করোনা ভাইরাসের নেগেটিভ সনদ: প্রতারণার শিকার হয়ে নিজেই যেভাবে প্রতারক হয়ে উঠলেন একজন অভিবাসী শ্রমিক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রতারণার শিকার হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি অভিবাসী শ্রমিক।
    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

অভিবাসী শ্রমিকদের করোনাভাইরাসের নেগেটিভ সনদ দেয়ার কথা বলে বিপুল পরিমাণে অর্থ হাতিয়ে নেয়া একটি চক্রের ১৪ জন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ন।

এই চক্র কীভাবে প্রতারণা করতো সে ব্যাপারে আজ বৃহস্পতিবার এই বাহিনীর তরফ থেকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে, যা রীতিমত ফিল্মি গল্পের মতো।

র‍্যাব জানিয়েছে, প্রতারণার মাধ্যমে কোটি টাকার উপরে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। দেড় হাজারের উপরে ব্যক্তির সাথে প্রতারণা করা হয়েছে বলে গ্রেফতারকৃতরা স্বীকার করেছে। তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছে র‍্যাব।

প্রতারক চক্রের কাছ থেকে ৩২টি মোবাইল ফোন, ১২০টি মোবাইল সিম, সিম অ্যাকটিভেট করার ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন এবং সাত লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার রাজধানী ঢাকা, কুমিল্লা এবং বাহ্মণবাড়িয়া জেলা থেকে চক্রটির সদস্যদের গ্রেফতার করেছে র‍্যাবের ১১ নম্বর ব্যাটালিয়ন।

পনের জনের মতো ভুক্তভোগী, কুমিল্লা জেলার সিভিল সার্জন এবং কয়েকটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের করা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার অভিযান চালানো হয় বলে জানিয়েছেন র‍্যাবের ১১ নম্বর ব্যাটালিয়নের কমান্ডার লেঃ কর্নেল তানভীর মাহমুদ পাশা।

ছবির উৎস, Rapid Action Battalion

ছবির ক্যাপশান, জব্দ করা মোবাইল ফোন ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি।

নিজে যেভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন

কমান্ডার পাশা জানিয়েছেন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মো: বেলাল হোসেন নামে গ্রেফতারকৃতদের একজন জানিয়েছেন তিনি নিজে কীভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন।

তিনি ২০২১ সালের মার্চ মাসে ওমানে উট পালনকারীর কাজে যাচ্ছিলেন। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী কুমিল্লার একটি হাসপাতালে তিনি গিয়েছিলেন করোনাভাইরাসের পরীক্ষার জন্য।

এরপর তার কাছে একটি ফোন কল আসে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে নিজেকে ওই হাসপাতালের চিকিৎসক দাবি করে একজন তাকে জানায় যে তার করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

কিন্তু বিদেশ যেতে হলে তার নেগেটিভ সনদপত্র লাগবে। নির্দিষ্ট সময়ে তাকে গিয়ে কাজে যোগদান করতে হবে তা নাহলে হয়ত কাজ হারাবেন। অন্যদিকে প্লেনের টিকেট ছিল 'নন-রিফান্ডেবল'।

তাকে যখন অজ্ঞাত ওই ব্যক্তি ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে করোনাভাইরাস পরীক্ষার নেগেটিভ সনদ যোগাড় করে দেয়ার প্রস্তাব করেন তখন তিনি টাকা ও কাজ হারানোর ভয়ে রাজি হয়ে যান বলে বিবিসি বাংলাকে জানান কমান্ডার পাশা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিদেশগামীদের করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য সরকার নির্ধারিত কেন্দ্র রয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে কমান্ডার পাশা ধৃত মো: বেলাল হোসেনের কাছে জানতে পারেন যে, মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে টাকা দেবার পর তাকে হাসপাতাল থেকে সনদপত্র নিয়ে আসতে বলা হয়। কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে মি. হোসেন দেখেন তিনি সংক্রমিত হয়েছেন,পরীক্ষার ফল যা ছিল তাই আছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যখন তাকে বোঝাতে সমর্থ হয় যে এই নামে কোন চিকিৎসক সেখানে কাজ করেন না, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে তার সাথে প্রতারণা করা হয়েছে।

যেভাবে নিজেই হয়ে উঠলেন প্রতারক

মোঃ বেলাল হোসেন জিজ্ঞাসাবাদে জানান, এরপর কাজে যোগদানের সময় বাড়িয়ে একপর্যায়ে তিনি ওমান চলে যান। কিন্তু যাওয়ার আগে নিজেও একই পদ্ধতিতে বিদেশগামীদের প্রতারণার একটি চক্র গড়ে তোলেন। এক পর্যায়ে আবার দেশে ফিরে আসেন।

লেঃ কর্নেল পাশা জানিয়েছেন, "ফাঁদ পাতার জন্য চক্রের কয়েকজন নমুনা সংগ্রহ কেন্দ্রের আশপাশে অভিবাসী শ্রমিক সেজে ঘোরাঘুরি করতো, যাদের কাছে বিমানের পুরনো টিকেট, বোর্ডিং পাস থাকতো। তাদের কাজ ছিল ফরম পূরণ করার সময় টেলিফোন নম্বর সহ বিদেশগামীদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা। এরা শুধু এই কাজটিই করতো।

"আর একদল হাসপাতালের ডাক্তার বা কর্তৃপক্ষ সেজে শুধু ফোন করতো। এরকম কাজ ভাগ করা ছিল। ফোন করে যখন ব্যক্তির বিস্তারিত তথ্য দিত তখন তাকে সন্দেহ করার কোন কারণ দেখে নি ভুক্তভোগীরা," বলেন মিঃ পাশা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রতারণার শিকার কয়েকজন র‍্যাবের কাছে অভিযোগ করেছিলেন।

তিনি জানিয়েছেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ সহ অন্তত সাতটি জেলায় যেসব সরকারি হাসপাতালে বিদেশগামীদের নমুনা সংগ্রহ করা হয় সেখানে সকাল থেকে চক্রের সদস্যরা অবস্থান করতো।

একটি দল ফোন করে নেগেটিভ সনদ প্রস্তুত এবং হাসপাতালে কখন তা সংগ্রহের জন্য যেতে হবে সেটি জানিয়ে দিত। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ বিনিময়, ফোন করার জন্য বৈধ সিম সংগ্রহ এরকম দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া ছিল। সিম ব্যবহার করে তা কিছুদিন বন্ধ রাখা হতো বা ফেলে দেয়া হতো।

কমান্ডার লেঃ কর্নেল তানভীর মাহমুদ পাশা বলছিলেন, "প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারতেন যে আসলে কী ঘটেছে। যাদের নমুনা নেগেটিভ আসতো তারা প্রতারণার বিষয়টা বোঝেনি। কিন্তু টাকা দেয়ার পরও যারা হাসপাতালে গিয়ে পজিটিভ রিপোর্ট পেয়েছেন তাদের অনেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ছিলেন যে তারা নেগেটিভ সনদ পাওয়ার জন্য টাকা দিয়েছেন, কিন্তু রেজাল্ট পজিটিভ কেন?"

এই প্রতারণার ঘটনায় নমুনা যেখানে দেয়া হয়েছে সেখানকার কোন কর্মী জড়িত কিনা সে সম্পর্কে জানা যায়নি।

ছবির উৎস, DGHS Website

ছবির ক্যাপশান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে সরকার নির্ধারিত কেন্দ্র সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।

যেভাবে সতর্ক হবেন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য তথ্য শাখার প্রধান ডাঃ শাহ্ আলী আকবর আশরাফী বলছেন, "সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে তথ্যটি অভিবাসীদের জানতে হবে যে নমুনা পরীক্ষার ফল মোবাইল নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর সহ সরকারি সিস্টেমে উঠে যায়। সেটা পজিটিভ হলে সিস্টেমে কেউ নেগেটিভ করে দিতে পারে না।"

তিনি বলেন, "বিমানবন্দরে যাওয়ার পর সেখানে তারা ওই সিস্টেম থেকেই পাসপোর্ট নম্বর সহ কোভিড সম্পর্কিত তথ্যটা দেখে। অতএব কেউ যদি প্রতিশ্রুতি দেয় যে নেগেটিভ রেজাল্ট এনে দেবে সেটা সম্ভব নয়। বিমানবন্দরে গেলেই সেটা বের হয়ে যাবে। এই তথ্যটা অভিবাসীদের অবশ্যই জানতে হবে।"

শুধুমাত্র সরকার নির্ধারিত কেন্দ্রে গিয়ে নিয়ম মেনে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।

বর্তমানে ঢাকায় ৭টি, ঢাকার বাইরে ১৬ টি সরকারি হাসপাতালে এবং সারা দেশে ৬৩ টি বেসরকারি হাসপাতালে বিদেশগামীদের করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হচ্ছে। এসব হাসপাতাল সম্পর্কিত তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।

ভ্রমণের ৪৮ অথবা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নমুনা দেয়ার নিয়ম রয়েছে যা নির্ভর করে কোন্ দেশে ভ্রমণ করা হচ্ছে তার উপর।

নমুনা দেবার সময় বিদেশ ভ্রমণকারী এই তথ্যটি উল্লেখ করতে হবে। তা না হলে সাধারণ পরীক্ষা হবে এবং সেটি বিমানবন্দরে গ্রহণ করা হবে না।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অভিবাসী শ্রমিকদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

নমুনা দেবার সময় সাথে করে অবশ্যই পাসপোর্ট ও বিমানের টিকেট আনতে হবে। পরীক্ষার ফল প্রস্তুত হলে বিদেশগামী যাত্রীর মোবাইল ফোনে এসএমএস চলে যাবে। সেখানেই তারা ফল জানতে পারবেন। এই এসএমএস কোন ব্যক্তিগত নাম্বার থেকে আসবে না। এসএমএসে ডিজিএইচএস লেখা থাকবে।

ওয়েবসাইট থেকে সনদ ডাউনলোড করা যাবে। ফল পজিটিভ হলে সাতদিনের মধ্যে তিনি আর নমুনা দিতে পারবেন না। সাতদিন না হওয়া পর্যন্ত ওয়েবসাইটে ওই ব্যক্তির তথ্য কোনভাবেই সংযুক্ত হবে না, সেভাবেই ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মি. আশরাফী বলছেন, "এগুলোই বিদেশগামীদের জন্য নিয়ম। এসব মেনে সরকার-নির্ধারিত কেন্দ্রে পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে বড় সতর্কতা। আর সবচেয়ে বড় পরামর্শ হচ্ছে কেউ ফোনে নেগেটিভ সনদ দেবার প্রস্তাব করলেও তাকে অবশ্যই বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ সিস্টেমে ফল নেগেটিভ হবে না। এটা অভিবাসীর নিজের সচেতনতার বিষয়।"

অন্যদিকে কেউ এমন প্রস্তাব করলে টাকা না দিয়ে বরং বিষয়টি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে পরামর্শ দিচ্ছেন লেঃ কর্নেল তানভীর মাহমুদ পাশা।