যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর গাজায় আবার ইসরায়েলি হামলা শুরু
ছবির উৎস, Getty Images
যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ তুলে গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আবার শুরু করেছে ইসরায়েল। এর অংশ হিসেবে বিস্ফোরণ এবং গুলির শব্দ শোনা গেছে।
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি সাত দিন স্থায়ী হয় এবং এসময় হামাসের হাতে বন্দী ১১০ জন জিম্মিকে মুক্তি দেয়া হয়। একই সাথে ইসরায়েলে বন্দী ২৪০ জন ফিলিস্তিনিকেও মুক্তি দেয়া হয়।
বিবিসি জানতে পেরেছে যে, যুদ্ধ শুরু হলেও মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে কাজ করে যাচ্ছেন।
গত সাতই অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। সে হামলায় ১২০০ জন নিহত হয় এবং আরো ২৪০ জনকে জিম্মি করা হয়।
হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারপর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ১৪,৮০০ মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ছয় হাজার শিশু।
মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন ইসরায়েলকে বলেছেন, তারা যাতে বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণ রক্ষায় 'আরো কার্যকরী পদক্ষেপ' নেয়।
তিন ঘণ্টায় ৩২ জন নিহত
হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাময়িক অস্ত্রবিরতি শেষ হওয়ার পর থেকে প্রথম দুই ঘণ্টায় ১৪ জন নিহত হয়েছে।
টেলিগ্রামে দেয়া এক পোস্টে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ইসরায়েলি বিমান হামলায় আরো কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছে।
পরে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তিন ঘণ্টায় ৩২ জন নিহত হয়েছে।
ছবির উৎস, Getty Images
‘কথা রাখেনি হামাস’
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী বলেছে, হামাসের 'শক্ত ঘাঁটিতে আঘাত করার জন্যই' অভিযান আবারো শুরু হয়েছে।
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পিটার লার্নার বলেন, সংঘাতের শুরু থেকেই আইডিএফ এর উদ্দেশ্য একই রয়েছে- আর তা হচ্ছে সব জিম্মিকে মুক্ত করা এবং 'হামাসকে ধ্বংস' করা।
তারা কোথায় কোথায় হামলা চালাচ্ছে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “অভিযানের স্বার্থে” তিনি এর সরাসরি উত্তর দিতে পারবেন না। তবে তিনি বলেন, আইডিএফ “আইনের মধ্য থেকেই অভিযান পরিচালনা করছে।”
তিনি আরো বলেন, “সব নারী ও শিশুকে মুক্তি দেয়ার বিষয়ে হামাস তাদের কথা রাখেনি, তাদের করা চুক্তি মানেনি।”
বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা
বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদদাতা হুগো বাচেগা জানান, ইসরায়েলি বাহিনী সামরিক অভিযান শুরু করেছে এবং তারা অভিযোগ করেছে যে, হামাস সাময়িক যুদ্ধ বিরতির শর্ত ভঙ্গ করেছে।
অস্ত্রবিরতি শেষ হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে সাইরেন বাজার আওয়াজ শোনা যায়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করে তারা গাজা থেকে ছোড়া একটি রকেটকে প্রতিহত করেছে।
হামাস পরিচালিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বেশ কয়েকটি এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির মধ্যে গাজায় থাকা শতাধিক জিম্মিকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। এরপরও আরো ১৪০ জন জিম্মি আটক রয়েছে।
ওই এলাকায় আবারো যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে মানবিক সংকট আরো বেশি তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ ওই এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে।
ছবির উৎস, Getty Images
'গাজার নতুন মানচিত্র'
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গাজার নতুন মানচিত্র তৈরি করেছে যেখানে এই গাজাকে কয়েকশ এলাকায় ভাগ করা হয়েছে। তারা বলছে, ভবিষ্যতে গাজার বাসিন্দাদের যুদ্ধ এড়াতে এই মানচিত্র তাদের সহায়তা করবে।
বিভিন্ন এলাকাকে নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করে অনলাইনে মানচিত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বলছে, বেসামরিক নাগরিকদের “যুদ্ধের পরিবর্তী ধাপের জন্য” প্রস্তুতে সহায়তা করতে এই মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে।
আইডিএফ বলছে, এই মানচিত্রটি শনাক্ত যোগ্য এলাকায় ভাগ করা হয়েছে যাতে “প্রয়োজন হলে বাসিন্দারা নির্দিষ্ট এলাকা থেকে তাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারে।”
সরে যাওয়ার জন্য লিফলেট বিতরণ
ইসরায়েল সামরিক বাহিনী গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসের বাসিন্দাদের তাদের নিরাপত্তার জন্য আরো দক্ষিণে সরে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে লিফলেট ফেলেছে বলে জানা যাচ্ছে।
লিফলেটের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে যেখানে খান ইউনিসকে একটি “বিপদজনক সামরিক এলাকা” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এতে বলা হয়েছে, শহরের পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দারা যাতে পাশের রাফাহ এলাকায় থাকা আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে সরে যায়। রাফাহ মিশরের সীমান্তের কাছে অবস্থিত।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই একই ধরনের লিফলেট গাজার অন্য এলাকাগুলোতেও দেখা গেছে। আইডিএফ দাবি করছে, “গাজা উপত্যকায় বেসামরিক বাসিন্দাদের ক্ষতি এড়াতেই অনেকগুলো উপায়ের মধ্যে একটি এটি।”
সকাল থেকে আবার যুদ্ধ শুরু
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বিবিসির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জেরেমি বোয়েন যিনি জেরুসালেম থেকে প্রতিবেদন করছেন তিনি বলেন, আজ সকালে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, যুদ্ধ আবার শুরু হয়ে গেছে। কাতারের রাজধানী দোহায় যুদ্ধবিরতি অব্যাহত রাখার জন্য মধ্যস্থতাকারীরা চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মধ্যেই এ যুদ্ধ আবার শুরু হলো।
গাজার দক্ষিণাঞ্চলে বিমান হামলা চলছে এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন খুব পরিষ্কারভাবে জনসমক্ষে ইসরায়েলকে বলেছেন, নিজের প্রতিরক্ষার অধিকার ইসরায়েলের রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাকে সমর্থনও করে যাবে, কিন্তু ইসরায়েলকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনেই তা করতে হবে।
ব্লিঙ্কেনের বার্তা স্পষ্ট- আর তা হচ্ছে, গাজার উত্তরাঞ্চলে যে পরিমাণ মানুষ নিহত হয়েছে নতুন অভিযানে যাতে এতো বেশি পরিমাণ হতাহত না হয় তা ইসরায়েলকে নিশ্চিত করতে হবে। তিনি এ বিষয়ে খুব সুনির্দিষ্টভাবেই বলেছেন যে, মানুষের যাওয়ার জন্য নিরাপদ অঞ্চল নির্ধারণ করতে হবে তাদের।
কিন্তু বিভিন্ন সংঘাতের সময় এ ধরনের “নিরাপদ অঞ্চল” নিয়ে অভিজ্ঞতা মোটেই ভালো নয়। অনেকেই বসনিয়া, সাবেক যুগোস্লাভিয়ার যুদ্ধের সময় “নিরাপদ অঞ্চলের” কথা স্মরণ করতে পারবেন যেগুলো আসলে মোটেই নিরাপদ ছিল না।
ছবির উৎস, Getty Images
ইসরায়েল লক্ষ্য অর্জনে অটল
অস্ত্রবিরতির শেষ ঘণ্টায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, হামাস আরো জিম্মিকে মুক্তি দিতে রাজি হয়নি। এটা যুদ্ধবিরতির শর্তের লঙ্ঘন।
নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে জানানো হয়, শর্ত অনুযায়ী, হামাস সব নারী জিম্মিকে মুক্তি দেয়নি এবং আজ সকালে তারা ইসরায়েলে রকেট হামলা চালিয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ইসরায়েল তাদের লক্ষ্য অর্জনের বিষয়ে অটল থাকবে। আর তা হচ্ছে সব জিম্মির মুক্তি, হামাসকে নিশ্চিহ্ন করা এবং “গাজা যাতে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের কোনও বাসিন্দার জন্য হুমকি হতে না পারে” তা নিশ্চিত করা।
যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর গাজার চিত্র
গাজায় ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর সেখানকার কিছু ছবি বিবিসির হাতে এসেছে।
সাতদিনের সাময়িক অস্ত্রবিরতি শেষ হয়েছে। কিন্তু গাজায় থাকা বিবিসির সাংবাদিক রুশদি আবু আলুফ এর আগে জানান, ফিলিস্তিনি এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ছবির উৎস, Getty Images
ছবির উৎস, Getty Images
ছবির উৎস, Getty Images
ছবির উৎস, Getty Images
প্রধান খবর
নির্বাচিত খবর
পাঠকপ্রিয় খবর
ছবির কপিরাইট