কলকাতা ও হলদিয়া বন্দর ব্যবহারে বাংলাদেশকে ভারতের প্রস্তাব

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান, হুগলী নদীর তীরে কলকাতা বন্দর
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

বাংলাদেশের জাহাজ ও নৌযান যাতে ভারতের কলকাতা ও হলদিয়া বন্দর ব্যবহার করে, সে জন্য ঢাকাকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে দিল্লি।

বিবিসি জানতে পেরেছে, বাংলাদেশের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা যখন এ সপ্তাহে দিল্লি সফর করবেন, তখনই এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা হওয়ারও সম্ভাবনা আছে।

কিছুদিন আগেই বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করতে দেওয়ার প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছিল, এখন ভারতের এই সিদ্ধান্তকে তারই পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে অনেকে দেখছেন।

এতে রুগ্ন কলকাতা বন্দরও যেমন লাভবান হতে পারে, পাশাপাশি বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পও উপকৃত হবে বলে পর্যবেক্ষরা বলছেন।

বাংলাদেশের নৌপরিবহন মন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকারি একটি প্রতিনিধিদল মঙ্গলবার দিল্লিতে এসে পৌঁছবেন বলে কথা রয়েছে - যে সফরে সচিব ও মন্ত্রী পর্যায়ে দুদেশের মধ্যে জাহাজ চলাচল বিষয়ক নানা আলোচনা নির্ধারিত আছে।

ছবির উৎস, Hindustan Times

ছবির ক্যাপশান, ভারতের জাহাজ পরিবহন মন্ত্রী নিতিন গডকরি

কলকাতা-হলদিয়া পোর্ট ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরেই চাইছে বাংলাদেশী নৌযান তাদের জোড়া বন্দর ব্যবহার করুক - এখন এই সফরে সেই প্রস্তাবই চূড়ান্ত রূপ পেতে চলেছে।

দিল্লিতে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও কানেক্টিভিটি-র বিশেষজ্ঞ প্রবীর দে মনে করছেন বিশেষত বাংলাদেশের গার্মেট শিল্প মালিকরা এই প্রস্তাব লুফে নেবেন, কারণ চট্টগ্রামের তুলনায় হলদিয়া থেকে তাদের রফতানি সহজ ও দ্রুত হবে।

তার কথায়, "তৈরি পোশাক শিল্পের রফতানির জন্য বন্দরে স্পেশালাইজড কিছু সার্ভিস লাগে। তাদের রফতানির ডেডলাইন মিট করার জন্য বন্দরের টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম খুব কম হতে হয়।"

"কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে সত্যি বলতে গেলে সেই পরিস্থিতি নেই। কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিং না-করলে বড় জাহাজ সেখানে ভিড়তে পারে না। তখন ছোট জাহাজে মালপত্র তুলে কলম্বো বা সিঙ্গাপুর থেকে সেটা ট্রান্সশিপমেন্ট করতে হয়", বলছিলেন তিনি।

আর ঠিক সেই কারণেই হলদিয়া-কলকাতা বন্দরের একটা আলাদা আবেদন থাকবে বাংলাদেশের কাছে, কারণ ভারতের শুল্ক বিভাগ অনেক আগেই হলদিয়াকে ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্ট হিসেবে ব্যবহারে বাংলাদেশকে ছাড়পত্র দিয়ে রেখেছে।

ছবির উৎস, Majority World

ছবির ক্যাপশান, কাজ চলছে চট্টগ্রাম বন্দরের ডকইয়ার্ডে

তা ছাড়া ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্প্রতি যে কোস্টাল শিপিং বা উপকূলীয় জাহাজ চলাচল বিষয়ক চুক্তি সই হয়েছে, তাতে দুই দেশের পরস্পরের বন্দর ব্যবহারের ছবিটাই আলাদা মাত্রা পেয়ে গেছে বলে জানাচ্ছেন ড: দে।

"এই চুক্তিটা দুদেশের জন্যই উপযোগী হতে পারে- কারণ এতে দুই দেশের লোডিং-আনলোডিং পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে, একটা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্র্যাকটিসও (এসওপি) তৈরি করা হয়েছে।"

"সব চেয়ে বড় কথা, আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোর ডোমেস্টিক কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের ওপর যে বিধিনিষেধ আছে - যেটাকে ক্যাবোটেজ বলে - সেটাও এই চুক্তিতে অনেক শিথিল করা হয়েছে।"

"তার ফলে বিদেশী পতাকাবাহী কোনও জাহাজও এখন অনায়াসে চট্টগ্রামে গিয়ে মাল ওঠানামা করিয়ে, মংলা হয়ে আবার হলদিয়া বা কলকাতা-ভাইজাগে এসেও মাল তুলতে বা খালাস করতে পারবে। সে কারণেই এখন দুদেশের মধ্যে কার্গো পরিবহনের পুরো ডায়নামিক্সটাই বদলে গেছে" বলছিলেন প্রবীর দে।

ক্যাবোটেজ আইন শিথিল হওয়া ছাড়াও নৌপথ ব্যবহারের আর একটা বড় আকর্ষণ এর তুলনামূলক কম খরচ - জানাচ্ছেন দিল্লির থিঙ্কট্যাঙ্ক বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো শ্রীরাধা দত্ত।

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান, হলদিয়া বন্দরে এখনও বড় জাহাজ চালায় হ্যাপাগ লয়েডের মতো আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন

"বিমানে তো সম্ভবই নয়, কিন্তু সড়ক বা রেলপথের সঙ্গেও যদি তুলনা করি তাহলে দেখব দুদেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনে নৌপথটাই সবচেয়ে কম খরচসাপেক্ষ।"

"বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বাণিজ্য গত এক দশকে অনেক বেড়েছে, আগামীতে আরও বাড়বে নিশ্চয় - আর সেখানে কিন্তু কোস্টাল শিপিং-ই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে, সেটা এখনই নিশ্চিন্তে বলা যায়।"

ভারত তার বন্দর ও পারিপার্শ্বিক অবকাঠামোগুলো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনেক অবহেলা দেখিয়েছে, শ্রীরাধা দত্ত সেটাও মানেন।

কিন্তু কলকাতা-হলদিয়া বন্দরেও সমস্যা কম নয়, সম্প্রতি যেমন আর এক প্রতিবেশী দেশ নেপাল সেটা ব্যবহারের সুযোগ পেয়েও সরে গেছে আরও দূরের ভাইজাগ বন্দরে।

প্রবীর দে তার পরেও মনে করেন হলদিয়ার ক্ষমতা আছে বাংলাদেশকে আকৃষ্ট করার।

ছবির উৎস, SOPA Images

ছবির ক্যাপশান, কোস্টাল শিপিং চালু হলে দুই দেশের উপকূল ঘেঁষে চলবে এই ধরনের পণ্যবাহী জাহাজ

"হলদিয়া কিন্তু অনায়াসেই বাংলাদেশের জন্য একটা 'রিএক্সপোর্ট হাব' হয়ে উঠতে পারে - অর্থাৎ হলদিয়াতে মালপত্র এনে বড় জাহাজে তুলে সেগুলো ইউরোপ-আমেরিকায় রফতানি করা যেতে পারে।''

"কারণ নয়-নয় করেও হলদিয়াতে এখনও বড় বড় চার-পাঁচটা ইন্টারন্যাশনাল শিপিং লাইন চালু আছে, যেমন হ্যাপাগ লয়েড, বেঙ্গল টাইগার লাইন, সাফমেরিন বা এবিএল ইত্যাদি। এদের জাহাজে হলদিয়ার পরেই পরবর্তী স্টপ হবে চেন্নাই, কলম্বো বা সিঙ্গাপুর।"

"আর যেহেতু চট্টগ্রাম-মংলার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, পায়রা কিংবা মাতারবাড়ির মতো নতুন বন্দরও কবে তৈরি হবে কেউ জানে না - তাই হলদিয়া বন্দর কিন্তু ভারতে বা আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পাঠাতে বাংলাদেশের জন্য একটা বিকল্প গেটওয়ে হয়ে উঠতেই পারে", বিবিসিকে বলছিলেন প্রবীর দে।