নির্বাচনের ‘প্রত্যাশিত অনুকূল পরিবেশ’ না থাকলে নির্বাচন কমিশন কী করতে পারে?
সম্প্রতি বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন গণমাধ্যমে পাঠানো একটি ধারণাপত্রে বলেছে যে, অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর নির্বাচনের জন্য যে অনুকূল পরিবেশ প্রত্যাশা করা হয়েছিল সেটি এখনো হয়ে উঠেনি।
নির্বাচন কমিশনের এই বক্তব্যকে নির্বাচন আয়োজনে 'অনিচ্ছা' হিসেবে দেখছেন বিএনপির একজন নেতা। যদিও আওয়ামী লীগ এটিকে ভিন্নভাবে দেখছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের এ ধরণের মন্তব্য স্ববিরোধী। কারণ নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখাও নির্বাচন কমিশনের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেন তারা।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “নির্বাচন কমিশন যদি বলে যে আমাদের কিছু করণীয় নাই, সেটা ফ্যাক্ট, বাট, একতরফা ইলেকশন তারা করাবে কিনা, সাসটেইনেবল হবে কিনা, বাংলাদেশের জন্য কী হবে, ভবিষ্যতে এটা কি কোন সমস্যা করবে কিনা সেটা তাদের ভাবতে হবে।”
তবে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কমিশনের সরকারের সাথেই কথা বলা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশন এমন এক সময়ে এই মন্তব্য করলো যখন, বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো কয়েক মাস ধরে টানা তাগিদ দিয়ে আসছে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরিন আক্তার বাংলাদেশ সফরে এসে সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে আবারো তাগিদ দিয়েছে।
এর আগে গত সাতই অক্টোবর দ্বাদশ নির্বাচন পূর্ব-পরিস্থিতি যাচাই করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। তারা ১৩ই অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করে সরকার, বিরোধীদল, সুশীল সমাজ ও নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠক করে। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে তারা নির্বাচন নিয়ে অর্থবহ সংলাপের উপর গুরুত্ব দিয়ে পাঁচ দফা সুপারিশ করে।
ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর কথা এর আগে জানায় ইউরোপীয় ইউনিয়নও।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। আর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে।
যা আছে ধারণাপত্রে
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আগামী ২৬শে অক্টোবর গণমাধ্যমের সাথে নির্বাচন কমিশনের একটি কর্মশালার আমন্ত্রণ পত্রের সাথে একটি ধারণাপত্র জুড়ে দেয়া হয়েছে। এই ধারণাপত্রে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
এতে বলা হয়, সরকার ও নির্বাচন কমিশন নিয়ে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের গণমাধ্যমে প্রচারিত অনাস্থা কাটিয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে জনগণের আস্থা অর্জনের চেষ্টা তারা অব্যাহত রেখেছেন। তবে অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর নির্বাচনের জন্য যে অনুকূল পরিবেশ প্রত্যাশা করা হয়েছিল সেটি এখনো হয়ে উঠেনি।
ধারণাপত্রে আরো বলা হয়, প্রত্যাশিত সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে মতভেদের নিরসন হয়নি। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো নিজেদের সিদ্ধান্ত ও অবস্থানে এখনো অনড় রয়েছে। মিছিল ও জনসমাবেশের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে তারা তাদের শক্তি প্রদর্শন করে যাচ্ছে।
“কিন্তু ওতে প্রত্যাশিত মীমাংসা বা সংকটের নিরসন হচ্ছে বলে কমিশন মনে করে না। বিষয়টি রাজনৈতিক। নির্বাচন কমিশনের এক্ষেত্রে করণীয় কিছুই নেই।”
“কমিশন গণতন্ত্র নিয়ে কাজ করে না। নির্বাচন নিয়ে কাজ করে। তবে নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রাণ ও বাহন। নির্বাচন আয়োজনে যদি সংকট নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকে তাহলে গণতন্ত্র বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।”
ধারণা পত্রে নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়নি বলে উল্লেখ করা হলেও এটি দিয়ে আসলে কী বোঝানো হয়েছে তা ব্যাখ্যা করা হয়নি।
এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সাথে যোগাযোগ করা হলে সেখানকার কর্মকর্তারা জানান, ধারণাপত্রটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার তৈরি করেছেন। এটি তার বক্তব্য। তিনি ছাড়া আর কেউ এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে পারবেন না।
বিষয়টি নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আওয়ালের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ছবির উৎস, Getty Images
নির্বাচন কমিশনের করণীয় কী?
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। এ নিয়ে সংবিধানে বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তবে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ তৈরিতে তাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে বলেও মনে করেন তারা।
নির্বাচন বিশ্লেষক মুনিরা খান বলেন, নির্বাচন কমিশন আসলে অনুকূল পরিবেশ বলতে কী বোঝায় তা নির্বাচন কমিশন বিস্তারিত বর্ণনা করেনি। অনুকূল পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব কার সে বিষয়েও কিছু বলা হয়নি। এছাড়া অনুকূল পরিবেশ না থাকলে নির্বাচন অনুষ্ঠান হবে নাকি বন্ধ থাকবে সে বিষয়েও কিছু বলা হয়নি।
নির্বাচন কমিশনের এ ধরণের বক্তব্য আগামী নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে বলেও মনে করেন তিনি।
মিজ খান বলেন, “তাদের এই একটা লাইনেই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। কারণ তারা ইলেকশনের আগে বললো যে, নির্বাচনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়নি, তারপরও আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তার মানে এটাই দাঁড়ায়, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে।”
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নির্বাচনের যেহেতু আর খুব বেশি সময় বাকি নেই, তাই এই মুহূর্তে এসে নির্বাচনের কমিশনের খুব বেশি কিছু করারও নেই।
তবে নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে নির্বাচন কমিশন কোন পদক্ষেপ নেবে কিনা সেটা একান্তই নির্বাচন কমিশনের বিষয়।
“তারা(নির্বাচন কমিশন) যে ইলেকশন করতে পারছে না, পরিবেশ নাই, একদিকে চিঠি দিয়ে জানাচ্ছে, পরিবেশ নাই আমরা কথা বলতে চাই, সেখানে তাদের উচিত হচ্ছে সরকারের সাথে কথা বলা।”
নির্বাচন কমিশনের ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, কমিশন নিজের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে সর্বোচ্চ সামর্থ্য প্রয়োগ করে সরকারের সহায়তা নিয়ে সংসদ নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ, পক্ষপাতহীন ও শান্তিপূর্ণ করার বিষয়ে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। তবে এরপরও বিভিন্ন মহল থেকে নির্বাচন কমিশনের উপর অনাস্থা ব্যক্ত করা হচ্ছে।
ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করার বিষয়ে সরকারের সাথে কমিশনের আলোচনা করা উচিত। সেটা না করে নির্বাচন কমিশনের এমন মন্তব্য স্ববিরোধী বলে মন্তব্য করেন সাখাওয়াত হোসেন।
“কথা বলতে হবে সরকারের সাথে, এই যে ধরপাকড় চলছে, নানান কিছু চলছে, অবিশ্বাস আছে, কিভাবে কী করা যায়, বিশ্বাস (কীভাবে) অর্জন করা যায়। কেন ব্রিটেনকে বলতে হবে, আমেরিকাকে বলতে হবে, তো সেগুলোতে তো তারা কোন অ্যাটেমপ্ট নিয়েছে বলে মনে হয় না এই মুহূর্তে।”
নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে এরইমধ্যে বিভিন্ন জেলায় সরঞ্জাম পাঠানো শুরু করেছে কমিশন। সাবেক নির্বাচন কমিশনার মি. হোসাইন বলেন, নির্বাচন কমিশনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে প্রস্তুতি নিচ্ছে সেটা একটা কারিগরি প্রস্তুতি মাত্র। এটার মানে এই নয় যে, নির্বাচন হয়ে যাচ্ছে।
তার মতে, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হতে হলে, সেখানে কত শতাংশ ভোটার অংশগ্রহণ করলো সেটা বড় কথা নয়।
বরং আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে বোঝায়, যেসব বড় দলগুলো পার্লামেন্টে বড় সংখ্যায় যেতে পারবে, সরকার গঠন করার মতো সক্ষমতা আছে কিংবা বিরোধী দল হওয়ার মতো ক্ষমতা রাখে, সে ধরণের বড় দলগুলোর অংশগ্রহণকে বোঝায়।
সে হিসেবে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত দুটি বড় দল আছে উল্লেখ করে মি. হোসেন বলেন, এই দুটি দলের সরকার গঠনের সক্ষমতা আছে এবং অতীতেও তারা সরকার গঠন করেছে। ফলে নির্বাচনে এই দুই দলের অংশগ্রহণ জরুরী। কারণ এই দুই দলেরই বড় ভোট ব্যাংক রয়েছে।
যা বলছে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল
আওয়ামী লীগ বরাবরই দাবি করে আসছে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে তারা কাজ করে যাচ্ছে। আর এর অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে আরো বেশি স্বাধীন ও শক্তিশালী করা হয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক এ মন্তব্য সম্পর্কে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বিবিসি বাংলাকে বলেন, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত অনুকূল পরিবেশ গড়ে না ওঠার কথাটি এক হিসেবে ঠিকই আছে। কারণ বাংলাদেশের নির্বাচন সাধারণ মানুষের কাছে একটা উৎসবমুখর পরিবেশে হয়। বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্তে এই উৎসবমুখর পরিবেশটি তৈরি হয়নি বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, “তফসিল ঘোষণার সময় আসছে। এমন অবস্থায় সব দল নির্বাচন মুখী হয়ে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করবে, সেটা না করে যখন আন্দোলনের পথে নামে তখন নির্বাচন কমিশনের কাছে কিছুটা হলে অস্বস্তিদায়ক মনে হয়েছে।”
ছবির উৎস, মাহবুবুল আলম হানিফ/ফেসবুক
মি. আলম দাবি করেছেন যে, ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ হবে- সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কারণ আগামী নির্বাচন একেবারেই ত্রুটিমুক্ত, অভিযোগমুক্ত করার জন্য, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিএনপির দাবি অসাংবিধানিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব দাবি মেনে নেয়া হবে না।
তিনি বলেন, “আমরা আশা করছি, বিএনপি তাদের ভুল বুঝতে পেরে নির্বাচনে অংশ নেবে। তবে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলেও নির্বাচন বন্ধ থাকবে না"।
তার মতে, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কিনা সেটা আসলে কোন রাজনৈতিক দলের অংশ নেয়া-না-নেয়ার উপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে ভোটারদের অংশগ্রহণের উপর।
এদিকে নির্বাচনের কমিশনের এমন মন্তব্যের বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, নির্বাচন কমিশন শুধুমাত্র সরকারের ভয়ের কারণে নির্বাচন করার কথা বলে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা নির্বাচন করতে নৈতিকভাবে ইচ্ছুক নয়।
“নৈতিকভাবে তারা এটাকে সমর্থন করে না, এটা প্রমাণ হয়েছে। কারণ নির্বাচন কমিশনও এই সরকার কর্তৃক গঠিত। সুতরাং তাদের দুই দিকেই রক্ষা করতে হয়।”
মি. হোসেন দাবি করেন, সরকারবিরোধী আন্দোলনের চাপ দেখে নির্বাচন কমিশন অবচেতনভাবে এই কথা বলে ফেলেছে।
নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ করার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের অনেক কিছু করার আছে বলে মনে করেন তিনি।
বিএনপি বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে বৈধ বলে স্বীকার করে না জানিয়ে তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন যদি ভালো কিছু করে, সেটায় আমাদের অংশগ্রহণ থাকার কোন সম্ভাবনা নাই। কারণ ভাল কিছু করবে এমন কোন নমুনা তারা দেখাতে পারে নাই।”
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট