দিল্লিতে কুস্তিগিরদের বলপ্রয়োগ করে আটকের নিন্দা আন্তর্জাতিক অলিম্পিক্স কমিটির

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় মেডেলজয়ী কুস্তিগিরদের ওপরে পুলিশের বলপ্রয়োগ, রবিবার দিল্লিতে

ভারতের কুস্তিগিরদের ওপরে গত রবিবার দিল্লি পুলিশ যেভাবে বলপ্রয়োগ করে তাদের আটক করেছিল, তার নিন্দা করেছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক্স কমিটি আইওসি।

ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের সভাপতি ও বিজেপি সংসদ সদস্য ব্রিজভূষণ শরণ সিং এক কিশোরী সহ একাধিক নারী কুস্তিগিরকে যৌন হেনস্থা করেছেন, এই অভিযোগে মি. সিংকে গ্রেপ্তারের দাবিতে আন্তর্জাতিক পদকজয়ী কুস্তিগিররা একমাসেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন চালাচ্ছেন।

গত রবিবার তারা ভারতের নতুন পার্লামেন্ট ভবন উদ্বোধনের দিন দিল্লিতে মিছিল করতে গেলে পুলিশ বিখ্যাত কুস্তিগিরদের বলপ্রয়োগ করে আটক করে এবং তাদের ধর্না শিবির ভেঙ্গে দেয়।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কুস্তিগিরদের ওপরে পুলিশের ওই বলপ্রয়োগের ঘটনাকে নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক্স কমিটি এবং বিশ্ব কুস্তির নিয়ামক সংগঠন ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড রেসলিং।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি নারী কুস্তিগিরদের

আইওসি ও বিশ্ব কুস্তি সংস্থার নিন্দা

কুস্তিগিরদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগ ও তাদের ধর্না শিবির ভাঙার নিন্দা করে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক্স কমিটি, আইওসি, ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের সভাপতির বিরুদ্ধে ওঠা যৌন হেনস্থার অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্তও দাবি করেছে।

ভারতের নতুন পার্লামেন্ট ভবন উদ্বোধনের দিন আন্দোলনরত কুস্তিগিররা মিছিল করতে গেলে প্রথমে পুলিশ তাদের আটকায়, তারপরে মাটিতে ফেলে, চ্যাংদোলা করে, ধাক্কা দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলে।

যাদের আটক করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন অলিম্পিক্স পদকজয়ী কুস্তিগির সাক্ষী মালিক এবং বজরং পুণিয়া এবং দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ভিনেশ ফোগট।

"ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তা এবং সুস্থতা" নিশ্চিত করার পাশাপাশি "দ্রুত তদন্ত'’ শেষ করার আর্জিও জানিয়েছে আইওসি।

বিশ্ব কুস্তির নিয়ামক সংগঠন ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড রেসলিংয়ের সঙ্গে আইওসি এই বিষয়ে নিরন্তর যোগাযোগ রাখছে।

ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড রেসলিংও এক পৃথক বিবৃতিতে বলেছে, “ভারতের কুস্তি ফেডারেশনের সভাপতির বিরুদ্ধে হেনস্থা ও নিপীড়নের যেসব অভিযোগ তুলে কুস্তিগিররা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, তার দিকে সংগঠন গভীর উদ্বেগের সঙ্গে নজর রাখছে।"

“এখনও পর্যন্ত তদন্তের কোনও ফলাফল না আসাতেও সংগঠন হতাশ,” বলেছে ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড রেসলিং।

নির্বাচন সময় মতো না করা হলে তারা ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনকে সাসপেন্ড করে দিতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, ব্রিজ ভূষণ শরণ সিং ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের সভাপতি ও ক্ষমতাসীন বিজেপির সংসদ সদস্য

'অভিযোগের প্রমাণ নেই' : দিল্লি পুলিশ

সংবাদ সংস্থা এএনআই দিল্লি পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে তাদের তদন্ত রিপোর্ট আর দিন ১৫র মধ্যে চূড়ান্ত হয়ে যাবে। সেটা চার্জশিট অথবা চূড়ান্ত রিপোর্ট – যে কোনও ভাবেই আদালতে জমা দেওয়া যেতে পারে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

“শিশু কিশোরদের যৌন নিপীড়ন রোধ আইন 'পক্সো'র যে ধারায় এফআইআর হয়েছে, তাতে সাত বছরের কারাবাসের সাজা হতে পারে, তাই তদন্তকারী অফিসার কোনওভাবেই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারেন না, যেমনটা দাবি করা হচ্ছে,” এএনআইকে জানিয়েছেন দিল্লি পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিক।

তিনি আরও বলছেন, “সাক্ষীদের প্রভাবিত করা অথবা প্রমাণ লোপাট করার চেষ্টা করছেন তিনি (ব্রিজ ভূষণ শরণ সিং), এটাও সত্য নয়।"

এএনআই এই খবর দেওয়ার পরে দিল্লি পুলিশের তরফে টুইট করে বলা হয়েছে যে "ওটি ভুল খবর, তদন্ত এখনও চলছে।"

আবার কিছুক্ষণ পরে এই টুইটটি মুছেও দিয়েছে দিল্লি পুলিশ।

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, গঙ্গায় মেডেল ভাসিয়ে দেওয়ার আগে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন কুস্তিগিররা

গঙ্গায় মেডেল ভাসানোর অভূতপূর্ব হুমকি

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

কুস্তি ফেডারেশনের সভাপতিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে ধর্নারত কুস্তিগিরদের গত রবিবার যেভাবে পুলিশ মাটিতে ফেলে মারধর করে আটক করেছিল, তার পরে মঙ্গলবার কুস্তিগিররা হঠাৎই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে অলিম্পিক্স, কমনওয়েলথ গেমস, এশিয়ান গেমস সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তারা দেশের হয়ে যেসব মেডেল জিতে এনেছিলেন, সেগুলো গঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দেবেন।

এধরনের সিদ্ধান্ত ক্রীড়াজগতে অভূতপূর্ব।

সারা জীবনের প্রাপ্তি ওইসব মেডেল সহ কুস্তিগিররা হরিদ্বারে গঙ্গার ঘাটেও পৌঁছিয়ে গিয়েছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে তাদের বলতে শোনা গিয়েছিল যে অপমান, যে ব্যবহার তাদের পেতে হল পুলিশের কাছে, তারপরে দেশের হয়ে জিতে আনা ওইসব মেডেলের আর কোনও দাম নেই তাদের কাছে।

একেবারে শেষ মুহূর্তে গঙ্গার ঘাটে পৌঁছন কৃষক নেতা নরেশ টিকায়েত। তিনি জাঠ সমাজেরও নেতা, আবার আন্দোলনরত কুস্তিগিরদের একটা বড় অংশই হরিয়ানার জাঠ।

কুস্তিগিরদের বুঝিয়ে শুনিয়ে গঙ্গায় মেডেল বিসর্জন দেওয়া থেকে বিরত করেন মি. টিকায়েত।

তিনি বলেন, “মেডেলগুলো তো দেশের সম্পদ, আবার আপনারাও দেশের সম্পদ। তাই এটা করবেন না আপনারা। এরপরে কী করা যায়, তা নিয়ে পাঁচ দিন সময় নেওয়া হোক।"

কৃষক নেতার কথা মতো কুস্তিগিররা সরকারকে পাঁচ দিন সময় দিয়েছেন।

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, কুস্তিগিরদের গঙ্গায় মেডেল বিসর্জন না দিতে বোঝাচ্ছেন কৃষক নেতারা (মাথায় সাদা পাগড়ি)

‘মেডেল বিসর্জন’ দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্ত

কুস্তিগিরদের মেডেল গঙ্গায় "বিসর্জন" দেওয়ার সিদ্ধান্তটাকে অনেকেই দুর্ভাগ্যজনক বলছেন।

‘দ্য হিন্দু’ সংবাদপত্রের সহসম্পাদক রাকেশ রাও বলছেন কুস্তিগিরদের আন্দোলনের ইস্যুর সঙ্গে মেডেলের কোনও সম্পর্ক নেই।

তার কথায়, “তাদের চিন্তাভাবনার প্রতি আমার করুণা হয়। কড়া পরিশ্রম করে দেশের জন্য মেডেল পেয়েছেন ওরা। কিন্তু সেগুলো বিসর্জন দিয়ে নিজের পরিশ্রম, যে দেশের জন্য তারা এত কিছু করলেন, সব কিছুকেই অপমান করলেন ওরা।"

আবার ক্রীড়া সাংবাদিক নৌরিস প্রীতমের সহমর্মিতা রয়েছে কুস্তিগিরদের সঙ্গে। তিনি বলছেন সরকারেরও বোঝা উচিত যে এই খেলোয়াড়রা দেশের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর।

“আপনি ভেবে দেখুন, ৪০ দিনেরও বেশি হয়ে গেছে, কুস্তিগিররা বাড়ির সব সুবিধা ছেড়ে তাঁবু খাটিয়ে থাকছিলেন। সেখানে মশা আছে, টয়লেটের সুবিধা নেই, তাদের ধৈর্যের বাঁধ তো ভাঙ্গবেই। তবে কুস্তিগিরদের গঙ্গায় মেডেল ভাসানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নই। কিন্তু সরকারেরও তো বোঝা উচিত যে এই পরিস্থিতিটা তৈরি কেন হল!”

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কুস্তিগিরদের আন্দোলন কোন পথে, সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবারের মহাপঞ্চায়েতে

আন্দোলন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে মহাপঞ্চায়েত

কুস্তিগিরদের আন্দোলন নিয়ে বৃহস্পতিবার উত্তরপ্রদেশের মুজফ্ফরনগরে একটা মহাপঞ্চায়েত বা খাপ পঞ্চায়েতের ঘোষণা করেছেন মি. টিকায়েত।

বুধবার তিনি সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে বলেছেন, “আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে ওই মহাপঞ্চায়েত। সেখানে উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, হরিয়ানা, পাঞ্জাব আর রাজস্থানের খাপ নেতারা যোগ দেবেন।“

মহাপঞ্চায়েত বা খাপ পঞ্চায়েত জাঠ সমাজের একটা নিজস্ব ব্যবস্থা, যেখানে সমাজের মাথারা মিলিতভাবে কোনও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বা রাজনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। আবার গ্রাম স্তরে খাপ পঞ্চায়েত থেকে বিবাহ বা অন্য কোনও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। খাপের সিদ্ধান্ত না মানলে হত্যা পর্যন্ত করার ইতিহাস আছে জাঠ সমাজে।