ভারতের দুই রাজ্যের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ কী নিয়ে?
ছবির উৎস, ANI
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
ভারতের সঙ্গে চিনের সীমান্ত বিবাদ দীর্ঘদিনের। কাশ্মীরের একটা অংশ নিয়েও পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের ঘোরতর বিবাদ আছে।
আবার ছিটমহল নিয়ে বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে যে বিতর্ক ছিল, তা এখন মোটামুটি মীমাংসা হয়ে গেলেও একটা সময়ে ছিটমহল দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ খবর হিসাবে উঠে আসত।
নেপালের সঙ্গেও সীমান্ত বিতর্ক মাঝেমধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
কিন্তু আরও এক সীমানা বিবাদ আছে, ভারতের অভ্যন্তরেই। এক রাজ্যের সঙ্গে অন্য রাজ্যের।
যার জেরে গত ৪২ বছরে প্রাণ গেছে দেড়শোরও বেশি মানুষের। আহত হয়েছেন সাড়ে তিনশোরও বেশি মানুষ। আর ভিটে হারা হয়েছেন ৬৫ হাজার মানুষ।
২০২১ সালে এই তথ্য সংকলন করেছিল ভারতের রাইটস এন্ড রিস্কস অ্যানালিসিস গ্রুপ।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
ছবির উৎস, Conrad Sangnma Twitter
আসামের সঙ্গে প্রতিবেশী রাজ্যগুলির বিবাদ
এই সীমান্ত বিবাদগুলি উত্তরপূর্ব ভারতের রাজ্য আসামের সঙ্গে তাদেরই প্রতিবেশী মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড আর অরুণাচল প্রদেশের মধ্যে।
নিহতের তালিকায় গত মঙ্গলবার যুক্ত হয়েছে আরও ছয়টি নাম। মেঘালয়ের মুখরায় আসাম পুলিশের গুলি চালনায় মারা গেছেন ছয় জন।
ঘটনার পরে অপসারিত আসামের পশ্চিম কার্বি আংলঙ জেলার পুলিশ সুপারিন্টেনডেন্ট ইমদাদ আলি সংবাদ সংস্থা পিটিআই কে জানিয়েছিলেন যে আসামের অন্তর্ভুক্ত বনাঞ্চল থেকে কাঠ পাচারের করা হচ্ছে এই সন্দেহে একটি ট্রাককে বনরক্ষীরা আটক করে। ধরা হয় চালক ও খালাসীকে।
তারপরে বড় সংখ্যায় মেঘালয়ের বাসিন্দারা এসে আসাম পুলিশের কাছ থেকে আটককৃতদের ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য হামলা চালায়, তখনই গুলি চালায় পুলিশ।
আর মেঘালয় বলছে তাদের রাজ্যের অন্তত পাঁচ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে এসে ওয়েস্ট জয়ন্তিয়া হিলস জেলার মুখরায় গুলি চালিয়েছে আসাম পুলিশ।
ছবির উৎস, Getty Images
বিরোধের সূত্রপাত ৫০ বছর আগে
অথচ একসময়ে মেঘালয় ছিল আসামেরই অংশ, আর শিলং শহর ছিল অবিভক্ত আসামের রাজধানী।
বুধবার সেই শিলং শহরেই আসামের বিরুদ্ধে কালো পতাকা দেখানো হচ্ছে।
"মেঘালয়ে এখন খাসি সম্প্রদায়ের একটা ধর্মীয় উৎসব চলছে। তাই রাস্তাঘাট মোটামুটি ফাঁকা। তবে বসতবাড়িগুলোতে আর গাড়িতে সবাই কালো পতাকা লাগিয়েছেন প্রতিবাদ জানাতে," জানাচ্ছেন শিলংয়ের সাংবাদিক জো থাঙ্খাও।
১৯৭২ সালে আসাম পুনর্গঠন আইন অনুযায়ী মূল রাজ্যটি ভেঙ্গে তৈরি হয় মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড আর অরুণাচল প্রদেশ।
মেঘের বাড়ি অর্থাৎ মেঘ আলয় - মেঘালয় এই সংস্কৃত নামটা আবার দেওয়া এক বাঙালীর। ভারতীয় মানচিত্রের জনক বলে যাকে মানা হয়, সেই ভৌগলিক শিবপ্রসাদ চ্যাটার্জী ব্রিটিশ আমলে রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন মেঘালয় মালভূমির ওপরে।
আসাম ভাগ করার পরিকল্পনা যখন থেকে শুরু হয়, তখন মি. চ্যাটার্জীর নামকরণটাই পছন্দ হয় ভারত সরকারের।
আর সেই সময় থেকেই শুরু মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম আর অরুণাচল প্রদেশের সঙ্গে আসামের সীমান্ত বিবাদ।
আসাম - মেঘালয় সীমান্তের ১২ টি অঞ্চলে বিবাদ
আসাম আর মেঘালয়ের মধ্যে প্রায় আটশো কিলোমিটার সীমান্ত আছে আর এই সীমান্ত অঞ্চলের ১২ টি জায়গা নিয়ে গত ৪০ বছর ধরে বিবাদ চলছে দুই রাজ্যের মধ্যে।
কখনও কখনও সেই বিবাদ হয়ে ওঠে সহিংস, যেমনটা হয়েছে গত মঙ্গলবার।
"বিবাদগুলো শুরু হয় একেবারেই স্থানীয় স্তরে। মূলত বনজ সামগ্রীর ওপরে কার অধিকার তা নিয়েই দুই রাজ্যের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর মধ্যে সংঘাত বাধে, আর তার পরে সেখানে পুলিশ প্রশাসনও হস্তক্ষেপ করে, যার ফলে বিষয়টা সরকারী স্তরে চলে যায়। কিন্তু শেষমেশ প্রাণ যায় বা আহত হন স্থানীয় মানুষরাই। সীমানা নিয়ে বিবাদ আগেও ছিল, কিন্তু সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে সেগুলো সহিংস হয়ে উঠছে," বলছিলেন আসামের বার্তালিপি পত্রিকার কার্যনির্বাহী সম্পাদক প্রণবানন্দ দাস।
ছবির উৎস, Getty Images
সমস্যা সমাধানে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আসাম ভেঙ্গে মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম আর অরুণাচল প্রদেশ তৈরি করা হয় ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ আমলের মানচিত্রের ওপরে ভিত্তি করে। স্থানীয় মানুষের ভাবাবেগ বা ইতিহাস সেখানে প্রতিফলিত হয় নি বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সীমান্ত বিবাদ মিটিয়ে ফেলতে একাধিক কমিটি হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টে মামলাও হয়েছে, এসেছে বহু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়ন করা যায় নি। দুই পক্ষই মেনে নেবে, এমন সমাধান আজও রয়ে গেছে অধরা।
তবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উপগ্রহ চিত্রের মাধ্যমে তো এখন সেই সংঘাতগুলো মিটিয়ে ফেলাই যায়।
"বিষয়টা কখনই প্রযুক্তি বা কারিগরি দক্ষতার অভাব নয়। যেটা নেই সেটা হল রাজনৈতিক সদিচ্ছা। উপগ্রহ চিত্রের মাধ্যমে সীমানা চিহ্নিত করে আসামের সঙ্গে চারটি রাজ্যের বিবাদ মিটিয়ে ফেলার পরামর্শ তো দিয়েছিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কিন্তু সেই পরামর্শ তো আর রাজনৈতিক সদিচ্ছা তৈরি করে দিতে পারে না," মন্তব্য করছিলেন রাইটস এন্ড রিস্কস অ্যানালিসিস গ্রুপের পরিচালক সুহাস চাকমা।
মি. চাকমা বলছেন, "আমিই বড় - এটা প্রমাণ করার প্রবণতা ছাড়তে হবে উত্তর-পূর্বের মুখ্যমন্ত্রীদের।"
ছবির উৎস, Getty Images
সমাধান কী হতে পারে?
মি. চাকমা কেন্দ্রীয় সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত স্থিতাবস্থা মেনে চলুক রাজ্যগুলো।
"যেসব এলাকা নিয়ে সংঘাত আছে, সেখানে লাইন অফ কন্ট্রোল চিহ্নিত করে দুই রাজ্যের পুলিশ মোতায়েন করা হোক। এই পুলিশ বাহিনী কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে সমন্বয় করে কাজ করবে। বিতর্কিত সীমান্ত অঞ্চলের মানুষদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করে পরিচয় পত্র দেওয়া এবং সেখানে যাতে নতুন করে কোনও বসতি না গড়ে উঠতে পারে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলিকে," জানাচ্ছিলেন সুহাস চাকমা।
নানা ধরণের পরামর্শ, আদালতের রায় অনেকেই তো এসেছে, কিন্তু প্রশ্নটা হল সেগুলো বাস্তবায়ন করবে কোন রাজ্য?
আসাম আর মেঘালয় সরকারও তো কর্মকর্তাদের নিয়ে কমিটি গড়েছিল। তারা ঠিক করেছিল যে ১২টি অঞ্চল নিয়ে বিরোধ, তার মধ্যে ৬টি অঞ্চলের বিষয়গুলি সমাধান করে ফেলবে তারা। সেই মর্মে এবছরেরই গোড়ার দিকে চুক্তিও হয়েছিল।
কিন্তু তারপরেও এক রাজ্যের পুলিশ অন্য রাজ্যের সীমানায় ঢুকে গুলি চালালো, প্রাণ গেল নিরীহ গ্রামবাসীর।
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট