সিসিটিভি'র হার্ডড্রাইভ পরিবর্তনের অভিযোগ, কী হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি ক্লোজ সার্কিট টেলিভিশন বা সিসিটিভির ফুটেজ থাকা একটি হার্ডড্রাইভ পরিবর্তনের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
একজন প্রসিকিউটর অভিযোগটি সত্যি বলে জানালেও আরেকজন প্রসিকিউটর বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
এর আগে ট্রাইব্যুনালের সাবেক এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগে ওঠার পর তা নিয়ে এখনো তদন্ত করছে চিফ প্রসিকিউটরের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০ সালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার জন্য এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
দুই হাজার চব্বিশ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এই ট্রাইব্যুনালেই চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার বিচার শুরু হয়। প্রথমে একটি ট্রাইব্যুনালে বিচারিক কার্যক্রম চললেও পরে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
চলতি বছর ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে সরিয়ে দিয়ে আমিনুল ইসলামকে নতুন চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তখন থেকেই কয়েকজন প্রসিকিউটরকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ আর হার্ডড্রাইভ বিতর্ক নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও সম্প্রতি এক বিবৃতিতে প্রসিকিউশনের সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছেন সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
ছবির উৎস, Screen Grab
সিসিটিভি হার্ডড্রাইভ বিতর্ক
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের একজন তানভীর হাসান জোহা গত পহেলা এপ্রিল সাংবাদিকদের হার্ডড্রাইভ পরিবর্তনের কথা জানিয়েছিলেন।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
তিনি তখন বলেছিলেন, "সিসলকগুলোতে যে হার্ডড্রাইভগুলো থাকার কথা ছিল, পুরনো নতুন কিছু হার্ডড্রাইভ সংযোজিত বিয়োজিত হয়েছে। এটা তদন্তাধীন বিষয়। এটা আমরা ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটিকে অবহিত করেছি। ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি থেকে বাকি ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা হবে।"
তানভীর হাসান জোহা আজ সোমবার বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "ট্রাইব্যুনালের সিসিটিভির ফুটেজ যেসব হার্ডড্রাইভে সংরক্ষিত ছিল তার একটিতে পরিবর্তনের ঘটনাটি ঘটেছে"।
জানা গেছে, ট্রাইব্যুনালের সিসিটিভিগুলোর মোট হার্ডড্রাইভের সংখ্যা ছিল তেরটি। এর কোনো কোনোটি খোলা এবং বন্ধ করা হয়েছে। আর একটি খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং সেখানে আরেকটি হার্ডড্রাইভ রাখা হয়েছে।
আবার এই ঘটনাটি আবার প্রকাশ হয়েছে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের সদস্য বি এম সুলতান মাহমুদ গত ২৩শে ফেব্রুয়ারি সামাজিক মাধ্যমে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তোলার পর।
তিনি ওই অভিযোগ যেদিন তুলেছিলেন সেদিনই সরকার চিফ প্রসিকিউটরের পদ থেকে তাজুল ইসলামকে সরিয়ে আমিনুল ইসলামকে নিয়োগ দিয়েছিল।
মি. মাহমুদ অভিযোগ করেছিলেন যে, "গত বছর নভেম্বরের শেষ দিকে আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলার আসামি আফজালের (এসআই শেখ আবজালুল হক, যিনি এ মামলায় রাজসাক্ষী হয়ে আদালতের ক্ষমা পান) বউ সন্ধ্যার দিকে ভারী ব্যাগ নিয়ে তামিমের (গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম) রুমে প্রবেশ করে। বিষয়টি আমরা দেখার পরে সঙ্গে সঙ্গে তাজুল ইসলামের (সাবেক চিফ প্রসিকিউটর) রুমে গিয়ে তাকে জানাই।''
''এই ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, বরং উল্টো আমাদের বকাঝকা করে। তামিম তখন সবার সামনে স্বীকার গিয়েছিল হ্যাঁ আফজালের বউ তার রুমে এসেছিল। চিফ প্রসিকিউটর শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন আসামির বউ কেন তার রুমে গিয়েছিল। শুধু এই জিজ্ঞাসা করা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে সেই আফজালকে রাজসাক্ষী করা হলো। চূড়ান্ত বিচারে তাকে খালাস দেয়া হলো।"
ছবির উৎস, Getty Images
এ ধরনের আরও কিছু অভিযোগ তিনি সামাজিক মাধ্যমে তোলার পর বিষয়টি যাচাই বাছাইয়ের জন্য অনেকেই সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে রেজিস্ট্রারের কক্ষে যাওয়ার পরই হার্ডড্রাইভ পরিবর্তনের তথ্য বের হয়ে আসে।
যদিও সিসিটিভি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা পুলিশের বিশেষ শাখার রেজিস্ট্রারে থাকা তথ্য অনুযায়ী হার্ডড্রাইভটি নষ্ট হওয়ায় গত বছর ১৩ই অক্টোবর পরিবর্তন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ঘটনাটি যাচাই করার জন্য সাইবার বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রসিকিউশনের সদস্য তানভির হাসান জোহাকে নির্দেশ দেন।
মি. জোহা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি এ সম্পর্কিত তথ্য চিফ প্রসিকিউটরকে জানিয়েছেন এবং 'ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি এ নিয়ে কাজ করছে'।
যদিও প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম বিবিসি বাংলাকে বলছেন যে, সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব হওয়ার কোনো ঘটনাই ঘটেনি। এমনকি তার কক্ষে আসামির স্ত্রীর ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রবেশের যে অভিযোগ এসেছে তাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
"এমন কোনো ফুটেজ গায়েব হয়নি। হার্ডড্রাইভ এসবি নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের কাছে থাকা রেকর্ড অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের গার্ডেনের একটিতে ১৪ দিনের রিজার্ভেশন ক্যাপাসিটি ছিল। সেটি পরিবর্তন করে ২১ দিনের রিজার্ভেশন ক্যাপাসিটি করা হয়েছে। এগুলো নিয়ে অভিযোগও কেউ করেনি। কোনো তদন্তও হচ্ছে না। আমার রুমে ভারী ব্যাগ নিয়ে আসার বিষয়েও এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
তানভীর হাসান জোহা অবশ্য বলছেন যে, "হার্ডড্রাইভ রিপ্লেসের (প্রতিস্থাপন বা বদলানো) ঘটনা ঘটেছে"।
এগুলো ছাড়াও আরও কয়েকটি মামলার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ।
ছবির উৎস, BBC/TANVEE
এসব ঘটনার পর ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কার্যক্রম নিয়েই নানা আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ কিছু মামলায় বিশেষ কিছু সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি এক্ষেত্রে আলোচনায় এনেছেন মি. মাহমুদ।
এর মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাবন্দি এক আওয়ামী লীগ নেতাকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য পরিবারের কাছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটরের এক কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগে একটি অডিও রেকর্ড গত দশই মার্চ সংবাদ মাধ্যমে ফাঁস হলে তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সেদিনই এ বিষয়ে একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করেছিল চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়। তবে বিবিসি বাংলা সেই অডিও রেকর্ড যাচাই করতে পারেনি।
যার বিরুদ্ধে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে সেই ব্যক্তি মো. সাইমুম রেজা তালুকদার তার আগেই পদত্যাগ করেছিলেন।
মি. তালুকদার তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, "সরকার আইনি প্রক্রিয়ায় গেলে সেটি ফেইস করবো।"
ঘুষ দাবির এই অভিযোগের বিষয়ে তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের কাছে আসামির পরিবার অভিযোগ করেছিলেন বলে তখন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছিল।
পরে তিনিই প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারকে ওই মামলা থেকে সরিয়ে দেন। তবে কোন তদন্ত হয়নি।
তানভির হাসান জোহা বলছেন, এখন হার্ডড্রাইভ পরিবর্তনের বিষয়টিও ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি তদন্ত করছে। যদিও গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম বলছেন, এমন কোনো বিষয় ওই কমিটি তদন্ত করছে না।
এই বিতর্কের মধ্যে এখন সবার দৃষ্টি হলো তদন্ত কমিটির দিকে। তবে কমিটি কবে নাগাদ রিপোর্ট দিবে বা তদন্তে কী পাওয়া গেলো জানার জন্য চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের সাথে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
প্রধান খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট