন উদ্দেশ্যে তৈরি করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।"
ফলে এখন সামাজিক মাধ্যমে 'ইসলামি ভাস্কর্য' নামে পরিচিতি পাওয়া স্থাপনাটি অনেকের মাঝেই ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।
'ইসলামি ভাস্কর্য' নিয়ে যা জানা যাচ্ছে
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফেনী পৌরসভার অর্থায়নে শহরের ট্রাংক রোড ও মিজান রোডের সংযোগস্থলে নির্মাণ করা হয়েছে ‘শান্তি চত্বর’।
রোববার সন্ধ্যায় শহরের মূল সড়কে স্থাপনাটির উদ্বোধন করেন ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী।
এ সময় তিনি বলেন, ''পবিত্র রমজান মাসে আমরা আল্লাহর ৯৯ নামের সাত হাজার লাইটবিশিষ্ট এই জিনিসটির শুভ উদ্বোধন করতে পেরেছি। পৃথিবীর কোথাও এই ধরনের চত্বর হয় নাই। এই প্রথম ফেনীতে এটা হয়েছে”।''
তবে, তার এই দাবির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি বিবিসি।
ছবির উৎস, channel I
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
শহরের দুই সড়কের সংযোগস্থলে নির্মিত স্থাপনাটি মূলত চারকানো আকৃতির একটি স্তম্ভ।
তার ওপরে আছে ছয়কোণা আকৃতির পাটাতন, আর এই পাটাতনের ওপর বসানো হয়েছে চারটি এলইডি স্ক্রিন।
ওপরে বসানো স্ক্রিনসহ স্থাপনাটির মোট উচ্চতা ৩২ ফুট। এর মধ্যে কেবল স্ক্রিনের উচ্চতাই ১২ ফুট।
এই স্ক্রিনে কেবল মক্কা ও মদিনার বিভিন্ন চ্যানেলের ওয়াজ প্রচার করা হবে বলে জানান পৌর মেয়র। এছাড়া কোন ধরনের বিজ্ঞাপন বা জাতীয় অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে না বলেও জানান তিনি।
চত্বরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এর পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ।
তবে এই স্থাপনাটির বিশেষত্ব হচ্ছে এতে খোদাই করা আল্লাহর ৯৯টি নাম এবং স্তম্ভটিতে বসানো সাত হাজার এলইডি লাইট।
স্তম্ভের দেয়ালে বড় করে আরবি হরফে লেখা আছে ‘আল্লাহু’ এবং ‘মোহাম্মদ’।
প্রায় এক বছর আগে এই স্থাপনা তৈরির পরিকল্পনা করা হয় এবং এটি নির্মাণে প্রায় এক কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে বিবিসিকে জানান পৌর মেয়র মি. মিয়াজী।
তিনি নিজেই এর নকশা করেন।
তিনি বলেন, পৌরসভার অর্থায়নে পাঁচ থেকে ছয় মাস আগে শান্তি চত্বরের নির্মাণ কাজ শুরু হয়, যার উদ্বোধন করা হয় রোববার সন্ধ্যায়।
ছবির উৎস, MOHAMMAD SHAHADAT HOSSAIN
যে সড়কটিতে শান্তি চত্বর নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে আছে একটি আলিয়া মাদ্রাসা ও ঈদগাহ ময়দান।
‘মিজান ময়দান’ নামের এই ঈদগাহ ময়দানে ওয়াজ মাহফিল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কেরাত সম্মেলন আয়োজন করা হয়।
এক ধরনের ধর্মীয় আবহ থাকার কারণেই ‘চত্বর’ বানানোর জন্য স্থানটিকে বেছে নেয়ার কথা বিবিসিকে জানান পৌর মেয়র।
তবে এর আগেও এখানে একটি স্থাপনা ছিল।
ছয় কোণা আকৃতির সেই স্থাপনাটিতেও আরবি হরফে ‘আল্লাহু’ এবং ‘মোহাম্মদ’ লেখা ছিল। তবে সেটি আকারে ছিল বেশ ছোটো।
শান্তি চত্বর বানানোর প্রায় আট মাস আগে একটি প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে ওই স্থাপনাটি বানিয়েছিল বলে বিবিসিকে জানান মেয়র মি. মিয়াজী।
প্রায় চার থেকে পাঁচ মাস স্থাপনাটি ওই জায়গায় ছিল।
তবে সেই স্থাপনা ‘দৃষ্টিনন্দন ছিল না’ এবং 'যেভাবে চেয়েছিলেন সেভাবে নির্মাণ হয়নি' বলেও বিবিসিকে জানান মি. মিয়াজী।
ছবির উৎস, channel I
‘ইসলামি ভাস্কর্য’ কি ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক?
ইসলামের মূলনীতির সঙ্গে ভাস্কর্যের সাংঘর্ষিকতার বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে বেশ লম্বা সময় ধরেই আলোচনা-সমালোচনা চলমান।
এর আগে ২০২০ সালে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নিয়ে আপত্তি ও বিরোধিতার মুখে ঢাকার ধোলাইপাড়ে ‘মুজিব ভাস্কর্য’ স্থাপনের কাজ স্থগিত করা হয়।
সেসময় ভাস্কর্যটি স্থাপন নিয়ে হেফাজতে ইসলাম ও সরকারি দলের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
ওই বছর ডিসেম্বর মাসে ভাস্কর্যটি উদ্বোধনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। একই বছর চীন থেকে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করে বাংলাদেশে আনা হয়।
পরবর্তী সময়েও ভাস্কর্যটি স্থাপনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতা এবং গোপনীয়তা দেখা গেছে।
সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে একটি নারী ভাস্কর্যের বিরুদ্ধেও আন্দোলন করেছে ইসলামপন্থীরা।
তবে ইসলামিক এই ভাস্কর্য স্থাপন ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় বলেই দাবি পৌর মেয়রের।
তিনি বলেন, “ভাস্কর্যকটি উদ্বোধনের সময় আলেম-ওলামারা উপস্থিত ছিলেন। এটি সাংঘর্ষিক হলে তারা আমাকে প্রশ্ন করতো বা কেউ আসতো না। কিন্তু এখানে সবাই আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছে, আমার জন্য দোয়া করছে। সবাই খুশি যে এটা করা হয়েছে”।
“ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে আমিতো এটা করবো না। ধর্মরে ছোটো করে কিছু করবো না, সেটা যার ধর্মই হোক”, বলেন এই পৌর মেয়র।
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট