'বয়স যখন ষাট': ফেসঅ্যাপের আগে শিল্পীর কল্পনায় বাংলাদেশের নামকরা তারকাদের বার্ধক্যের ছবি
ছবির উৎস, আনন্দ বিচিত্রা
- Author, মোয়াজ্জেম হোসেন
- Role, বিবিসি বাংলা, লন্ডন
উপরের ছবিতে যাকে দেখছেন, বলুন তো তিনি কে?
চিনতে অসুবিধা হচ্ছে? কয়েকটা ক্লু দেয়া যাক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক সময়ের সবচেয়ে নামকরা তারকা তিনি।
এটি তার ষাট বছর বয়সের কাল্পনিক ছবি। যখন ছবিটি আঁকা হয়েছিল, তখন তার বয়স ষাট হতে অনেক দেরি।
যে শিল্পী এই ছবিটা একেঁছেন, তিনি এই তারকাকে বার্ধক্যে এভাবেই কল্পনা করেছেন।
এবার নিচের ছবিটির দিকে তাকান। এখন নিশ্চয়ই আর অসুবিধা হচ্ছে না চিনতে।
ছবির উৎস, .
হ্যাঁ, এটি বাংলাদেশের প্রয়াত চিত্রতারকা রাজ্জাকের ছবি। বার্ধক্যে শিল্পীর কল্পনায় আঁকা ছবির মতো হয়তো দেখাচ্ছে না তাকে। কিন্তু একেবারে কোন মিলই কি নেই?
ফেসঅ্যাপের কল্যাণে এখন বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ এই মজার খেলাটা খেলছেন। নিজের ছবি আপলোড করে দেখতে চাইছেন, বার্ধক্যে তাকে কেমন দেখা যাবে। আর এই অ্যাপটি নিয়ে শুরু হয়েছে নানা বিতর্ক।
কিন্তু বাংলাদেশের একজন শিল্পী তার তুলির আঁচড়ে এরকমই এক মজার নিরীক্ষা শুরু করেছিলেন আজ থেকে তিন দশক আগে। আর তখন সেটি নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি।
স্যাটেলাইট টেলিভিশনের আগ্রাসন তখনো শুরু হয়নি। ইন্টারনেট আর মোবাইল ফোন আরও বহু দূরের ব্যাপার। মূদ্রিত সংবাদপত্র আর সাময়িকীগুলোর স্বর্ণযুগ সেটি। সেরকম একটি সময়ে ঢাকার শো-বিজ জগতে নানা অম্ল-মধুর প্রতিক্রিয়া তৈরি হলো এই শিল্পীর আঁকা ছবি নিয়ে।
ছবির উৎস, মাসুক হেলাল
বয়স যখন ষাট
ঢাকায় তখন সবচেয়ে বেশি কাটতির এক সিনে ম্যাগাজিন 'আনন্দ বিচিত্রা।' তখন সেখানে কাজ করেন শিল্পী মাসুক হেলাল। আশির দশকের শেষের দিকে তিনি আনন্দ বিচিত্রায় তারকাদের ষাট বছর বয়সের কাল্পনিক ছবি আঁকা শুরু করলেন। এই আইডিয়াটা কিভাবে মাথায় এসেছিল, বলছিলেন তিনি।
"শাহাদাত চৌধুরী তখন বিচিত্রা আর আনন্দ বিচিত্রার সম্পাদক। বিচিত্রায় আমার একটি রম্য লেখা বেরিয়েছিল 'ছাগল সমাচার' বলে। সেটি দেখে তিনি বললেন, আনন্দ বিচিত্রার প্রতি সংখ্যায় মজার কিছু দেয়া যায় কীনা। সেখান থেকেই এর শুরু।
"আমি ভারতীয় সিনে-ম্যাগাজিন স্টারডাস্টে নায়ক গোবিন্দের এরকম কিছু ছবি দেখেছিলাম যেখানে তার মাথা কামিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি প্রস্তাব দিলাম, এরকম কিছু করা যেতে পারে যেখানে তরুণ তারকাদের বুড়ো বয়সের কাল্পনিক ছবি আঁকবো আমি। "
শাহাদাত চৌধুরী বিষয়টা লুফে নিলেন। "বললেন, কাকে দিয়ে শুরু করবে?"
"তখন শাহাদাত ভাই নিজেই আবার প্রস্তাব করলেন ববিতাকে নিয়ে করো। ববিতা ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। উনি বললেন, তাহলে ববিতাকে দিয়ে শুরু করা যাক।"
ছবির উৎস, Bernard Weil
ববিতা তখন ঢাকার সিনেমা জগতে খ্যাতির মধ্যগগনে, নামী-দামী তারকা। 'বয়স যখন ষাটে'র প্রথম ভিক্টিম হলেন তিনি। তার বুড়ো বয়সের কাল্পনিক ছবি আঁকলেন মাসুক হেলাল।
শুরুর দিকে কেবল মাসুক হেলালের আঁকা ছবির সঙ্গে যেত তারই একটা লেখা। কিছুদিন পর এর সঙ্গে যুক্ত হলো তারকাদের কাল্পনিক সাক্ষাৎকার। এটির ভার পড়েছিল সাংবাদিক মাহমুদা চৌধুরীর ওপর।
মাহমুদা চৌধুরী তখন বাংলাদেশের সুপরিচিত চলচ্চিত্র সমালোচকদের একজন। মাসুক হেলালের আঁকা ছবি আর লেখা, সেই সঙ্গে মাহমুদা চৌধুরীর নেয়া কাল্পনিক সাক্ষাৎকার। পাঠক মহলে বেশ সাড়া ফেললো তারকাদের নিয়ে এই রঙ্গ-ব্যঙ্গ।
ববিতাকে নিয়ে লেখা কাল্পনিক সাক্ষাৎকারটি মনে করতে পারেন মাহমুদা চৌধুরী।
"আমি জানতাম যে মাথায় চুল কমে যাওয়ার কারণে ববিতা পরচুলা ব্যবহার করেন। সিনেমায় যখন তিনি শার্টপ্যান্ট পড়ে অভিনয় করতেন, তখন তার থাকতো বব ছাঁট চুল। আবার যখন শাড়ি পরতেন, তখন থাকতো কোমর ছাপানো চুল। আমি দেখিয়েছিলাম ববিতা ষাট বছর বয়সেও সিনেমায় দাপটের সঙ্গে অভিনয় করছেন। তার হাঁটুর বয়সী নায়কদের বিপরীতে নায়িকার রোল করছেন। "
ছবির উৎস, মাসুক হেলাল
লেখাটি পড়ে ববিতার মোটেই খুশি হননি, হওয়ার কথা নয়, বুঝতে পারেন মাহমুদা চৌধুরী।
ক্ষিপ্ত তারকারা
কিন্তু কেউ কেউ এই রঙ্গ-ব্যঙ্গ সহ্য করতে না পেরে চরম প্রতিক্রিয়াও দেখিয়েছিলেন। একজন তো ক্ষেপে গিয়ে রীতিমত হুমকি দিয়ে বসেছিলেন, দেখে নেবেন বলে।
চিত্রতারকা সোহেল রানাকে নিয়ে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলেন মাহমুদা চৌধুরী।
"সোহেল রানাকে নিয়ে যে কাল্পনিক সাক্ষাৎকার, সেখানে আমি এরকম একটি কাহিনী ফেঁদেছিলাম। মাথায় চুল গজানোর জন্য সোহেল রানা মলম লাগিয়েছেন, কিন্তু তাঁর সারা শরীরের লোম গজিয়ে গেছে। নিজের পরিবারের লোকজনও তাকে চিনতে পারছে না। তিনি পালিয়ে গেছেন সুন্দরবনে।"
ছবির উৎস, মাসুক হেলাল
মাহমদুা চৌধুরী জানান, এরপর সোহেল রানার দিক থেকে অনেক হুমকি পেয়েছিলেন তারা।
সোহেল রানার পর্ব নিয়ে একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল শিল্পী মাসুক হেলালের।
"তখন সিনেমায় যেসব লোকজন এক্স্ট্রা হিসেবে ফাইটার চরিত্রে অভিনয় করতো, তারা দলবেঁধে আমাদের খোঁজে ঘোরাঘুরি করছিল। আমাদের সাবধানে চলাফেরা করতে হচ্ছিল।"
মাহমুদা চৌধুরী বলেন, আশির দশকের পুরোটা ঢাকার সিনেমায় নতুন কোন নায়ক-নায়িকা আসছিলো না বা তৈরি হচ্ছিল না। পুরোটাই ছিল পুরোনোদের দখলে। অথচ তাদের বয়স হয়েছে। তাই ইচ্ছে করেই এই বিষয়টা নিয়ে ব্যঙ্গ করতে ছাড়তেন না তিনি।
ছবির উৎস, .
"আমি কেন এটা করেছি? কারণ এদের সবার এত বয়স হয়ে গেছে, তবু কেউ নতুনদের জন্য জায়গা ছাড়ছিলেন না। মধ্যবয়স পেরিয়ে যাওয়া এই তারকারাই তখনো ঢাকাই ছবিতে মূল নায়ক বা নায়িকার ভূমিকা করে যাচ্ছেন।"
"প্রোডাকশান হাউসগুলোও ছিল এদেরই নিয়ন্ত্রণে। নিজেদের প্রোডাকশন হাউস থেকে ছবি করে তারা নিজেরাই নায়ক হতেন, নিজেরাই নায়িকা। এটা নিয়ে আমার ক্ষোভ ছিল। তাই বয়স যখন ষাট সিরিজের লেখায় আমি এটা নিয়ে খোঁচা দেয়ার চেষ্টা করতাম।"
তবে সবাই যে এই রঙ্গ ভালোভাবে নিতেন না তা নয়। অনেক মধুর অভিজ্ঞতাও হয়েছিল মাসুক হেলালের।
ঢাকাই সিনেমায় তখন ভিলেন চরিত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন জসীম। তাঁর স্ত্রী সুচরিতাও জনপ্রিয় তারকা। বয়স যখন ষাটের একটি পর্বে মাসুক হেলাল সুচরিতাকে নিয়ে আঁকলেন। কিন্ত তার আগেই এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে অনেকেই তাঁকে হুঁশিয়ার করে দিলেন।
ছবির উৎস, মাসুক হেলাল
সবাই আমাকে বলছিলেন, সুচরিতাকে নিয়ে কিছু করো না, জসীম ভীষণ ক্ষেপে যাবে। কিছু একটা করে ফেলতে পারে। কিন্তু বাস্তবে আসলে ঘটেছিল একেবারেই ভিন্ন ঘটনা। আনন্দ বিচিত্রায় আমার আঁকা-লেখা দেখে সুচরিতা ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। তিনি আমাকে গিফট পাঠিয়েছিলেন।
মিসির আলী
'বয়স যখন ষাটে' শুধু সিনেমা নয়, ঢাকার টেলিভিশন আর মঞ্চের তারকাদের নিয়েও ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করা হতো।
"আফজাল, সুবর্ণা, হুমায়ুন ফরিদী এরা কেউ বাদ পড়েনি, যদিও এরা সবাই আমার ব্যক্তিগত বন্ধু ছিল," বলছেন মাসুক হেলাল।
ছবির উৎস, মাসুক হেলাল
ঢাকার সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক তখন হুমায়ুন আহমেদ। তিনি বেশ কিছু জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল লিখে সাড়া ফেলে দিয়েছেন।
সেই হুমায়ুন আহমেদকে নিয়েও করা হলো বয়স যখন ষাটের একটি পর্ব। মাসুক হেলাল জানান, হুমায়ুন আহমেদের ছবিটি তিনি এঁকেছিলেন তার সৃষ্ট মিসির আলী চরিত্রের আদলে।
"হুমায়ুন আহমেদ যখন লিখতে বসতেন, তখন তিনি একটা ঘোরের মধ্যে থাকতেন। একবার তার বাসায় আমি রাতে সেটা নিজে প্রত্যক্ষ করেছি। তিনি সেই রাতে লিখেছিলেন মিসির আলী নিয়ে উপন্যাস। তিনি লিখছিলেন সারারাত ধরে। আবার ভূতগ্রস্থের মতো ঘরের মধ্যে পায়চারি করছিলেন।"
ছবির উৎস, মাসুক হেলাল
"পরে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মিসির আলী কে? মিসির আলী দেখতে কেমন? হুমায়ুন আহমেদ বলেছিলেন, আমিই মিসির আলী।"
যাদের ছবি আর কাল্পনিক সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল এই সিরিজে, তাদের বেশিরভাগের বয়স তখন তিরিশ আর চল্লিশের কোঠায়। কিন্তু এরা যখন পরিণত বয়সে পৌঁছালেন, তখন কতটা মিলেছে সেটা শিল্পী আর লেখকের কল্পনার সঙ্গে?
কিছু কিছু বেশ মিলে গেছে, যেমন শাবানার ঘটনা, বলছেন মাহমুদা চৌধুরী।
"শাবানাকে নিয়ে আমি যে কাল্পনিক সাক্ষাৎকার নেই, তাতে আমি দেখিয়েছিলাম বৃদ্ধ বয়সে তিনি বেশ ধার্মিক হয়ে পড়েছেন, সিনেমা ছেড়ে দিয়েছেন, বোরকা পড়ছেন। নিকাবে মুখ ঢাকা। কারণ আমি জানতাম, তার স্বামী ছিলেন বেশ কড়া টাইপের এবং রক্ষণশীল।"
"কিছুদিন আগে শাবানা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে যখন লাইফটাইম এচিভমেন্ট এওয়ার্ড নিচ্ছেন, তখন দেখলাম, আসলেই শাবানা বোরকা পড়া, তবে মুখ খোলা ছিল।"
ছবির উৎস, দ
মাসুক হেলাল বললেন, এই রঙ্গ যাদের নিয়ে করেছেন, তাদের অনেকে এখন আর বেঁচে নেই। কেউ কেউ ষাট বছর পূর্ণ হওয়ার বহু আগেই মারা গেছেন।
জাফর ইকবালের ছবি এঁকেছিলেন ষাট বছর বয়সের। কিন্তু এটি ছাপা হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মারা যান। তার বয়স তখন মাত্র ৪০।
একই ঘটনা ঘটেছিল সালমান শাহের বেলায়। বলা হয়ে থাকে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন, কিন্তু পরিবার এবং ভক্তদের ধারণা তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
ষাট বছর বয়সে বাস্তবে এরা দেখতে কেমন হতেন, তাদের জীবন কেমন হতো, সেটা জানার সুযোগ আর নেই।
"জনপ্রিয় এই রঙ্গ-ব্যঙ্গ সিরিজে এগুলো আমার দুঃখের স্মৃতি", বললেন মাসুক হেলাল।
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট