সরকারি তথ্যে জ্বালানি তেলের 'রেকর্ড মজুত', বাস্তবে কেন হাহাকার?

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
- Author, সজল দাস
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
ফিলিং স্টেশনের সামনে প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের সারি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও জ্বালানি তেল না পাওয়ার অভিযোগ অনেকের। অথচ সরকার বলছে, ইতিহাসের সব থেকে বেশি পরিশোধিত জ্বালানির মজুত এই মুহূর্তে বাংলাদেশের হাতে রয়েছে।
জ্বালানি তেল নিয়ে দেশের সরেজমিন চিত্র এবং সরকারি তথ্যের এই বিপরীত অবস্থানের প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্নই ঘুরেফিরে সামনে আসছে- মজুত ও সরবরাহ যদি পর্যাপ্তই থাকে তাহলে এত তেল যাচ্ছে কোথায়?
এক্ষেত্রে অবৈধ মজুত আর 'প্যানিক বাইংয়ের' বিষয়টি সামনে আনছেন অনেকে। এছাড়া পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জ্বালানি তেলের 'মৌসুমি ব্যবসায়ী' তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ফিলিং স্টেশনের সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে তেল না পেয়ে, দ্বিগুণ দামে খোলাবাজার থেকে কিনেছেন বাগেরহাটের বাসিন্দা প্রহ্লাদ দে।
"কারো কারো তো এটা ব্যবসা হইছে নতুন। সকালে বাইক নিয়ে বের হয়, সারাদিন পাম্পে পাম্পে ঘোরে। তেল নিয়ে এলাকায় গিয়ে ১২০ টাকার তেল ২২০-২৫০ টাকায় বিক্রি করে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
মাগুরার বাসিন্দা মোটরসাইকেল চালক আবু সাঈদ রাজিব বলছেন, পেট্রোল পাম্পগুলোতে লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে নানা অনিয়ম হচ্ছে, কিন্তু দেখার কেউ নেই।
"ট্যাগ অফিসার দেখিনি, তবে সব পাম্পেই পুলিশ আছে। আর থাকলেও লাভ কী? কে শোনে কার কথা। স্থানীয় পর্যায়ের অনেক মানুষ এগুলো মানে না," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
"ভয়াবহ অবস্থা, কেউ প্রভাব খাটাচ্ছে; আবার কেউ এক-দুইশো টাকা দিয়ে লাইনে না দাঁড়িয়ে বেশি তেল নিয়ে নেচ্ছে, যারা নিয়ম মেনে লাইনে দাঁড়ায়- তারা আছে দুর্ভোগে," বিবিসি বাংলাকে বলেন রাজশাহীর প্রেইভেটকার চালক আব্দুল কাদের।
তাহলে, জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত রুখে স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিতে ভ্রাম্যমান আদালত, ট্যাগ অফিসার নিয়োগসহ সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সেগুলো কি কাজে আসছে না?
এক্ষেত্রে জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবস্থা নিতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অনেকে।
তারা বলছেন, সরকারের দেওয়া তথ্যে মানুষ কেন আস্থা পাচ্ছে না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুুুুন:

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
হিসেব মিলছে না
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বাংলাদেশে কী পরিমাণ জ্বালানি মজুত রয়েছে? আর তা দিয়ে কতদিন চলবে? মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরির পর থেকে ঘুরে ফিরেই আসছে এসব প্রশ্ন।
গত ১৫ই এপ্রিল জ্বালানি বিভাগের দেওয়া সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে এক লাখ এক হাজার ৩৮৫ মেট্রিক টন।
এছাড়া, ৩১ হাজার ৮২১ মেট্রিক টন অকটেন, ১৮ হাজার ২১১ মেট্রিক টন পেট্রোল, ৭৭ হাজার ৫৪৬ মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েল এবং ১৮ হাজার ২২৩ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল মজুত রয়েছে।
এর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি জাহাজ নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী আমদানিকৃত জ্বালানি নিয়ে দেশে পৌঁছানোর অপেক্ষায় রয়েছে বলেও জানানো হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে শুক্রবার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড বা ইআরএল পরিদর্শন শেষে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দাবি করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সব থেকে বেশি পরিশোধিত জ্বালানি এই মুহূর্তে মজুত রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, "এপ্রিল এবং মে মাসের জ্বালানি চাহিদা পূরণের পূর্ণ সক্ষমতা বাংলাদেশ সরকারের রয়েছে। এখন আমরা মূলত জুন মাসের সম্ভাব্য চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।"
তাহলে ফিলিং স্টেশনের সামনে জ্বালানির জন্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি কমছে না কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সরকারও।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ শনিবার বিবিসি বাংলাকে বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ কিংবা বিকল্প উৎস থেকে আমদানির চেষ্টা, প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপই সরকার নিয়েছে।
তিনি জানান, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে, ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে, আতঙ্ক কমাতে জ্বালানি মজুতের তথ্য নিয়মিত মানুষকে জানানো হচ্ছে।
"আমরা তো তেলের সরবরাহ দিয়ে যাচ্ছি। আশ্বস্তও করছি যে, কোনো সংকট নেই। বরং অতীত চাহিদার তুলনায় ২৫ শতাংশ বাড়তি তেল দেওয়া হচ্ছে পাম্পগুলোতে। তবুও মানুষ কেন আতঙ্কিত হয়ে বাড়তি তেল কিনছে, পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাড়াচ্ছে?," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, গত বছরের একই সময়ে যতটুকু তেল সরবরাহ করা হয়েছিল এখনো সেটিই করা হচ্ছে, সংকটের কোনো কারণ নেই। মজুতদারদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত তেসরা মার্চ থেকে ১৪ই এপ্রিল পর্যন্ত দেশজুড়ে নয় হাজারের বেশি অভিযান চালিয়ে অবৈধ মজুত করা প্রায় পাঁচ লাখ ৪২ হাজার লিটার জ্বালানি জব্দ করা হয়েছে।
মজুতদারদের এক কোটি ৫৬ লাখ টাকা জরিমানা করার পাশাপাশি ৪৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়।

ছবির উৎস, MORTUZA
সমাধান হবে কীভাবে?
দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে 'তেলেসমাতি কর্মকাণ্ড' সাধারণ মানুষকে বেশ বিপাকে ফেলেছে। সরবরাহ এবং চাহিদার হিসেব মেলোতে হিমশিম সরকারও।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে এটা যেমন সত্য, তেমনি সরকারের দেওয়া তথ্যের ওপর মানুষ আস্থা রাখতে পারছে না এই বাস্তবতাও রয়েছে।
এক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য-অপতথ্যের মিশেলও নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে বলেও মনে করেন অনেকে।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলছেন, জরুরি পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যে প্রতিক্রিয়া জানানো দরকার ছিল সেটি করতে পারেনি সরকার।
"মানুষের যে ভোগান্তি তার সাথে সরকারের ভূমিকা ঠিক সংগতিপূর্ণ হচ্ছে না। সরকারের দেওয়া তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থা কেন তৈরি হচ্ছে না, কেনো মানুষ তারপরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা গিয়ে লাইনে বসে আছে- এটিও সরকারের পর্যালোচনা করা উচিত," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি নিয়ে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা থেকে মানুষ প্যানিক বাইং যেমন করছে, তেমনি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি ব্যবসা করার সুযোগও নিচ্ছে কেউ কেউ।
আতঙ্ক, সরকারি তথ্যে অস্বচ্ছতা, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানিক পর্যায়ে মজুতের অপচেষ্টা এমন নানা কারণ সম্মিলিতভাবে পুরো জ্বালানির বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।
"সরকারকেই তো ব্যবস্থা নিতে হবে। তেল যদি পর্যাপ্ত থাকে তাহলে সমস্যা হবে কেন? বড় পরিসরে মজুতের চেষ্টা কেউ করলে সেটি বন্ধের ব্যবস্থাও সরকারকেই নিতে হবে। সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব আছে কিন্তু মূল দায়িত্ব তো সরকারের," বলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বলছেন, পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও অস্থিরতা কেনো হচ্ছে এই প্রশ্নের উত্তর সরকারকেই খুঁজতে হবে।
"ম্যানেজমেন্টে সমস্যা হওয়ার তো কোনো কারণ নাই। কোনো দুর্যোগও তো ঘটে নাই যে স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনা ব্যহত হবে," বলেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল মজুত নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়, বরং বাজার মনিটরিং ও জনমনে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা দূর করার মূল দায়িত্ব সরকারকে সুপরিকল্পিতভাবে পালন করতে হবে।








