'পাঁচ থেকে ছয়টি টিকার ঘাটতি' - কী বলছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়?
ছবির উৎস, NurPhoto / Contributor via Getty Images
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে যে তারা আগামী জুলাই-অগাস্টে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশজুড়ে শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এর মধ্যেই রোগ প্রতিরোধকারী আরো ছয়টি টিকার ঘাটতির খবর পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৪০ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়।
শিশুর জন্মের পর থেকে ১৫ মাস বয়স পর্যন্ত ১২টি রোগ প্রতিরোধে নয় ধরনের টিকা দেওয়া হয়।এগুলোর মধ্যেই প্রায় ছয় ধরনের টিকার ঘাটতির খবর পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের কয়েকটি জেলার সিভিল সার্জনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পোলিও, যক্ষা, নিউমোনিয়া, ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, হাম-রুবেলা ও হেপাটাইটিস বি রোগ প্রতিরোধের জন্য যেসব টিকা দেওয়া হয় সেগুলোর সংকট রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যে কর্মসূচি অপারেশনাল প্ল্যান বা ওপির আওতায় টিকা কেনা হতো, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেটি ২০২৫ সালের অগাস্টে বাতিল করে দেওয়া হয়। ফলে টিকা কার্যক্রম সংকটে পরে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সেসময় সেপ্টেম্বরে ইপিআই টিকার ঘাটতি দেখা দিয়েছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির প্রধান মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ টিকার সংকটের কথা স্বীকার করেছেন।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "আমাদের হেডকোয়ার্টারে টিকার যে স্টক সেটা সন্তোষজনক না। এটাতো আমরা অনেক দিন ধরেই বলছি।"
"নয়টি টিকার মধ্যে মনে হয় পাঁচ থেকে ছয়টা টিকার শর্টেজ (ঘাটতি) আছে," জানান তিনি।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ
ছবির উৎস, Karen Kasmauski via Getty Images
কোন কোন টিকার ঘাটতি দেখা দিয়েছে?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
কয়েকটি জেলার সিভিল সার্জনদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হামের টিকা থাকলেও যক্ষা, পোলিও, নিউমোনিয়া, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকারসহ বেশ কয়েকটি রোগের টিকার সংকট রয়েছে।
কুমিল্লার সিভিল সার্জন আলী নূর মোহাম্মদ বশীর আহমেদ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, তার জেলায় যক্ষা ও হামের টিকা থাকলেও পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার ঘাটতি রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে যক্ষার টিকা সাধারণত একমাসের জন্য দেওয়া হয় উল্লেখ করে তিনি জানান, কুমিল্লা জেলায় আপাতত এক মাসের জন্য যক্ষার টিকা রয়েছে।
তিনি জানান, যক্ষা এবং পোলিও টিকা এই মুহূর্তে থাকলেও সরবরাহজনিত কিছুটা সমস্যা রয়েছে।
পাঁচটি রোগ যেমন- ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি জনিত রোগের জন্য দেওয়া হয় পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা।
আর এই জেলায় পেন্টা টিকার ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে মি. আহমেদ বলেন, "এগুলোর সরবরাহ ঘটিত একটু সমস্যা আছে, ওইটার একটু শর্টেজ আছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর) সাথে কথা বলেছি, তারা বলেছেন অবিলম্বে পাঠিয়ে দেবেন। পাঁচটা রোগের টিকা পেন্টার একটু শর্টেজ আছে।"
চাঁদপুরের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ নূর আলম দীন জানিয়েছেন, তার জেলায় হামের টিকার খুব বেশি সংকট কখনো ছিল না।
তিনি দাবি করেন, যেসব টিকা আছে, মাঝে মাঝে সেগুলোর সংকট হয়, খুব বেশি কখনো হয় না। দুই-তিন মাসের মধ্যে ঘাটতি পূরণও হয়ে যায় বলে দাবি করেন তিনি।
তবে এই মুহূর্তে তার জেলার স্টোরে যক্ষার বিসিজি টিকা থাকলেও সিরিঞ্জের স্বল্পতা রয়েছে বলে জানান। বিসিজি সিরিঞ্জের স্বল্পতা থাকলেও টিকা কার্যক্রম চলমান রাখার জন্য এখন অন্য সিরিঞ্জের মাধ্যমে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান চাঁদপুর জেলার এই সিভিল সার্জন।
যক্ষা প্রতিরোধে একটি শিশুর জন্মের পর থেকে ৪২ দিনের মধ্যে এই বিসিজি টিকা দেওয়া হয়।
"আমাদের এখন যা আছে তা দিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ চলতে পারে। এটা শর্টেজ হওয়াটা আসলে উচিত না। এটা তো খারাপ সবসময়। আমার জেলায় হয়তো আরো কিছুদিন থাকবে। শর্ট হওয়ার আগে পেয়ে গেলে তো পেয়ে গেলাম," বলেন ডা. দীন।
তবে, এই জেলায় ওরাল পোলিও টিকার ঘাটতি রয়েছে এবং এক সপ্তাহ আগে সেখানে এটির মজুত শেষ হয়েছে বলে জানান তিনি।
পেন্টা এবং নিউমোনিয়ার টিকার ঘাটতি ছিল, তবে তা এখন মিটে গেছে জানিয়ে ডা. নূর আলম দীন বলেন, "পেন্টা টিকা শর্ট ছিল। তবে এখন আমাদের কাছে যা আছে তা দিয়ে সম্ভবত আমরা এই মাসটা চালাতে পারবো।"
প্রতি মাসেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একবার করে টিকার জন্য চাহিদা পাঠান বলেও তিনি জানান।
এদিকে, ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা মুন্সীগঞ্জে কিছুদিন আগে যক্ষা ও পেন্টার টিকার সংকট থাকলেও এই মুহূর্তে সব রোগের টিকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. কামরুল জমাদ্দার।
"হামের টিকা আমাদের এখানে সাড়ে হাজারের মতো আছে, তা দিয়ে দুই-আড়াই মাস চলবে।আর আমরা চাহিদা দিছি। ওটা হয়তো মাসখানেকের মধ্যেই আমাদের কাছে চলে আসবে," বলেন ডা. জমাদ্দার।
ছবির উৎস, Karen Kasmauski via Getty Images
১৫ দিন আগে যক্ষা, পোলিও এবং পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার ঘাটতি ছিল এই জেলায় উল্লেখ করে তিনি জানান, "আমাদেরও ঘাটতি ছিল, ঢাকা থেকে আনছি আমরা।"
তিনি জানান, টিকা শেষ হওয়ার বেশ কিছুদিন আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদা দেওয়া হয় যাতে টিকা থাকতে থাকতেই আবার চলে আসে।
এদিকে, যশোর জেলায় ১৪ হাজার দুইশ ডোজ হামের টিকা থাকলেও যক্ষা, পেন্টাসহ কয়েকটি রোগের চারটি টিকার সংকট রয়েছে।
এই জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. মাসুদ রানা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "যক্ষার টিকার সংকট আছে, ওইগুলো কেনার প্রক্রিয়ায় আছে তো। এইজন্য কিছুদিন লাগবে। আগামী মাসে বা আগামী সপ্তাহেও পাবো কি না সম্ভাবনা নাই।"
মার্চ মাসের শুরুর দিকে নিউমোনিয়া, পেন্টা, যক্ষার টিকা শেষ হয়েছে উল্লেখ করে সংকটের কথা জানান ডা. রানা।
তিনি জানান, "এই মুহূর্তে তিন-চারটা টিকার শর্টেজ রয়েছে। এটা সারা বাংলাদেশেই একই চিত্র।"
আগামী সপ্তাহে এসব টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিভিল সার্জন কার্যালয়কে জানিয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে, উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রংপুরে মার্চ মাসে হাম সন্দেহে ১২ জন রোগীর স্যাম্পল পরীক্ষা করা হয়েছে, তবে ফলাফল নেতিবাচক আসে। অর্থাৎ এই জেলায় এখনো হামের কোনো রোগী এখনো শনাক্ত হয়নি।
রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমার হামের টিকারও কোনো সংকট নেই। আমার বিসিজি, পেন্টাভ্যালেন্টসহ সব টিকাই আছে, কোনো সংকট নেই।"
ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলায় হামের টিকা থাকলেও ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকারসহ পাঁচ রোগের পেন্টাভ্যালেন্ট এবং যক্ষার টিকার কিছুটা সংকট রয়েছে বলে জানা গেছে।
সিভিল সার্জন ডা. মো. নোমান মিয়া জানান, টিকার কিছু কিছু সংকট বা ঘাটতি রয়েছে।
"যক্ষার কিছু কিছু ক্ষেত্রে শর্টেজ পড়ে। কিন্তু পড়লেও ডিউরেশনের (সময়ের) মধ্যে এটা দিয়ে আমরা তা কাভার করে ফেলি। পেন্টা, বিসিজির টিকা রিজার্ভ থেকে আপাতত দিয়ে দিচ্ছি" বলেন ডা. মিয়া।
তিনি জানান, টিকার সংকট হলে তা মোকাবিলায় উপজেলা থেকে জেলা সদরে এনে রোগীদের রিজার্ভ টিকা থেকে দিয়ে দেওয়া হয়।
ছবির উৎস, Md Ariful Islam via Getty Images
'বিদ্যমান টিকার স্টক দিয়ে কতদিন যাবে বলা মুশকিল'
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির প্রধান মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানিয়েছেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বর্তমানে টিকার যে স্টক রয়েছে সেটা দিয়ে কতদিন যাবে তা বলা মুশকিল।
"জেলা, উপজেলা পর্যায়ে আমরা ডেলিভারি আগে জেলায় দেই। জেলা আবার উপজেলায় দেয়। সেখানে কিছু রয়ে গেছে। সেটা দিয়ে হয়তোবা কতদিন কাভার দেওয়া যাবে সেটা বলাটা মুশকিল" জানান মি. সাজ্জাদ।
তিনি জানান, বিদ্যমান টিকা দিয়ে কতদিন চলবে সেটা নিরূপণের জন্য এরই মধ্যে বিভিন্ন জেলার তথ্য চাওয়া হয়েছে।
মি. সাজ্জাদ বলেন, "আমরা অলরেডি তথ্য চেয়ে পাঠিয়েছি তাদের কাছে। তথ্যগুলা আসছে। আশা করি আজকের দিনের মধ্যে এটা কম্পাইল করতে পারবো।"
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা জানান, টিকার সংকট নিরসনে ৬০৪ কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে। ওই টাকায় কেনা টিকা দিয়ে তিন থেকে চার মাস চাহিদা পূরণ করা যাবে।
"এটা আমরা প্রসেসিং করে আশা করি শিগগিরই এটা মিট আপ করতে পারবো। সব টিকা যেগুলো শর্ট আছে আশা করি এই টাকা দিয়েই কেনা সম্ভব হবে এবং আশা করি তিন থেকে চার মাস অনায়াসে চলে যাবে," বলেন ইপিআই কর্মসূচির প্রধান মি. সাজ্জাদ।
কোন কোন রোগে কী কী টিকা দেওয়া হয়
ইপিআই সহায়িকায় বলা হয়েছে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার আগে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ শিশু ছয়টি রোগে মারা যেত।
১৯৭৯ সালের সাতই এপ্রিল বাংলাদেশে এক বছরের কম বয়সী সকল শিশুদের ছয়টি সংক্রামক রোগের টিকা দেওয়ার মাধ্যমে এই ইপিআই কার্যক্রম শুরু হয়।
নিয়মিত টিকা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশুদের যক্ষা, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, হাম ও ধনুষ্টংকারের মতো রোগে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
পরবর্তীতে ২০০৯ সাল থেকে আটটি সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করে সরকার। এরপরেও বিভিন্ন সময় রোগভেদে টিকার আওতা আরো বাড়ানো হয়েছে।
শূন্য মাস বয়স থেকে ৪৯ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু, কিশোরী ও সন্তান ধারণক্ষম মহিলাদের ক্ষেত্রে একেক ডোজের টিকা দেওয়া হয়।
শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার এবং শিশুর পঙ্গুত্বের হার কমানোই এই সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির উদ্দেশ্য বলে এর সহায়িকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
যক্ষা রোগ প্রতিরোধের জন্য বিসিজি টিকা, পোলিও-মাইলাইটিস রোগের জন্য ওপিভি, পেন্টাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন দেওয়া হয় ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত রোগসমূহের জন্য।
এছাড়া নিউমোক্কাল নিউমোনিয়া রোগ প্রতিরোধে পিসিভি টিকা, হাম ও রুবেলা রোগ প্রতিরোধে এমআর ভ্যাকসিন, হামের পৃথক টিকা এবং ধনুষ্টংকার রোগ প্রতিরোধে টিটি বা টিটেনাস টক্সয়েড টিকা দেওয়া হয়।
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট