'তুই চলে যা, পেছনে তাকাইলে মাইরা ফালামু': বাংলাদেশে অপহৃত শিক্ষক মোবাশ্বার হাসানকে যেভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়
ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশে বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান বলেছেন, কে বা কারা তাকে অপহরণ করেছিলো এবং শেষ পর্যন্ত কেনো তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এসব বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
তবে তিনি বলেছেন, তাকে ছাড়ার আগে অপহরণকারীদের মধ্যে কিছুদিন ধরে বাগ-বিতণ্ডা চলছিলো। কি নিয়ে এই বাগ-বিতণ্ডা সে বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই। তবে তিনি জানান, তাকে মেরে ফেলা হবে নাকি বাঁচিয়ে রাখা হবে সেটা নিয়ে অপহরণকারীদের মধ্যে কথাবার্তা হতো।
বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে অপহরণকারীরা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষককে প্রায় দেড় মাস লুকিয়ে রাখার পর ঢাকার একটি রাস্তায় ছেড়ে দেয় এবং এর কয়েক ঘণ্টা পরেই তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা জানান।
এসময় মি. হাসানকে খুব ক্লান্ত ও ভীত সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিলো। কথা বলতে বলতে কখনো কখনো তিনি আবেগ-প্রবণ হয়ে পড়েন। কখনো কখনো তাকে কান্না চেপে কথা বলতে দেখা গেছে।
গত ৭ই নভেম্বর কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান।
যেভাবে নিখোঁজ হন
ঢাকার আগারগাও থেকে বাড়িতে ফেরার পথে নিখোঁজ হন মি. হাসান।
তিনি জানান, ইউএনডিপির একটি মিটিং শেষ করে বাড়িতে ফেরার জন্যে তিনি উবার অ্যাপের সাহায্যে একটি গাড়ি ডেকে পাঠিয়েছিলেন। গাড়ির ভেতরে বসেই মোবাইল ফোনে ব্রাইজিং করছিলেন তিনি।
তিনি বলছেন, তার যতোটা মনে আছে. রোকেয়া সরণীর কাছে কয়েকজন তার গাড়িটি থামায়।
ছবির উৎস, The Wire
"তারা বলে যে এটা চোরাই গাড়ি। নামেন। গাড়ি থেকে নামার পর আমি অন্য গাড়ি খুঁজতে থাকি। ওখানে একটা মাইক্রোবাস ছিলো। হঠাৎ করে আমার পেছন দিক থেকে চোখে মলম লাগিয়ে দেয়। তারপর ধাক্কা দিয়ে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে দেয়। মুখের উপর কিছু একটা চেপে ধরলে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।"
যেখানে রাখা হয়েছিলো
ঘুম থেকে উঠার পর মোবাশ্বার হাসানের মনে হয়েছিলো যে তিনি অনেক দিন ধরে ঘুমিয়ে ছিলেন। পরের দিন তিনি দেখতে পান যে তাকে একটি ঘরের ভেতরে বন্দী করে রাখা হয়েছে। তার হাত দুটো পেছন দিক থেকে বাঁধা।
"একটা ময়লা তোষক। জানালা আছে। জানালা বাইরে থেকে সিল করা। ওপাশে আছে আরেকটা ঘর," বলেন তিনি। ওই ঘরেই তিনি কাটিয়েছেন দেড় মাস।
তিনি শুনছিলেন যে চার পাঁচজন ওই ঘরে কথা বলছে। হোটেল থেকে ঠাণ্ডা খাবার এনে তাকে দেওয়া হতো বলেও তিনি জানান।
সাংবাদিকদের সাথে আজ শুক্রবার কথা বলতে গিয়ে তিনি হাসতে হাসতে বলেন, "অনেক দিন পর আজ দিনের আলোতে এসেছি।" কিন্তু তার হাসির পেছনে লুকিয়ে ছিলো অজানা একটা ভয়।
"আসার সময় তাদের অনেক কথাবার্তা শুনতে পেরেছি। টাকা পয়সা নিয়েও তারা কথাবার্তা বলছিলো।"
যেভাবে ছাড়া পেলেন
তিনি জানান, অপহরণকারীরা তাকে বৃহস্পতিবার রাত একটার দিকে এয়ারপোর্ট রোডে নামিয়ে দেয়। তার আগে তাদের মধ্যে কিছু একটা নিয়ে ঝগড়া হয়েছিলো বলেও তিনি জানান।
গামছা দিয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে গাড়ির ভেতরে একজনের কোলের ওপর শুইয়ে রাখা হয়েছিলো বলে তিনি জানান।
'নামিয়ে দেওয়ার পর ওরা বলেছে, তুই চলে যা। পেছনে ফিরে তাকাইলে মাইরা ফালামু।"
ছবির উৎস, Facebook
তিনি জানান, তার কাছে টাকা পয়সা কিছু ছিলো না। তখন তিনি একটি সিএনজি নেন। সিএনজি চালকের ফোন দিয়ে তিনি বাড়িতে তার পিতার সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি তখন তার বাবাকে সিএনজি ভাড়ার জন্যে পাঁচশো টাকা নিয়ে বাড়ির গেটে যাওয়ার জন্যে বলেন। তিনি জানান, অপহরণকারীরা তার কাছে থাকা ২৭,০০০ টাকা নিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, যারা তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো তাদের মধ্যে একটা জিনিস নিয়ে ঝগড়া ছিলো।
"ওরে কি ছাড়বো, না মারবো এনিয়ে তাদের মধ্যে অনেক বাগ-বিতণ্ডা হয়েছে। আমার ধারণা ওদের কেউ একজন নিখোঁজ হয়ে যায় বা কিছু একটা ঘটেছে। কি হয়েছে আমি সেটা জানি না। তবে তারা তখন খুব ভয় পেয়ে যায়," বলেন তিনি।
মোবাশ্বার হাসান জানান, টাকা পয়সার জন্যে ওরা তার পরিবারের বা 'বড়' কোন বন্ধুর সাথেও ফোনে যোগাযোগ করতে বলেছিলো।
তিনি বলেন, "অপহরণ না হলে বোঝা যাবে না বিষয়টা কী রকম। মানুষের জীবনে কিছু রহস্য থাকে। এটা এরকমই একটা কিছু। সমস্যাটা হলো কিছু দেখতে পাইনি।"
মি. হাসান বলেন, এই ঘটনা তার জীবনে একটা সাইক্লোনের মতো।
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট