ট্রাম্পের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কেন এত আলোচনা?
ছবির উৎস, EPA
এ আলোচনা নতুন নয়, আগেও হয়েছে : 'ডোনাল্ড ট্রাম্প কি মানসিকভাবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করার উপযুক্ত?'
তবে নিউইয়র্কের সাংবাদিক মাইকেল উলফের বই 'ফায়ার এ্যান্ড ফিউরি' প্রকাশিত হবার পর এ বিতর্ক আবার নতুন করে চাগিয়ে উঠেছে - অগ্নিতে ঘৃতাহুতির মতোই।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিচিত্র কান্ডকারখানা, একগুঁয়ে ব্যক্তিত্ব এবং কথা বলার এমন এক ভঙ্গি যা আগে ওয়াশিংটনে প্রশাসকদের মধ্যে কখনো দেখা যায় নি - এসব গত এক বছরে মার্কিন রাজনীতিকেই বদলে দিয়েছে।
আবার এই একই বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে সমালোচকরা ক্রমশই আরো বেশি বেশি করে প্রশ্ন তুলে চলেছেন - মি. ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হবার উপযুক্ত কিনা। তারা এমনকি এর প্রমাণ হিসেবে তার মানসিক স্বাস্থ্যের কথাও তুলে ধরছেন।
কি বলছে লোকজন?
ছবির উৎস, বিবিসি
মি. উলফ তার বইতে লিখছেন, ৭১ বছর বয়স্ক ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছের লোকেরাই ক্রমশ সচেতন হচ্ছেন যে তার 'মানসিক ক্ষমতা' কমে যাচ্ছে।
তার বইয়ের প্রচারের সময় তিনি দেখেছেন যে মি. ট্রাম্প বার বার একই কথা বলছেন - যা স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিশক্তির অভাবের কারণে বা অন্য কারণে হতে পারে। এটা ডেমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের লক্ষণ হতে পারে - যা বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার তথ্য অনুযায়ী ৬০ বছরের বেশি বয়েসের লোকদের ৫ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে দেখা যায়।
মি. উলফ লিখছেন, সবাই খেয়াল করেছেন যে আগে মি ট্রাম্প মাত্র ৩০ মিনিট সময়ের মধ্যে একই গল্প তিন বার বলতেন, হুবহু একই ভাষায়, একই শব্দে। আর এখন তিনি বলছেন ১০ মিনিটে তিন বার ।
মি ট্রাম্প বলেছেন, মাইকেল উলফের বই অবাস্তব এবং 'মিথ্যায় ভর্তি'। অন্য অনেকেও অবশ্য মি. উলফের এসব বিবরণের উৎস কি তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
মনোবিজ্ঞানীরাও এ নিয়ে কথা বলেছেন
তবে মি. ট্রাম্পের আচরণ নিয়ে এর আগে কয়েকজন মনোবিজ্ঞানীও কথা বলেছেন।
এ নিয়ে কয়েকটি বইও বের হয়েছে - ব্যান্ডি এক্স লি-র 'দি ডেঞ্জারাস কেস অব ডোনাল্ড ট্রাম্প', এ্যালেন ফ্রান্সেসের 'টুয়াইলাইট অব আমেরিকান স্যানিটি', আর কার্ট এ্যান্ডারসনের 'ফ্যান্টাসিল্যান্ড'।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকিয়াট্রির অধ্যাপক ড. লি গত মাসে বলেছেন, মি. ট্রাম্প এক সময় "ভেঙে পড়তে যাচ্ছেন, এবং আমরা এখনই তার লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি।"
ট্রাম্পের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রমাণ কি?
ছবির উৎস, Getty Images
যারা এ নিয়ে কথা বলেছেন তারা কেউই মি. ট্রাম্পের চিকিৎসা করেন নি। কেউ যদি করে থাকেন এবং এ বিষয়ে কোন তথ্য প্রকাশ করেন - তাহলে তা ফেডারেল আইন ভঙ্গের শামিল হবে।
তবে কেউ কেউ বলেছেন, মি. ট্রাম্পের হয়তো নার্সিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার বা এনপিডির লক্ষণ থাকতে পারে।
এর লক্ষণের মধ্যে আছে: বড় বড় কথা বলা, অন্যদের অনুভূতি বোঝার অক্ষমতা, এবং যাদের অন্যদের প্রশংসা-বন্দনা পাওয়া খুবই প্রয়োজন।
এরা মনে করেন যে তারা অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং তাদের প্রতি বিশেষ আচরণ করতে হবে।
তারা অতিরিক্ত প্রশংসা-বন্দনা চান, এবং সমালোচনা বা পরাজয় মেনে নিতে পারেন না।
উলফের বই বেরুনোর পর অনেকে প্রশ্ন করেছেন মি. ট্রাম্পের কগনিটিভ ডেক্লাইন বা বোধশক্তির ক্রমাবনতি হচ্ছে কিনা।
নিউরোলজি বিশেষজ্ঞরা মি. ট্রাম্পের পুরোনো এবং সাম্প্রতিক বক্তৃতার ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করেছেন। তারা বলছেন, মি. ট্রাম্পের কথা বলার ভঙ্গি একেবারেই বদলে গেছে।
তারা বলছেন, আগে তিনি দীর্ঘ ও জটিল বাক্য বলতেন, লম্বা বিশেষণ ব্যবহার করতেন, কিন্তু সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে তিনি কম শব্দে ছোট বাক্য বলছেন, মাঝখানে শব্দ হারিয়ে যাচ্ছে, অসংলগ্ন কথা বলছেন, প্রায়ই সর্বশ্রেষ্ঠ বা 'বেস্ট' বা এরকম আতিশয্যসূচক শব্দ ব্যবহার করছেন।
এটা হয়তো আলঝেইমার্স ডিজিজ বা নিতান্ত বয়সজনিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
যারা প্রেসিডেন্ট বোধশক্তি হ্রাসের কথা গোপন করছেন বলে মনে করেন, তারা কয়েকটি ঘটনার কথা বলছেন যাতে মনে হয় তার দেহের নড়াচড়ার ওপর তার পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
ডিসেম্বর মাসে মি. ট্রাম্প বক্তৃতার সময় দু'হাত দিয়ে গ্লাস তুলে পানি খান - যা ব্যাপক আলোচিত হয়।
অন্য আরেকটি ভাষণে তার কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল - যার কারণ হিসেবে হোয়াইট হাউস গলা শুকিয়ে যাবার কথা বলেছিল। কিন্তু অনেকে বলেন, এটা ছিল আরো গুরুতর কিছুর লক্ষণ।
আগামি সপ্তাহে মি ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হবার পর তার প্রথম ডাক্তারি পরীক্ষা হবে।
ছবির উৎস, Getty Images
এর ফলে কি হতে পারে?
তাত্বিকভাবে বলতে গেলে, মি. ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা এবং দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে অক্ষম হলে তিনি পদচ্যুত হতে পারেন।
মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী অনুযায়ী সে ক্ষেত্রে ভাইস প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেবেন।
তিনি এবং তার মন্ত্রিসভাকে মিলেই এ প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে, কংগ্রেসকে একটা চিঠি দিতে হবে, এবং কংগ্রেসে দু-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এটা অনুমোদিত হতে হবে - ফলে এমন সম্ভাবনা এখনো কম। যদিও অনেকেই এরকম আহ্বান জানাচ্ছেন।
কিন্তু মি ট্রাম্প কি ২০২০ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারবেন?
একজন সাবেক উপদেষ্টা মনে করেন, প্রেসিডেন্ট তার চার বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবেন এমন সম্ভাবনা মাত্র ৩০ শতাংশ।
আগের কোন প্রেসিডেন্টের কি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ছিল?
উত্তর হচ্ছে: হ্যাঁ ছিল।
আব্রাহাম লিংকন বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনে ভুগতেন, অনেক সময়ই তিনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়তেন ।
প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। মাঝে মাঝে তিনি বিভ্রান্তিতে ভুগতেন, কোথায় আছেন তা বুঝতে পারতেন না। প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পাঁচ বছর পরই তার আলঝেইমার্স ডিজিজ ধরা পড়ে।
ট্রাম্পকে নিয়ে এ বিতর্ক কি সঠিক?
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র সহ অনেক রিপাবলিকান নেতা এসব কথা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, প্রেসিডেন্টর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এ বিতর্ক 'পার্টিজান' আক্রমণ।
জেব বুশের মতো দু একজন ডেমোক্রাট নেতা বলেছেন, মি. ট্রাম্পের চিকিৎসা দরকার।
কিন্তু ড. ফ্রান্সেস বলেছেন, কারো আচার-ব্যবহার খারাপ হলেই তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলা যায় না।
বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট