ভাড়ায় বাইকে তুলে অচেতন করে নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ চালকের বিরুদ্ধে, কী ঘটেছিল?
ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
যানজট এড়িয়ে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে অ্যাপের মাধ্যমে মোটরসাইকেলের রাইড শেয়ারিং সেবা নিচ্ছেন অনেকে। অ্যাপে না গিয়ে ভাড়া নিয়ে চালকের সাথে চুক্তি করেও বাহনে উঠছেন কেউ কেউ। সম্প্রতি এভাবে বাইকে ওঠার পর ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন এক নারী।
একটি বিউটি পার্লারে কাজ করেন অভিযোগকারী। ঘটনার দিন গন্তব্যে যেতে ভাড়ায় মোটরসাইকেলে চড়েন তিনি।
তার অভিযোগ, সেদিন দুপুরে বাইকে ওঠার কিছু সময় পরই জ্ঞান হারান তিনি। রাত নয়টা পর্যন্ত অচেতন অবস্থায় ছিলেন তিনি। জ্ঞান ফিরে আসলে নিজেকে আবিষ্কার করেন ঢাকার বাইরে একটি মহাসড়কে। এরপরেই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে বলেও অভিযোগ তার।
জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর '৯৯৯'-এ ফোন করলে পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করে ওই ভুক্তভোগী নারীকে।
ঘটনার পর দিন ওই নারী বাদী হয়ে নরসিংদী জেলার একটি থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের আওতায় ধর্ষণের মামলা করেন।
এ ঘটনায় মূল অভিযুক্ত ওই বাইক চালককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে। জবানবন্দি নেওয়ার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মামলার অজ্ঞাতনামা আরও দুই জন আসামি এখনো গ্রেফতার হয়নি।
পুলিশ বলছে, হেলমেটে কোনো ধরনের মাদক বা নেশাজাতীয় দ্রব্য ব্যবহার করে ভুক্তভোগীকে অজ্ঞান করা হয়েছে কি না তা বের করতে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. আনোয়ার হোসেন শামীম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "প্রাথমিকভাবে আমরা অনুমান করছি স্কোপোলামিন, যেটাকে শয়তানের নিঃশ্বাস বলা হয়, এটা হয়তো ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। ওই নারীর ভাষ্য অনুযায়ী আমরা এটা অনুমান করছি।"
মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা সম্ভব হলেও যে হেলমেট ভুক্তভোগীর মাথায় ছিল সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর
ছবির উৎস, Getty Images
সেদিন কী ঘটেছিল ?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
মামলার তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ২৮শে মে, বুধবারের।
রাজধানীর মিরপুর– ১২ নম্বর থেকে শ্যামলী যেতে ওইদিন দুপুর তিনটায় চুক্তিতে একটি মোটরসাইকেল ভাড়া করেন অভিযোগকারী ওই নারী। শ্যামলীতে চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
তার ভাষ্য, কোথায় যাবেন তা বাইক চালককে বুঝিয়ে দিয়ে তার দেওয়া হেলমেট মাথায় পরেন তিনি।
এজাহারে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর - ১০ নম্বর গোল চত্বর যাওয়া পর্যন্ত চেতনা থাকে তার।
পরে রাত নয়টায় যখন চেতনা ফিরে আসে, তখন পলাশ থানার ঘোড়াশাল পৌরসভার টঙ্গী টু পাঁচদোনাগামী আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশের একটি কালভার্টের নিচে আবিষ্কার করেন নিজেকে।
এজাহারে বলা হয়েছে, কালভার্টের কাছে পৌঁছালে মোটরসাইকেল থামিয়ে চালক ওই নারীকে রাস্তার নিচে ফেলে দেয়।
"তখন আমি চেতন ফিরে দেখতে পাই বাইকের ড্রাইভারের আরও দুই জন বন্ধু মোটরসাইকেল নিয়ে আসে এবং ওই ড্রাইভারের সাথে কথা বলে।"
এক পর্যায়ে ওই নারীকে মাটিতে ফেলে "ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে"।
পরে অভিযোগকারী নিজের মোবাইল ফোন থেকে চাচাকে বিষয়টি জানালে ট্রিপল নাইনে ফোন করে পুলিশের সাহায্য চান তার চাচা।
সামাজিক মর্যাদার ভয় এবং পারিবারিক বেশ কিছু সমস্যার কারণে প্রথমে মামলা করতে চাননি বলে বিবিসি বাংলাকে জানান অভিযোগকারী নারী। কিন্তু ঘটনার পরদিন আত্মীয়-স্বজনের পরামর্শে নরসিংদীর একটি থানায় মামলাটি করেন।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "প্রথম থেকে আমি বিষয়টা নিয়ে আগাইতেই চাই নাই। কারণ আমার মান-সম্মান আছে, সংসার আছে। এজন্য প্রথমে মামলা দিতেই চাই নাই।"
পারিবারিক সমস্যার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, "আমার মা-বাবা নাই, আমরা যখন ছোট তখন মারা গেছে। চাচার কাছে বড় হইছি। চাপের মধ্যে থাকি, আমার মান-সম্মান নিয়ে বিপদে আছি।"
অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করে তাকে ভয় দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কারাগার থেকে মুক্ত না করার দাবি জানিয়ে ওই নারী বলেন, "আমি মূলত চাইতে ছিলাম যারে ধরছে তারে যেন ছাড়া না হয়। আমার মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি। আমারে যারা জানে তারা তো বলতাছে (ভিডিও দেখে) এইটা তুমি, তোমারে নিয়াই ঘটছে। আমার তো এগুলা লজ্জা লাগে।"
ছবির উৎস, Getty Images
পুলিশ যা বলছে
পুলিশ জানিয়েছে ট্রিপল নাইনে ভুক্তভোগীর চাচার ফোন পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে ওইদিন রাতেই তাকে উদ্ধার করা হয়।
ভুক্তভোগী নারীর চাচা পুলিশকে ফোনে মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছে বলেও জানান। উদ্ধারের পর তাকে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। ঘটনার পর দিন মামলাটি করেন ওই নারী।
নরসিংদীর পুলিশ কর্মকর্তা মি. শামীম জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি ধর্ষণের ঘটনা ভিডিও করে রেখে তাকে ভয় দেখিয়েছিল। কিন্তু ওই নারী এ বিষয়টি মামলায় রাখতে রাজি হননি।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি একটি রাইড শেয়ারিং অ্যাপের মাধ্যমে ট্রিপ শেয়ার করেন। তবে তার সঙ্গে চুক্তিতে বাইকে ওঠেন ভুক্তভোগী নারী।
ভুক্তভোগীর সাথে থাকা নগদ টাকা এবং আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে তিন হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে আনার পর অভিযুক্তরা ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ওই টাকা নিয়ে তাকে সেখানেই ফেলে চলে যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে অভিযুক্ত ব্যক্তির মোবাইলে থাকা ভিডিও যাতে মুছে ফেলা হয় সে বিষয়ে পুলিশকে অনুরোধ জানান অভিযোগকারী।
প্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম শনাক্ত করার পরই মামলায় তাকে আসামি করা হয়। অভিযুক্ত বাইকচালককে গ্রেফতারের পর সে পুলিশের কাছে দাবি করেছে, ভিডিওটি মুছে ফেলা হয়েছে।
ভুক্তভোগী নারীর ব্যবহৃত হেলমেটটি পাওয়া গেছে কি না এমন প্রশ্নে পুলিশ কর্মকর্তা মি. শামীম বলেন, "মোটরসাইকেলটা আমরা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু হেলমেটটা সে সরিয়ে ফেলছে। হেলমেটটা কিন্তু আমরা তার কাছে পাইনি। আরও জিজ্ঞাসাবাদ করে এটা আমরা উদ্ধারের চেষ্টা করবো।"
এছাড়া রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার না করায় আসামি শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
"সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এক হাজারের বেশি চালকের সাথে আমরা কথা বলছি ওই এলাকায় তাকে ট্রেস করার জন্য। ওই এলাকার যারা রাইড শেয়ারিং অ্যাপে বাইক চালান তাদের একজনের সাথে তার সামান্য পরিচয় ছিল। এভাবে আমরা প্রযুক্তির সহায়তা ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাকে অ্যারেস্ট করেছি," বলেন মি. শামীম।
কেরানীগঞ্জ থেকে অভিযুক্তকে গত ৩১শে মে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
পরে নরসিংদীর একটি বিচারিক আদালতে হাজির করলে ধর্ষণের বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন অভিযুক্ত ব্যক্তি।
ওই নারী হেলমেট পড়ার পর কেন অচেতন হয়ে পড়ে এমন প্রশ্নে এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এ বিষয়ে জানতে ইতোমধ্যেই ভুক্তভোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে।
মি. শামীম বলেন, "স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা অলরেডি করা হয়েছে। আরও প্রয়োজন হলে আমরা করবো। স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা ও এক্সপার্ট ওপিনিয়ন নেওয়ার মাধ্যমে আমরা জানতে চেষ্টা করবো আসলে তাকে অচেতন করার জন্য কী ধরনের মাদক ব্যবহার করা হয়েছে।"
"প্রাথমিকভাবে আমরা অনুমান করছি স্কোপোলামিন, যেটাকে শয়তানের নিঃশ্বাস বলা হয়, এটা হয়তো ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। ওই নারীর ভাষ্য অনুযায়ী আমরা এটা অনুমান করছি" বলেন পুলিশ কর্মকর্তা মি. শামীম।
যাত্রীদের চুক্তিতে মোটরসাইকেল ভাড়া না করে রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
"অ্যাপটা ব্যবহার করলে আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ থাকার সম্ভাবনাটাই বেশি। অহেতুক অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার শঙ্কা কম থাকে," বলেন নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন শামীম।
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট