রিজার্ভ কমে যাওয়ার যে ব্যাখ্যা দিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া নিয়ে অব্যাহত আলোচনা এবং উদ্বেগের মধ্যে এর একটি ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মানুষের কল্যাণে এবং তাদের ভালোমন্দের জন্য রিজার্ভের টাকা খরচ হয়েছে।

সোমবার একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি রিজার্ভ খরচের বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন।

বাংলাদেশে গত বছরের অগাস্ট মাস নাগাদ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়নের কাছাকাছি থাকলেও এখন সেটি ২৬ বিলিয়নে এসে ঠেকেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও খাদ্য পণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় কমেছে। ফলে বাংলাদেশের সার্বিক বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়ছে - যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৭.৫৫ বিলিয়ন ডলারে। এমন প্রেক্ষাপটে রিজার্ভ নিয়ে শঙ্কা দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তাদের হিসাবের মোট গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ৩৪.৩ বিলিয়ন ডলার। সেখান থেকে বিভিন্ন তহবিলে বিনিয়োগ করা এবং ঋণ হিসাবে দেয়া আট বিলিয়ন ডলার বাদ দিলে নেট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬.৩ বিলিয়ন ডলার।

কী বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা?

বিরোধী বিএনপি অভিযোগ করেছে, সরকার খুব কঠিন অবস্থায় পড়েছে। তারা রিজার্ভের টাকার হিসাব দিতে পারছে না।

সেই সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘’আমি জানি বর্তমানে হঠাৎ একটা কথা এসেছে। রিজার্ভ, রিজার্ভ, রিজার্ভে নাই, রিজার্ভের টাকা সব নাকি চুরি হয়ে গেছে। চুরিটা হয় কীভাবে?’’

‘’আমি ৯৬ সালে যখন সরকার গঠন করি। তার আগে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। তখন কত টাকা রিজার্ভ ছিল? দুই দশমিক নয় বিলিয়ন ইউএস ডলার। সেটাকে বাড়িয়ে আমরা তিন-চারে (বিলিয়ন) নিয়ে আসি। আর ২০০৯-এ আমরা যখন সরকার গঠন করি, তখন রিজার্ভ ছিল প্রায় পাঁচ বিলিয়ন। সেই জায়গা থেকে আমরা এই রিজার্ভ প্রায় ৪৮ বিলিয়নে ওঠাতে পেরেছি।‘’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘’সেটা পেরেছিলাম এই কারণে যে, রিজার্ভের টাকা তো সবসময় খরচ হতে থাকে, রোলিং করে। কারণ করোনাভাইরাসের সময় যোগাযোগ বন্ধ, আমদানি রপ্তানি বন্ধ, কেউ যেতেও পারেনা, আসতেও পারে না। কোন আমদানি হয়নি। এই কারণেই কিন্তু রিজার্ভ জমা হয়।‘’

‘রিজার্ভ খরচ হয়েছে দেশের মানুষের কল্যাণে’

রিজার্ভ খরচের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘’যখন করোনা শেষ হয়ে যায়, আমাদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে, ইন্ডাস্ট্রি তৈরির ক্ষেত্রে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে, এমনকি চাষবাসের জন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনে নিয়ে আসা, সেগুলোর জন্য আমাদের ডলার খরচ করতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা যে ভ্যাকসিন কিনেছি, ভ্যাকসিন যখন রিসার্চ হচ্ছে, তখনি আমি ১২০০ কোটি টাকা জমা দিয়ে দিয়েছি যাতে যেটাই সফল হয়, আমি আগে নেবো। আমার দেশের মানুষকে বাঁচাবো।‘’

‘’শুধু ভ্যাকসিন নিলেই তো হয় না। ভ্যাকসিন দিতে সিরিঞ্জ লাগে, অনেক কিছুই লাগে। প্রয়োজনে প্লেন পাঠিয়ে পাঠিয়ে বিদেশ থেকে আমি জিনিসপত্র আনিয়েছি। তাতে টাকা খরচ হয়নি? টাকা তো খরচ করতে হয়েছে।  এই টাকা ব্যবহার করেছি মানুষের কল্যাণে।‘’  

শেখ হাসিনা বলছেন, ‘’করোনা যেতে পারেনি, শুরু হলো ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। তারপরে স্যাংশন। প্রত্যেকটা জিনিসের দাম সারা বিশ্বে বেড়ে গেছে। আপনি চাল বলেন, গম বলেন, ভোজ্য তেল, জ্বালানি তেল, গ্যাস - সব কিছু এমনভাবে বেড়ে গেছে - শুধু  জিনিসের দাম যে আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে গেছে তা নয়, তার সঙ্গে পরিবহন খরচও বেড়েছে।‘’

‘’২০০ ডলারে যে গম কিনতাম, সেটা ৫০০ ডলারে কিনতে হয়। কিন্তু আমরা তো দেশের মানুষকে কষ্ট দিতে পারিনা। সেই কারণে যতো দামই লাগুক, আমরা কিন্তু কিনে নিয়ে আসছি, মানুষকে দিচ্ছি। এক কোটি মানুষকে আমরা টিসিবির কার্ডের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে খাবার সরবরাহ করছি।‘’ 

রিজার্ভের ডলার বিনিয়োগ খাতে

রিজার্ভ থেকে কয়েকটি খাতে আট বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে এর আগে বাংলাদেশে ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।

সেই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন, ‘’সেই সাথে আমরা আট বিলিয়ন ডলার আলাদাভাবে বিনিয়োগ করেছি। আমাদের বিমানের সব ঝরঝরে অবস্থা ছিল। সব থেকে আধুনিক বিমান আমরা ক্রয় করেছি কয়েকটা। এখানে আমরা আমাদের টাকা, রিজার্ভের টাকা দিয়েই করেছি। অন্যের কাছ থেকে টাকা ধার নেইনি। সেখানে টাকা নিলেও সুদসহ শোধ দিতে হতো। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে নিয়ে, এখন বিমান টাকা শোধ দিচ্ছে, দুই পার্সেন্ট ইন্টারেস্টসহ আমরা টাকা ফেরত পাচ্ছি।‘’

‘’এভাবে আমাদের রপ্তানি, সেখানে আমরা প্রণোদনা দিচ্ছি, সেখানেও আমাদের লোকই লাভবান হচ্ছে। এই ভাবে আট বিলিয়ন আমরা খরচ করেছি,’’ তিনি বলছেন।

শেখ হাসিনা বলছেন, ‘’এখন যেমন অতি বেশি মূল্য দিয়ে আমাকে খাদ্য কিনতে হচ্ছে, তেল কিনতে হচ্ছে, গ্যাস কিনতে হচ্ছে, ভোজ্য তেল কিনতে হচ্ছে, জ্বালানি তেল কিনতে হচ্ছে, গম ভুট্টা-সবই আনতে হচ্ছে। এখানে আমি টাকা নিয়ে বসে থাকলে তো হবে না। আমার দেশের মানুষের জন্য খরচ করতে হবে।‘’ 

এর আগে শনিবার একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘’যখন যোগাযোগটা খুলে গেছে, তখন আমাদের আমদানি করা- বিশেষ করে সারা বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে যে অর্থনীতি, যে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে, এবং যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে, তার আঘাতটা তো আমাদের দেশে এসে পড়েছে।‘’

তিনি বলেন, ‘’আমাদের রিজার্ভের টাকা দিয়ে আমরা বিমান ক্রয় করেছি। নদী ড্রেজিং, সেটাও আমরা রিজার্ভের টাকা দিয়ে করছি। কিছু কিছু বিনিয়োগ করছি এই কারণে, আমরা যদি অন্য দেশের এক্সিম ব্যাংক থেকে ঋণ নেই, আমাদের সুদসহ সেটা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু আমাদের ডলার আমরা দেই, খরচা করি, তাহলে সুদসহ টাকাটা দেশেই থেকে যায়। সেটা লক্ষ্য করে  আট বিলিয়নের মতো আমরা খরচা করেছি।‘’

‘’এখান থেকে আমরা কিছু ডলার - আপনারা জানেন, যখন শ্রীলঙ্কা খুব অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়ে, তাদেরকেও কিছু টাকা আমরা ধার দিয়েছি। এখানে কিন্তু কোন পয়সা কেউ তুলে নিয়ে যায়নি।‘’

আগামী বছর এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছে সরকার। পরিস্থিতি সামলাতে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, বিদেশে দক্ষ শ্রমিক পাঠানো, রেমিট্যান্স বাড়ানো,  বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, খাদ্য মজুদ করা ও শুল্ক-কর সহজ করার মতো পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সোমবারই এই তথ্য জানানো হয়েছে।

বিরোধীরা যা বলছে

এর আগে অক্টোবর মাসের শেষের দিকে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, রিজার্ভের টাকা কেউ চিবিয়ে খায়নি, মানুষের কাজে লাগছে।

‘’অনেকে প্রশ্ন করেন, রিজার্ভের টাকা গেলো কোথায়? তাদেরকে বলছি, রিজার্ভের টাকা গিয়েছে পায়রাবন্দরে, রিজার্ভের টাকা দিয়েছে খাদ্য কেনায়, সারে ও মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর জন্য। এটা কেউ চিবিয়ে খায়নি, মানুষের কাজে লাগছে। এ ছাড়াও আমদানিতে কাজে লাগানো হচ্ছে।‘’

রিজার্ভের থেকে বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে, সেখান থেকে পায়রা বন্দর প্রকল্পে অর্থায়ন করা হয়েছে।

যদিও সেটির সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘’পায়রা বন্দরে খরচ করার জন্য তো রিজার্ভের টাকা না। রিজার্ভের টাকা হচ্ছে যখন বাইরে থেকে পণ্য আমদানি করবেন, সেই টাকা ডলারে পরিশোধ করবেন। রিজার্ভের টাকা হচ্ছে দেশে যখন অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেবে, তখন সেই সংকটে দেখবেন।‘’

অর্থনীতিবিদরা যা বলছেন

রিজার্ভ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা ব্যবহারযোগ্য ২৬ বিলিয়ন নেট রিজার্ভের সঙ্গে বিভিন্ন তহবিলে এবং ঋণ হিসাবে দেয়া অংশ যোগ করলে মোট ৩৪ বিলিয়ন হবে।

কিন্তু যেভাবে এক বছরের মধ্যে  ৪৮ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ থেকে কমতে কমতে সেটা এখন গ্রস ধরলে ৩৪ বিলিয়ন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে, সেটা হচ্ছে সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয়।

রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স আয় কমে যাওয়ায় বর্তমানে যে বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেটি আরও বড় হচ্ছে। ঘাটতি পূরণে প্রতিমাসেই বাংলাদেশের রিজার্ভ থেকে ৮৩৩ মিলিয়ন ডলার কমে যাচ্ছে।  এই প্রবণতা চিন্তায় ফেলেছে অর্থনীতিবিদদের।

এই ঘাটতি মেটাতেই আইএমএফ থেকে ঋণ নিচ্ছে বাংলাদেশের সরকার। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যালেন্স অব পেমেন্টের যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পূরণে এই ঋণ যথেষ্ট নয়।

রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স, বিদেশি বিনিয়োগ, বিভিন্ন দেশ বা সংস্থা থেকে পাওয়া ঋণ- এভাবে পাওয়া ডলার নিয়ে রিজার্ভ তৈরি হয়। আবার আমদানি, ঋণের সুদ বা কিস্তি দেয়া, বিদেশি কর্মীদের বেতন-ভাতা বাবদ, পর্যটক বা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ইত্যাদি খাতে আবার বিদেশি মুদ্রা চলে যায়।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, এর বাইরে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেখতে পায় যে, আমাদের হাতে বিদেশি মুদ্রা পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে, তখন তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, বিদেশ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ না নিয়ে রিজার্ভ থেকে অর্থ নিয়ে ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু তাদের হিসাব রাখতে হবে যে, হঠাৎ করে যদি কোন সংকট তৈরি হয়, তাহলে এই অর্থ দ্রুত ফেরত পাওয়া যাবে কিনা।

‘’কারণ রপ্তানিমুখী বিনিয়োগ হলে হয়তো সেটা বৈদেশিক মুদ্রা আনতে কাজে লাগবে। কিন্তু অন্য ধরনের বিনিয়োগ ভালো বিনিয়োগ হতে পারে, কিন্তু সেটা দীর্ঘমেয়াদি হলে ফেরত পেতে সময় লাগবে। দ্বিতীয় হলো, দেশীয় বিনিয়োগ থেকে যে আয় আসবে, সেটা কিন্তু ডলারে নয়, বরং টাকায় আসবে,‘’ বলছেন ড. রহমান।

তিনি বলছেন, যখন এসব বিনিয়োগ করা হয়েছে, তখন রিজার্ভের প্রকৃত চিত্রটা হয়তো পরিষ্কার করা হয়নি। কারণ নেট রিজার্ভ কতো, সেই তথ্য সামনে থাকলে হয়তো রিজার্ভ ব্যবহারে আরও সতর্ক হওয়া যেতো এবং আরও একটু বাস্তববাদী ব্যবহার করা যেতো।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, ‘’এটা যে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যই এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, সেটাতে দ্বিমত নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, বিনিয়োগের আয়টা আসবে ধীরে ধীরে, কিন্তু টাকাটা একবারে চলে গেছে। ফলে যখন সেটা হঠাৎ করে দরকার হয়ে পড়লে পাওয়ার উপায় নেই।‘’