বলিউডের সিনেমা আজও কেন 'পুরুষতান্ত্রিক' আর 'সেকেলে' রয়ে গেছে
ছবির উৎস, SCREENSHOT FROM YOUTUBE
- Author, গীতা পাণ্ডে
- Role, বিবিসি নিউজ, দিল্লি
ভারতের বিপুলভাবে জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমা শিল্প - যাকে বলা হয় বলিউড - একে প্রায়ই বর্ণনা করা হয় 'পুরুষদের জগৎ' হিসেবে।
এ নিয়ে বহুকাল ধরেই কথা হচ্ছে। তবে সম্প্রতি নতুন এক জরিপে বের হয়ে এসেছে যে মুম্বাইয়ের এই সিনেমার জগতে - তা সে রূপালী পর্দায়ই হোক আর পর্দার পেছনেই হোক - জেন্ডার সমতা কত নগণ্য।
অন্তত ২১০ কোটি ডলার মূল্যমানের এই শিল্প থেকে প্রতি বছর শত শত ফিল্ম তৈরি হচ্ছে, আর এর বিপুলসংখ্যক ভক্ত আছেন সারা পৃথিবীর প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে।
এসব চলচ্চিত্র ও এর তারকারা তাদের ভক্তদের মনোজগতে যে প্রভাব বিস্তার করেছেন তা 'বিপুল' বললে মোটেও অতিশয়োক্তি হবে না।
কিন্তু বছরের পর বছর ধরে বলিউডের অনেক ছবির বিরুদ্ধে এ সমালোচনা হচ্ছে যে এগুলো সেকেলে মূল্যবোধের এবং এগুলো সমাজে নারীবিদ্বেষী মানসিকতা ও জেণ্ডার পক্ষপাত বা বৈষম্যের প্রসার ঘটাচ্ছে।
মোট ৩৫টি চলচ্চিত্রের ওপর চালানো জরিপ
এ ধরনের জরিপ ভারতে এটাই প্রথম। গবেষণাটি করেছে মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেস বা টিআইএসএস।
হিন্দি সিনেমায় পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা কত গভীরভাবে জেঁকে বসে আছে - সেটাই পরিমাপ করার চেষ্টা করা হয়েছে এতে।
তারা বেছে নিয়েছেন ২০১৯ সালের সবচেয়ে বেশি বক্সঅফিস-সফল ২৫টি ছবি, এবং ২০১২ থেকে শুরু করে ২০১৯ পর্যন্ত সময়কালে মুক্তি পাওয়া ১০টি নারী-কেন্দ্রিক ছবিকে। এই সময়কালটি বেছে নেয়া হয়েছে এটাই দেখার জন্য যে ২০১২ সালে দিল্লিতে একজন ছাত্রীর গণধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর মুম্বাইয়ের ছবির বর্ণনাত্মক রীতিতে কোন পরিবর্তন এসেছে কিনা।
দিল্লিও একটি বাসে ওই ছাত্রীর গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল এবং নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ মোকাবিলায় নতুন ও কঠোর কিছু আইন করা হয়েছিল।
জরিপে অন্তর্ভুক্ত হিট ছবিগুলোর মধ্যে ছিল কবির সিং, মিশন মঙ্গল, দেবাঙ্গ থ্রি, হাউজফুল ফোর, ও আর্টিকেল ফিফটিন। নারী-কেন্দ্রিক ছবিগুলোর মধ্যে ছিল রাজী, কুইন, লিপস্টিক আন্ডার মাই বুরখা, ও মার্গারিটা উইথ এ স্ট্র।
ছবির উৎস, Getty Images
এখনো জেঁকে বসে আছে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা
গবেষকরা এসব ছবির প্রায় ২,০০০ পর্দায় উপস্থিত চরিত্রকে বিশ্লেষণ করেছেন - তাদের যে ধরনের পেশা বা বৃত্তিকে অভিনেতারা চিত্রায়িত করেছেন তা দেখেছেন।
তা ছাড়া তারা কয়েকটি মানদণ্ডের নিরিখে এসব ছবিকে বিশ্লেষণ করেছেন - যেমন, এগুলোতে চরিত্রগুলোকে যৌনতার দিক থেকে কী ধরনের ছকে ফেলা হয়েছে, এবং সম্মতি, ঘনিষ্ঠতা ও হয়রানির বিষয়গুলো কিভাবে এসেছে।
এলজিবিটিকিউ প্লাস চরিত্র, বা প্রতিবন্ধী চরিত্র কতগুলো এসেছে তা তারা গুণেছেন, তারা কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে তা দেখেছেন। এসব ছবিতে পর্দায় উপস্থিতির বাইরে কতজন নারী কাজ করেছেন তাও পরীক্ষা করেছেন তারা।
এর পর তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে নারীকেন্দ্রিক ছবিগুলো কিছুটা আশার আলো দেখালেও - বক্সঅফিস হিট ছবিগুলো এখনো পুরুষতান্ত্রিক (সেক্সিস্ট) ও পশ্চাৎমুখী মূল্যবোধ প্রতিফলিত করছে। আর নারী ও কুইয়ারদের প্রতিনিধিত্ব একেবারেই হতাশাজনক।
উদাহরণ হিসেবে তারা দেখাচ্ছেন যে তাদের বিশ্লেষিত ছবিগুলোতে ৭২ শতাংশ চরিত্রই রূপায়ন করেছেন পুরুষরা, ২৬ শতাংশ করেছেন নারীরা এবং কুইয়ার অভিনয়শিল্পীরা করেছেন মাত্র ২ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় চরিত্র মানেই পুরুষ ও উচ্চবর্ণের
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এ জরিপ প্রকল্পের প্রধান অধ্যাপক লক্ষ্মী লিঙ্গম বলছেন, "বলিউডে বড় অংকের টাকা মানেই ক্ষমতাশালী পুরুষ" এবং পরিচালকরা বলেন খুব বেশি শক্তিশালী নারী চরিত্র দর্শকদের মনে "কাজ করবে না।"
বিবিসিকে তিনি বলেন, "ভিন্ন কিছু করার প্রবণতা খুবই কম কারণ মানুষের মনে একটি গল্প বা বর্ণনারীতির ধারণা সব সময়ই পুরুষতান্ত্রিক আদর্শ দিয়ে তৈরি। নির্মাতারা বিশ্বাস করে যে এটাই তাদেরকে টাকা-পয়সা এনে দিতে পারবে।"
একারণে তারা সব সময়ই "ফরমূলা"র বাইরে বেরোয় না - বলেন এই অধ্যাপক।
"গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হতে হবে একজন উচ্চবর্ণের পুরুষকে, প্রধান নারী চরিত্রটিকে হতে হবে ক্ষীণাঙ্গী এবং সুন্দরী। তার মধ্যে থাকতে হবে ব্রীড়া এবং লাজুক ভাব - আর তাকে সম্মতি জানাতে হবে কথায় নয়, চোখমুখের ইঙ্গিত দিয়ে। অবশ্য তাতে শরীর-দেখানো যৌন-উত্তেজক পোশাক পরতে হবে, আর অন্তত এতটুকু আধুনিক হতে হবে যাতে তার বিয়ের আগে একটি প্রেমের সম্পর্ক হতে পারে - যা আবার সামাজিক রীতির বিরোধী।"
"পর্দায় যেসব চাকরিবাকরি দেখানো হয় তা কল্পিত হয় সংকীর্ণ লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে" - বলছিলেন অধ্যাপক লিঙ্গম ।
"তবে এসব ছবিতে ৪২ শতাংশ প্রধান নারী চরিত্রকেই চাকরিরত দেখা গেছে। এই হার যদিও ভারতের প্রকৃত নারী কর্মসংস্থানের অনুপাত ২৫.১%-এর চেয়ে বেশি কিন্তু হিন্দি সিনেমার নারীরা যে ধরনের চাকরি করেন তা একেবারেই ছকে বাঁধা। "
"পুরুষ চরিত্রদের ১০ জনের মধ্যে ৯ জনকেই দেখা যায় তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ভুমিকায় আছেন। তারা সেনা কর্মকর্তা,পুলিশ, রাজনীতিবিদ এবং অপরাধ চক্রের প্রধানের মত চরিত্রে অভিনয় করছেন। আর নারীরা প্রধানত ডাক্তার, নার্স, শিক্ষক বা সাংবাদিক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ভূমিকায় আছেন প্রতি ১০টির মধ্যে একটি চরিত্রে। "
জরিপে দেখা যায়, এলজিবিটিকিউপ্লাস চরিত্র যে ভাবে তুলে ধরা হয় তাতে গুরুতর সমস্যা রয়েছে।
তাদের কখনোই সিদ্ধান্তগ্রহণকারী চরিত্রে দেখা যায় না এবং প্রায়ই তারা হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক ঠাট্টা-মশকরার বিষয়বস্তু। প্রতিবন্ধী চরিত্রদের অবস্থাও তাই। তাদের দেখা যায় মাত্র ০.৫% চরিত্রে এবং তাদের ব্যবহার করা হয় সমবেদনা জাগাতে বা দর্শকদের হাসানোর জন্য।
বাস্তব জীবনকেও প্রভাবিত করছে সিনেমা
অধ্যাপক লিঙ্গম বলেন, "চলচ্চিত্রকাররা বলে থাকেন যে তারা বাস্তবতা দেখাচ্ছেন কিন্তু বাস্তবতার আরো অনেক দিক আছে যা তারা দেখান না। এটাকে বৈধতা দেবার জন্য তারা বাস্তবতা ও কল্পনার জগতে আসা-যাওয়া করতে থাকেন।
তার মতে, এ শিল্পে নারী ও কুইয়ার জেন্ডারকে যেভাবে তুলে ধরা হয় তা অবশ্যই বদলাতে হবে "কারণ সিনেমায় আমরা যা দেখি তা বাস্তব জীবনকেও প্রভাবিত করে।"
"ভারতে পরিবার ও স্কুলগুলো খুব কম সময়ই যৌন শিক্ষা বা সম্মতির বিষয়টি নিয়ে কথা বলে থাকে। এসব বিষয়ে আমাদের সাড়া মূলত বই ও সিনেমা দিয়েই প্রভাবিত হয়ে থাকে" - বলছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলছেন, এটা একটা সমস্যা - কারণ কবির সিংএর মত ছবিগুলোতে দেখানো হচ্ছে যে পুরুষ প্রধান চরিত্রটি নায়িকাকে প্রেমে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তার পিছু নিচ্ছে এবং তাকে হয়রানি করছে।
"এর ফলে বিষাক্ত পুরুষসুলভ আচরণকেও স্বাভাবিক বলে তুলে ধরা হচ্ছে," বলেন অধ্যাপক লক্ষ্মী লিঙ্গম - "ফলে বাস্তবে যখন রাস্তায় একজন নারীর পিছু নেয়া হয় বা হয়রানি করা হয়, তখন সবাই বলে যে এরকমটা হয়েই থাকে। এটাকে ঠেকানোর চেষ্টাও খুবই বিরল।"
কিছু ছবিতে 'প্রথা ভাঙা হচ্ছে'
অধ্যাপক লক্ষ্মী লিঙ্গম বলছেন, কিছু ছবি অবশ্য এই ছাঁচ ভেঙে বেরিয়ে আাসার চেষ্টা করছে।
যেমন মিশন মঙ্গল নামের ছবিতে বিদ্যা বালান একজন রকেট বিজ্ঞানীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন -যিনি 'কাজে বেশি সময় ব্যয় করা এবং সন্তানদের উপেক্ষা করার জন্য' তার স্বামীর তিরস্কারের শিকার হচ্ছেন। তখন তিনি পাল্টা জবাব দিচ্ছেন এই বলে যে - সন্তানদের দেখাশোনা কি স্বামীরও দায়িত্ব নয়?
নারী চরিত্রের প্রাধান্য এবং ক্ষমতাধর নারী চরিত্র আছে এমন ছবির মধ্যে কুইন এ্যান্ড লিপস্টিকও একটি। তবে এ ধরনের ছবির সংখ্যা খুব কম।
অধ্যাপক লিঙ্গম বলছেন, ভিজুয়াল মিডিয়া অনেক নতুন কাহিনিকে সামাজিক আলোচনার বিষয়বস্তু করে তুলতে পারে, তবে পরিবর্তন রাতারাতি হয় না। "কিন্তু একসময় এ পরিবর্তন ঘটবেই" - বলেন তিনি।
কোভিড-১৯ মহামারি এবং লকডাউন এর মধ্যেই সামনে এগুনোর নতুন পথ দেখিয়েছে। তিনি বলছেন, সমাজে একটা আলোড়ন তৈরি হয়েছেে এবং লোকের বানানো ভিন্ন ধরনের কনটেন্টে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। "ওটিটি প্ল্যাটফর্মে অনেক ইন্টারেস্টিং কনটেন্ট আছে এবং সেগুলো ভালো করছে" - বলেন তিনি।
অন্যদিকে বলিউড ফরমূলা আর কাজ করছে না।
"সালমান খান বা অক্ষয় কুমারের মত বড় তারকা নিয়ে করা পুরুষ-প্রধান ভায়োলেন্স মার্কা ছবিগুলো ভালো করেনি। একমাত্র ব্যতিক্রম শাহরুখ খানের পাঠান।"
অধ্যাপক লক্ষ্মী লিঙ্গমের মতে বলিউড শিল্পে এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
তার মতে, সাধারণত ভাবা হয় যে দর্শকদের বেশির ভাগই পুরুষ তাই তাদের কথা ভেবেই ছবি তৈরি হয়, কিন্তু সিনেমায় বহুধাবৈচিত্র্য থাকা দরকার।
বলিউডের দৃষ্টিভঙ্গী এত পুরুষতান্ত্রিক হবার একটা কারণ হচ্ছে এখানে পর্দার পেছনে কাজ করেন খুব কম সংখ্যক নারী। নারী চলচ্চিত্রকারের সংখ্যা আরো কম - বলছেন অধ্যাপক লিঙ্গম।
টিআইএসএস-এর জরিপে দেখা যায়, বলিউড ছবির ক্রুদের মধ্যে ২৬,৩০০ পুরুষ এবং মাত্র ৪,১০০ জন নারী।
"চলচ্চিত্র যদি ব্যাপকভিত্তিক দর্শকের জন্য তৈরি হয়, পর্দার পেছনের কর্মীদের মধ্যে যদি ব্যাপক বৈচিত্র্য থাকে তাহলে সিনেমার গল্পেও আসবে বৈচিত্র্য" বলেন তিনি।
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট