দিল্লি: হিন্দুদের নবরাত্রি উৎসবের সময়ে ভারতের রাজধানীতে মাংসের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ বিজেপি মেয়রের
ছবির উৎস, Getty Images
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা
ভারতের রাজধানী দিল্লির দক্ষিণাঞ্চলের পৌর কর্পোরেশন নির্দেশ দিয়েছে যে হিন্দুদের কাছে পবিত্র উৎসব নবরাত্রি চলাকালীন সব ধরণের মাছ-মাংসের দোকান বন্ধ রাখতে হবে।
বিজেপি পরিচালিত দক্ষিণ দিল্লি কর্পোরেশনের মেয়র বলছেন যে নবরাত্রির সময়ে বেশীরভাগ হিন্দুই মাছ-মাংস, এমনকি পেয়াজ রসুনও খান না, তাই খোলা জায়গায় মাছ-মাংস বিক্রি হতে দেখলে সেই সব হিন্দুদের অস্বস্তি হয়। সেকারণেই এই নির্দেশ।
তবে মেয়রের নির্দেশ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে রাজনৈতিক মহল আর সাধারণ মানুষের মধ্যে।
সাধারণ মানুষ, যারা মাছ মাংস খান, তারা বলছেন এভাবে তাদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে না। যদি কারও নিরামিষ খেতে ইচ্ছা হয়, তিনি খেতেই পারেন, কিন্তু মাংসের দোকান কেন বন্ধ থাকবে - প্রশ্ন তাদের।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:
ছবির উৎস, Getty Images
কেন নবরাত্রির সময়ে মাংসের দোকান বন্ধ?
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র চৈত্র নবরাত্রি শুরু হয়েছে ২রা এপ্রিল থেকে - তা চলবে এ মাসের ১১ তারিখ অবধি।
তারা মনে করেন, এই সময়েই তাদের আরাধ্য দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন।
মূলত উত্তর আর পশ্চিম ভারতের হিন্দুদের একাংশ এই উৎসব পালন করেন। তারা এই সময়ে কেউ উপোস করেন অথবা কঠোরভাবে নিরামিষ খাবার খান - এমন কি পেঁয়াজ রসুনও খান না তারা।
এই দিনগুলিতে এদের বাড়িতে নিয়মিতই চলে পূজাপাঠ।
বিজেপি পরিচালিত দক্ষিণ দিল্লির মেয়র মুকেশ সুরিয়ানের দাবী, দিল্লির প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষই এইসব কঠোর নিয়ম পালন করেন। এবং তাদের যাতে মাছ-মাংস ইত্যাদি বিক্রির দৃশ্য দেখে অস্বস্তিতে না পড়তে হয়, সেজন্যই তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে নবরাত্রির সময়ে দক্ষিণ দিল্লিতে মাছ-মাংসের দোকান বন্ধ থাকবে।
সংবাদ এজেন্সি এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেয়র বলেন, "মানুষের একটা আবেগ আছে যে নবরাত্রির সময়ে আমিষ খাবার বা রসুন, পেঁয়াজও বাড়িতে ঢোকে না। প্রায় ৯৯ শতাংশ দিল্লিবাসীই এটা মেনে চলেন।"
ছবির উৎস, Getty Images
"এই বিষয়টি মাথায় রেখেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেখানে রসুন পেয়াজও খাওয়া হয় না, তখন দক্ষিণ দিল্লির মাংসের দোকানগুলোও বন্ধ রাখা উচিত। এই নির্দেশ যারা মেনে চলবেন না, তাদের জরিমানা করা হবে," জানিয়েছেন মি. সুরিয়ান।
তিনি এও বলেন, এরপর থেকে নীতি বদল করে লাইসেন্স দেওয়ার সময়েই এই শর্ত রাখা থাকবে যে নবরাত্রির সময়ে মাছ-মাংসের দোকান বন্ধ থাকতে হবে।
রাজনৈতিক মহলে কড়া প্রতিক্রিয়া
বিজেপির মেয়রের এই নির্দেশের পরে রাজনৈতিক মহলে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
ভারত-শাসিত পূর্বতন জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের প্রাক্তণ মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা বলেছেন, "সংখ্যাগুরুর খাদ্যাভ্যাসই যদি এই নির্দেশের কারণ হয়, তাহলে কাশ্মীরের সংখ্যাগুরু মুসলমান যখন রোজা রাখেন, তখন অমুসলিম কাউকে দিনের বেলা প্রকাশ্যে খাওয়ার ওপরে নিষেধাজ্ঞা চাপানো উচিত!"
আবার তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র টুইট করে বলেছেন, "আমি দক্ষিণ দিল্লিতে থাকি। সংবিধান আমাকে যেমন, যখন খুশি মাংস খাওয়ার অধিকার দিয়েছে, তেমনই দোকানীদেরও স্বাধীনতা আছে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার।"
ছবির উৎস, Getty Images
মাংসের দোকান বন্ধের নির্দেশে ক্ষুব্ধ দোকানীরাও
দক্ষিণ দিল্লির আইএনএ মার্কেটে মাছ-মাংসের এক দোকানী বলছিলেন যে কর্পোরেশন যদি নির্দেশ দেয় তাহলে মানতেই হবে।
"কিন্তু আমার কাছে যে কয়েক লক্ষ টাকার মাছ-মাংস মজুত হয়ে আছে, তার কী হবে?"
"এছাড়াও আমার কাছে যে জনা কুড়ি ছেলে কাজ করে, যাদের দৈনিক আয় গড়ে ২০০ টাকা - তারা এই ছ'দিন কাজ না করলে খাবে কী?" প্রশ্ন ওই মাংসের দোকানীর।
আরেক দোকানী বলছিলেন, "আমার দোকান থেকে নানা হোটেল রেস্তোরাঁয় মাংস যায়। সেগুলো বন্ধ হয়ে গেলে কী করে চলবে আমার!"
দিল্লির বাঙালী সমাজও ক্ষুব্ধ
দক্ষিণ দিল্লিতে বেশ বড় সংখ্যায় বসবাস করেন বাঙালীরা - চিত্তরঞ্জন পার্ক এবং তার আশপাশ অঞ্চলেই মূলত তাদের বাড়ি।
ছবির উৎস, Getty Images
এ রকমই একজন, শুভাশীষ দত্ত বলছিলেন, তার খাদ্যাভ্যাস কী হবে, সেটা কেন অন্য কেউ ঠিক করে দেবে?
"খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আমি নিরামিষ খাব না আমিষ খাব, সেটা সম্পূর্ণভাবে আমার সিদ্ধান্ত, আমার ব্যক্তিগত পছন্দ। এটা যদি কেউ আমার ওপরে চাপিয়ে দেয়, খারাপ তো লাগবেই," বলছিলেন মি. দত্ত।
দক্ষিণ দিল্লিরই আরেক বাসিন্দা শ্রেয়সী সোমচৌধুরী বলছিলেন যে মাছ মাংসের দোকান বন্ধ থাকলে তাকে অনলাইনে আনাতে হবে আমিষ খাবারগুলি।
"আমরা তো বাঙালী হিন্দু। নবরাত্রি আমরা তো পালন করি না, সব কিছুই খাই। এখন দোকানগুলো যদি বন্ধ থাকে তাহলে অনলাইনেই আনাতে হবে। এতে একটু অসুবিধা তো হবেই," মন্তব্য মিসেস সোমচৌধুরীর।
নির্দেশের পিছনে রাজনীতি?
দিল্লির বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট উৎপল ঘোষ বেনারসে মামাবাড়িতে জন্মালেও তার বড় হয়ে ওঠা দিল্লিতেই।
তিনি বলেন, "ছোট থেকেই তো নবরাত্রি দেখছি। কোনওদিন দেখিনি যে নবরাত্রির সময়ে মাছ-মাংসের দোকান বন্ধ রাখা হচ্ছে। নির্দেশটা দেখে বোঝাই যাচ্ছে এর পিছনে রাজনীতি আছে।"
পূর্ব দিল্লির মেয়রও একইভাবে সেখানকার মাংস বিক্রেতাদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন যে তারাও যেন নবরাত্রির সময়ে দোকান বন্ধ রাখেন। তবে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দিল্লির সরকার এ ধরনের কোন বিজ্ঞপ্তি জারি করেনি।
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট