আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
গায়ক রূপম ইসলামকে কি হিন্দুত্ববাদীরা বয়কটের ডাক দিচ্ছে?
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
সঙ্গীতশিল্পী রূপম ইসলাম তার অনুষ্ঠানে জেলবন্দী ছাত্র নেতা উমর খালিদের ন্যায়বিচার দাবি করায় তাকে বয়কটের ডাক দিয়ে হ্যাশট্যাগ চলছে সামাজিক মাধ্যমে। তিনি একজন 'দেশদ্রোহী'কে সমর্থন করছেন এবং 'লাভ জিহাদ' চালাচ্ছেন বলেও সামাজিক মাধ্যমে কটাক্ষ করছেন কেউ কেউ।
রূপম ইসলামের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উমর খালিদের মতো আরও অনেকে যারা বন্দী হয়ে আছেন, তাদের জন্য শুধুই 'ন্যায়বিচার'এর দাবি তুলেছিলেন গায়ক।
সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ এবং এনআরসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠা ছাত্র নেতা উমর খালিদ ১০০০ দিন ধরে জেলে আটক রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দিল্লি দাঙ্গায় জড়িত থাকারও অভিযোগ রয়েছে।
তার বিরুদ্ধে অনেকগুলি মামলা দেয়া হয়েছে, যার কয়েকটিতে তিনি জামিন পেলেও বাকিগুলিতে জামিন পান নি, তাই প্রায় তিন বছর ধরে তিনি দিল্লি তিহার জেলেই আটক রয়েছেন।
উমর খালিদকে হিন্দুত্ববাদীরা একজন ‘দেশদ্রোহী’ এবং তথাকথিত ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’য়ের সদস্য বলে অভিহিত করে থাকেন। সেরকম একজনের হয়ে কেন রূপম ইসলাম মুখ খুলবেন, এই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে।
রূপম ইসলাম অবশ্য সিএএ এবং এনআরসির বিরুদ্ধে আগেও মুখ খুলেছেন। সারা ভারত জুড়ে যখন এনআরসি-সিএএ-র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে, সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের আরও অনেক শিল্পীর সঙ্গেই রূপম ইসলামও গলা মিলিয়ে পাঠ করেছিলেন বরুণ গ্রোভারের জনপ্রিয় হয়ে যাওয়া কবিতা ‘কাগজ আমরা দেখাব না’।
সেই প্রসঙ্গও টেনে আনা হচ্ছে মি. ইসলামের সাম্প্রতিক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
অনুষ্ঠানে কী বলেন রূপম ইসলাম?
কলকাতা লাগোয়া নিউ ব্যারাকপুরের একটি মঞ্চে শনিবার একক অনুষ্ঠান ছিল রূপম ইসলামের।
গায়কের স্ত্রী এবং ম্যানেজার রূপসা দাশগুপ্ত বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, গানের মাঝেই মি. ইসলাম বলেন “ভারতবর্ষের বিচারব্যবস্থার ওপরে আমার পূর্ণ আস্থা আছে, সেই পূর্ণ আস্থা রেখেই আমি উমর খালিদ এবং অন্যান্য যারা বিচার ছাড়া আটক হয়ে রয়েছেন, তাদের বিচার চাইছি, এবং শুধু বিচার নয়, ন্যায় বিচার চাইছি।"
তিনি যখন এই কথাগুলি বলছিলেন, তখন মঞ্চের পর্দায় উমর খালিদের একটি প্রতিবাদী মুখের ছবিও দেখানো হয়।
অনুষ্ঠানে হাজির তার এক ভক্ত শিবাংশ ব্যানার্জী বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “যখন উনি দিল্লিতে কুস্তিগিরদের প্রতিবাদের কথা বলছিলেন, তখন আমরা সবাই সমর্থন করেছিলাম। কিন্তু হঠাৎই উমর খালিদের একটি ছবি পর্দায় দেখিয়ে তার ন্যায় বিচার দাবী করেন রূপম।
“একজন দেশ-বিরোধী, টুকরে টুকরে গ্যাংয়ের সদস্য, তাকে কীভাবে সমর্থন করতে পারলেন রূপম? এটা কখনই মেনে নেয়া যায় না। তাই অন্য অনেকের মতো আমিও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছি। লিবারেল মানে তো এটা নয় যে যা খুশি বলার অধিকার আছে কারও,” মন্তব্য শিবাংশ ব্যানার্জীর।
উমর খালিদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহ, সন্ত্রাস দমন আইন ইউএপিএ, দিল্লি দাঙ্গায় অংশগ্রহণ ইত্যাদি বহু মামলা থাকলেও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগুলির একটিও এখনও পর্যন্ত প্রমাণিত হয় নি।
রূপসা দাশগুপ্ত বিবিসিকে বলেন, “রূপম তো একবারও বলে নি যে উমর খালিদের মুক্তি চাই বা সে সঠিক কাজ করেছে! বিচার ব্যবস্থা নিয়েও কোনও প্রশ্ন তোলে নি। শুধু তো ন্যায় বিচার চেয়েছেন রূপম।“
মি. ইসলামের অনেক ভক্তদের প্রশ্ন যে ন্যায় বিচার চাওয়াটা তো দেশের নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে।
সুবিচার চাওয়া সাংবিধানিক অধিকার
ওই অনুষ্ঠানে হাজির আরেক ‘রূপম ভক্ত’ প্রিয়ম সেনগুপ্ত বিবিসিকে বলছিলেন, “আমি একেবারে সামনেই ছিলাম। তাই সেদিন ওর মন্তব্যটা খুব মন দিয়ে শুনেছি। তিনি উমর খালিদের মুক্তি চান নি, বিচার ব্যবস্থা নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলেন নি, উমর খালিদ দোষী না নির্দোষ, সেই বিচারের দিকে যান নি, উমর খালিদ এবং তার মতো অন্য অনেকে যারা বন্দী আছেন, তাদের হয়ে শুধুই ন্যায় বিচার চেয়েছেন। সুবিচার চাওয়ার দাবি তো আমাদের সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে পড়ে।“
অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন না, এমন বহু মানুষও ‘বয়কট রূপম ইসলাম’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে পোস্ট করছেন সামাজিক মাধ্যমে। এরকমই একজন, কোচবিহারের শিক্ষক সুমন কর্মকার।
তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, “তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রূপম ইসলামের প্রচুর ভক্ত আছে, তার অনেক গান আমারও খুব পছন্দের। কিন্তু উমর খালিদের ছবি দেখিয়ে তাকে প্রচারের আলোয় নিয়ে এসে এটা ঠিক করেন নি রূপম। উমর খালিদ তো একজন সাধারণ মানুষ নয়, তার বিরুদ্ধে বহু মামলা আছে, দেশদ্রোহের অভিযোগ আছে, তার কথা কেন রূপম ইসলাম মঞ্চে তুলবেন? এই ঘটনায় রূপম আমার এবং বৃহত্তর সমাজের চোখে ছোট হয়ে গেলেন।”
আরেক ফেসবুক ব্যবহারকারী শুভম সরকার লিখেছেন, “তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাকে সরিয়ে রেখেই রূপম ইসলামের প্রতি আমার খুব শ্রদ্ধা ছিল। এই রূপম ইসলামই তো বাংলাদেশের মাইলসের সঙ্গে এক মঞ্চে উঠতে অস্বীকার করেছিলেন কারণ তারা ভারতীয়দের অপমান করেছিল।
“সেই তিনিই কী করে এতটা নীচে নামলেন যে একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং সন্ত্রাসীদের সমর্থকের কথা বললেন?” ফেসবুকে লিখেছেন মি. সরকার।
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
হিন্দুত্ববাদীরাই রূপম-বিরোধী প্রতিবাদে?
যারা সামাজিক মাধ্যমে ‘বয়কট রূপম ইসলাম’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে অথবা ‘শেম অন রূপম ইসলাম’ লিখে মন্তব্য করছেন, তাদের মধ্যে অনেকের ফেসবুক প্রোফাইল দেখে স্পষ্টই বোঝা যায় যে তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রতি সরাসরি অথবা আকারে ইঙ্গিতে সমর্থন রয়েছে।
আবার কেউ কেউ ‘লাভ জিহাদ’এর প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন তাদের পোস্ট এবং কমেন্টে, লেখা হয়েছে মি. ইসলামের স্ত্রী রূপসা দাশগুপ্তর নামও। ওই সব পোস্ট পড়লে স্পষ্টই বোঝা যায় যে কেন মিসেস দাশগুপ্তর নাম লেখা হয়েছে সেগুলিতে।
উমর খালিদ, সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলন, তথাকথিত ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ বা লাভ জিহাদ – এগুলো হিন্দুত্ববাদী ইকো সিস্টেমের বহুল ব্যবহৃত ইস্যু।
হিন্দুত্ববাদী ইকো সিস্টেমে যেভাবে একই টেক্স্ট অনেকে কপি পেস্ট করে নিজেদের নামে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন, এক্ষেত্রেও সেই প্যাটার্ন লক্ষ্য করা গেছে।
রূপম-ভক্ত প্রিয়ম সেনগুপ্ত বলছেন যে কারা এইসব ইস্যুগুলো তুলছে সেটা স্পষ্ট।
“ওর পদবীটা যে ইসলাম। তাই বোঝাই যায় কারা করছে এগুলো। তবে রূপম ইসলামের যে ফ্যান বেস, এসব করে তাতে চির ধরানো যাবে না,” মন্তব্য প্রিয়ম সেনগুপ্তর।