মাহদী হাসানের সঙ্গে দিল্লিতে ঠিক কী হয়েছিল?

বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতা মাহদী হাসান শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে আছেন। তার সামনে ও পাশে পুলিশের দুইজন। চারপাশে বেশ কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন।

ছবির উৎস, Screen Grab

ছবির ক্যাপশান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতা মাহদী হাসানের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে ওসিকে হুমকি দেওয়ার ঘটনা আলোচনায় এসেছিল, ফাইল ছবি
পড়ার সময়: ৯ মিনিট

বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জের নেতা মাহদী হাসানের সঙ্গে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ঠিক কী হয়েছিল, তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে গত কদিন ধরেই নানা আলোচনা চলেছে।

মি. হাসান বাংলাদেশে ফিরেছেন বুধবার (১৮ই ফেব্রুয়ারি) বিকেলে।

মাহদী হাসান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক।

মাস খানেক আগে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর কারণে তাকে নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে প্রকাশ্যেই মি. হাসান ওসি আবুল কালামকে হুমকি দিচ্ছেন এই বলে যে, তারা বানিয়াচং থানা পুড়িয়েছেন এবং এস আই সন্তোষ চৌধুরীকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন।

এই বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার মুখে গত জানুয়ারিতে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারের প্রতিবাদে তার সমর্থকদের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে তাকে মুক্তি দেওয়া হলে তা নিয়েও হয় সমালোচনা।

সে সময়ই বিবিসি বাংলা মাহদী হাসানের সাথে কথা বলেছিল এবং তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, "সেদিন যে কথাটা আমি বলেছিলাম, এটা একদম অসাবধানতাবশত স্লিপ অব টাং হয়েছে"।

সম্প্রতি মি. হাসানের দিল্লি সফর নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার প্রেক্ষিতে মি. হাসান পর্তুগালের ভিসা নিতে দিল্লিতে গিয়েছিলেন বলে পশ্চিমবঙ্গে বিবিসি বাংলা সংবাদদাতাকে জানিয়েছিলেন এ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল দুজন কর্মকর্তা।

তবে এই প্রতিবেদনে পর্তূগালের ভিসার জন্য দিল্লি যাওয়ার তথ্য সম্পূর্ণ অসত্য বলে মি. হাসান সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি লিগ্যাল নোটিশের মাধ্যমে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পর্তুগাল নয়, বরং তিনি ফিনল্যান্ডের ভিসার জন্য দিল্লি গিয়েছিলেন।

প্রতিবেদনটিতে আরও কয়েকটি তথ্য ভুল আছে উল্লেখ করে মাহদী হাসান তার আইনজীবীর মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিশে উল্লেখ করেছেন।

এর আগে ২১শে ফেব্রুয়ারি এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগে এবং পরে তার সাথে অনেকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে লিগ্যাল নোটিশ দেয়ার পর ১১ই মার্চ তিনি বিবিসি বাংলার সাথে যোগাযোগ করে জানান, প্রতিবেদন সম্পর্কে সেই নোটিশে দেয়া বক্তব্যই এবিষয়ে তার বক্তব্য।

নোটিশে বলা হয়েছে, ক্রিপ্টোকারেন্সির মালিকানা সম্পর্কিত যে অভিযোগ ভারতের কর্মকর্তারা করেছেন সেটিও ভিত্তিহীন। যদিও এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ার সময়ই মি. হাসানের ঢাকার বিমানবন্দরে দেয়া বক্তব্যের উল্লেখ ছিল, সেখানেও তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সি থাকার অভিযোগকে 'গুজব' বলেছিলেন।

মাহদী হাসানের আইনজীবীর দেওয়া লিগ্যাল নোটিশে প্রতিবেদন বিষয়ে তার যেসব বক্তব্য এসেছে, তা এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়েছে।

মাহদী হাসান (ডানে) এবং তার আত্মীয় বলে পরিচয় দেওয়া নারী, দিল্লির মেট্রো রেলে

ছবির উৎস, Screengrab

ছবির ক্যাপশান, মাহদী হাসান (ডানে) এবং তার আত্মীয় বলে পরিচয় দেওয়া নারী, দিল্লির মেট্রো রেলে

প্রকাশিত প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সংবাদদাতার এই প্রতিবেদনে (২১শে ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত) দুটি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি তিনি দিল্লিতে গিয়েছিলেন পর্তুগালের ভিসা নিতে। সেখানেই তাকে কেউ একজন চিনে ফেলে এবং একটা ভিডিও রেকর্ড করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এরপরেই সক্রিয় হয়ে ওঠেন ভারতের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

ওই কর্মকর্তারা মঙ্গলবার আর বুধবার তার ওপরে কীভাবে নজর রেখেছিলেন আর শেষমেষ তার সঙ্গে ঠিক কী কী করা হয়েছে, তা জানতে পেরেছে বিবিসি বাংলা।

এমন দুজন ব্যক্তির সঙ্গে বিবিসি বাংলা পৃথকভাবে কথা বলেছে, যারা গোটা ঘটনাক্রম সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল।

অবশ্য তাদের নাম উল্লেখ করা হবে না, এই শর্তেই বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন।

তারা দুজনেই বলেছেন যে, মাহদী হাসানকে শারীরিকভাবে নিগ্রহ করা হয়নি কোথাও। তবে এটা তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, "ভারত-বিরোধী কথা বলে এবং বাংলাদেশের এক হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তাকে মেরে ফেলার প্রকাশ্য দাবি করে - এমন কোনো ব্যক্তিকে ভারতে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না। তাকে এটাও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নিজের দেশেই ফিরে যাওয়া ছাড়া তার অন্য কোনো উপায় নেই"।

ওই দুইজনের দেওয়া তথ্যের ওপরে ভিত্তি করেই এই প্রতিবেদন।

দিল্লির প্রাণকেন্দ্র কনট প্লেসে একটি বেসরকারি সংস্থার দফতরে মঙ্গলবার সকালে প্রথম দেখা যায় মাহদী হাসানকে। তার পাশে এক নারীও বসেছিলেন। ওই বেসরকারি সংস্থাটি বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের হয়ে ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ করে থাকে।

জানা গেছে যে মি. হাসান এবং তার পাশে বসা নারী পর্তুগালের ভিসার জন্য আবেদন করতে গিয়েছিলেন।

পর্তুগালের ভিসা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের নাগরিকদের দিল্লিতে আসতে হয়, সে জন্য ভারতীয় ভিসা লাগে। জানা গেছে যে, বাংলাদেশের ভারতীয় দূতাবাস মাহদী হাসানকে ভিসা দিয়েছিল।

মি. হাসান এবং তার সঙ্গে আসা এক নারী নিউ দিল্লি রেল স্টেশনের কাছাকাছি পাহাড়গঞ্জ এলাকার একটি হোটেলে ওঠেন বলে বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে।

কনট প্লেসের ওই ভিসা কেন্দ্রে অপেক্ষা করার সময়ে কেউ তার ভিডিও রেকর্ড করে নেয়। সেই ব্যক্তি যে কে, সেটা কেউ জানাতে চাননি। তবে তিনি যে মি. হাসানকে চিনতে পেরেছিলেন, এটা নিশ্চিত।

ভিডিও রেকর্ডকারী ব্যক্তিও সেখানে ভিসা নিতেই গিয়েছিলেন।

তবে সেই ব্যক্তি পর্তুগালের জন্য নয়, অন্য কোনো দেশের ভিসা পাওয়ার আবেদন জানাতে গিয়েছিলেন বলে বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে।

"মঙ্গলবার সকাল ১১টা নাগাদ মাহদী হাসানকে চিহ্নিত করা যায়। আমরা কিছুক্ষণের মধ্যে খবর পেয়ে যাই। সেই সময়েই পর পর তার কাছে ভারতীয় আর বাংলাদেশের নানা নম্বর থেকে ফোন আসতে শুরু করে। সেই সব ফোন কারা করছিল, সেটা বলব না, কিন্তু তখনই মাহদী হাসান আন্দাজ করে যে কোথাও একটা গন্ডগোল হয়েছে"।

"একটা নতুন দেশে এসে, যেখানে তাকে কেউ চেনে না – তার কাছে হঠাৎ করে কেন এত অজানা নম্বর থেকে ফোন আসবে! এটা তাকে চিন্তায় ফেলে দেয়। অন্যদিকে কর্মকর্তারা তার ওপরে নজর রাখা শুরু করেন," বিবিসি বাংলাকে জানাচ্ছিলেন পুরো ঘটনাক্রম সম্বন্ধে জানেন, এমন একটি সূত্র।

অন্য সূত্রটি বলছে যে ওই ভিসা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে তিনি প্রথমে পুরোনো দিল্লির জামা মসজিদ এলাকায় গিয়েছিলেন।

"বেলা দুটো থেকে আড়াইটের মধ্যে তার (মাহদী) কাছে বাংলাদেশ থেকে কেউ জানায় যে সে চিহ্নিত হয়ে গেছে। তখন সে নিশ্চিত হয় যে অজানা নম্বরগুলো থেকে কারা, কেন ফোন করছিল। এরপরেই সে দিল্লিতে কয়েকটি জায়গায় গিয়েছিল আশ্রয়ের সন্ধানে। কেউই তাকে থাকতে দিতে রাজি হয়নি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন একটি সূত্র।

মাহদী হাসানের জামিন পাওয়ার পর আদালত প্রাঙ্গন থেকেই আনন্দ মিছিল বের করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা - কর্মীরা।

ছবির উৎস, Screengrab

ছবির ক্যাপশান, এস আই সন্তোষকে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা নিয়ে বক্তব্যের জেরে গ্রেফতারের পরদিনই জামিন পেয়েছিলেন মাহদী হাসান

'দিল্লি ছাড়তে হবে'

বিবিসি বাংলা যে দুজনের সঙ্গে কথা বলেছে, তাদের একজন জানিয়েছেন, মি. হাসান দিল্লি থেকেই ভিসা নিয়ে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তার সঙ্গে যে নারী ছিলেন, তিনি মি. হাসানেরই এক আত্মীয়া।

ওই সূত্রটিই বলেছে যে, পরবর্তী সময়ে খরচের জন্য ক্রিপ্টো-কারেন্সি নিয়ে ভারতে এসেছিলেন মাহদী হাসান এবং তার পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় ৪০ লক্ষেরও বেশি।

তবে অন্য সূত্রটি "এটা আমার এখতিয়ারে পড়ে না" বলে অর্থের পরিমাণ সম্বন্ধে কিছু জানাতে পারেননি। তিনি এটাও নিশ্চিত করতে পারেননি যে মি. হাসান দিল্লি থেকেই লিসবনে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন কি না।

তবে মি. হাসানকে কেউ পরামর্শ দেন যে তিনি যেন পাহাড়গঞ্জের হোটেল থেকে সরে যান এবং বিমানবন্দরের কাছাকাছি কোনো হোটেলে ওঠেন।

পাহাড়গঞ্জের হোটেল থেকে কাউকে দিয়ে তিনি নিজের ব্যাগ-সুটকেস আনিয়ে বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি হোটেলে ওঠেন মঙ্গলবার সন্ধ্যায়।

দিল্লি-ঢাকা ইন্ডিগোর বিমানের টিকিট তাকে পৌঁছিয়ে দেওয়া হয় রাতেই।

ইন্ডিগোর একটি বিমান

ছবির উৎস, Prakash Singh/Bloomberg via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লি থেকে ইন্ডিগোর একটি বিমানে তিনি ঢাকা ফিরে যান - ফাইল ছবি

'ভিসা বাতিল'

একদিকে মাহদী হাসানের ওপরে নজর রাখা যেমন চলছিল, অন্যদিকে ভারতীয় কর্মকর্তারা খোঁজ করছিলেন যে "ভারতবিরোধী কথা বলা কোনো ব্যক্তিকে ঢাকার ভারতীয় দূতাবাস ভিসা কী করে দিল"- সেই প্রশ্নের উত্তর।

একটি সূত্র বলছে, "সে সম্ভবত বাংলাদেশে কোনো এজেন্টকে দিয়ে ভারতের ভিসা জোগাড় করেছিল। আর তার বিরুদ্ধে ভারতে তো কোনো মামলা নেই। সে পর্তুগালের ভিসা নেওয়ার জন্য ভারতে আসতে চেয়েছিল। তাই কীভাবে তার ভিসার আবেদন বাতিল করা যেত?"

অন্য সূত্রটি জানাচ্ছে, "যেভাবেই ভিসা জোগাড় করে থাক সে, তার ভিসা রাতেই বাতিল করানো হয়েছে। সেই খবর অবশ্য সে আগে জানতে পারেনি"।

দুটি সূত্রই বলছে যে মাহদী হাসান এটা মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যেই বুঝে গিয়েছিলেন যে তার পক্ষে আর এক দিনও ভারতে থাকা সম্ভব না। এমনকি পর্তুগালের ভিসার জন্য তাকে কনট প্লেসের ওই বেসরকারি সংস্থা দফতরে বুধবার সকালে দ্বিতীয়বার যেতে বলা হলেও সেখানে যে তিনি যেতে পারবেন না, এটা বুঝে গিয়েছিলেন।

"বিমানবন্দরের কাছের ওই হোটেলে সকালের জলখাবার খেয়ে ৮টা ১০ মিনিটে সে রওনা দেয়, আর ৮টা ৫০ মিনিট নাগাদ সিকিউরিটি চেক করতে এগোয়," বিবিসিকে জানিয়েছে দুটি সূত্রই।

তারা দুজনে জানাচ্ছেন যে, ইন্ডিগোর ১২টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইটের টিকিট ছিল তার কাছে। এটা দিল্লি বিমানবন্দরে একটি সেলফি ভিডিও করার সময়ে নিজেও জানিয়েছিলেন তিনি। ওই ভিডিওটি তিনি সামাজিক মাধ্যমে আপলোডও করেছেন। সেখান তিনি হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন।

একটি সূত্র বলছে, মাহদী "বিমান সংস্থার চেক ইন কাউন্টারে গিয়ে তিনি নিজের বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করে সিকিউরিটি চেকের জন্য এগোন"।

"নিরাপত্তা চেকিংয়ের জন্য তিনি নিজের লাগেজ স্ক্যানারের কনভেয়র বেল্টে দেন। লাগেজ এগিয়ে যায়, তিনি লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সময়েই এক ভারতীয় কর্মকর্তা তাকে একটু সরে আসতে বলেন," বিবিসিকে জানিয়েছে একটি সূত্র।

বানিয়াচং থানায় নিহত এসআই সন্তোষ
ছবির ক্যাপশান, পাঁচই অগাস্টের অভ্যুত্থানের দিনে বানিয়াচং থানা থেকে গভীর রাতে এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে ছিনিয়ে নিয়ে থানা চত্বরেই পিটিয়ে হত্যা করা হয়

জেরা শুরু

নিরাপত্তা চেকিংয়ের লাইন থেকে তাকে সরিয়ে এনে শুরু হয় জেরা।

"বিভিন্ন এজেন্সির কর্মকর্তারা তাকে জেরা করেন, খুব শান্তভাবে, কোনো শারীরিক নিগ্রহ ছাড়াই," বলছে দুটি সূত্রই।

তাদের একজন বলছেন, যে মি. হাসান যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, সেটা তো বাংলাদেশের বিষয়, ভারত কেন সেখানে মাথা ঘামাবে।

তবে একটি সূত্র বলছে, "আমাদের তিনটে পয়েন্ট ছিল। প্রথমত সে ভারতকে অপমান করেছে, কটূ কথা বলেছে। দ্বিতীয়ত সে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে বলে প্রকাশ্যে দাবি করেছে, তাই সে একজন সন্দেহভাজন ক্রিমিনাল। তৃতীয় পয়েন্টটাই সবথেকে গুরুত্ব পেয়েছে আমাদের কাছে, সে একজন হিন্দু অফিসারকে মেরেছে বলে দাবি করেছে। এত কিছুর পরেও সে দিল্লিতে আসবে আর এখান থেকে অন্য কোনো দেশে চলে যাবে, আর আমরা চুপ করে বসে থাকব?"

প্রায় আধঘণ্টা তাকে জেরা করা হয় দিল্লির বিমানবন্দরেই। দুটি সূত্রই জানাচ্ছে, তাকে কোনোরকম শারীরিক নিগ্রহ করা হয়নি।

বাংলাদেশে ফিরে কী বললেন মাহদী হাসান?

দিল্লি থেকে বুধবার বিকেলে ইন্ডিগোর বিমানে বাংলাদেশে ফিরেছেন মাহদী হাসান। বিমানবন্দরেই কয়েকজন সাংবাদিক তাকে ঘিরে ধরে জানতে চান যে দিল্লিতে তার সঙ্গে ঠিক কী হয়েছিল।

গোড়ায় তিনি সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন না। অপেক্ষমান গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতেই তিনি বলেন, "বলব আমরা, জানাবো, জানাবো"।

এরপরে তিনি বলেন, "আমাকে এসএডি লিডার, বৈষম্যবিরোধী নেতা বলে আটক করা হয়েছিল। তারপর হচ্ছে আমাকে প্রচন্ড হ্যারাস করা হয়েছে। আমি ফুল লাইফ রিস্কে ছিলাম"।

"এটা আমি বলে না, যে কোনো অন্য একটা দেশের নাগরিককে যে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেটা দেয় নাই। সো এইটা আমরা ডিটেইলসে জানাবো পরে," সংবাদ মাধ্যমকে জানান তিনি।

একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, "আপনার ওয়ালেটে নাকি ক্রিপ্টো কারেন্সি পাওয়া গিয়েছিল, সেই বিষয়টা যদি ক্লিয়ার করেন"।

জবাবে তিনি বলেন যে ওগুলো 'গুজব'।

বাংলাদেশে ফেরার পরেও বিমানবন্দরেও এক দফা জেরার মুখে পড়তে হয়, সেটাও জানান মি. হাসান।

"আমাকে আটকানো হয়েছিল, জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বাংলাদেশেও। পরবর্তীকালে আমাকে ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয়," মন্তব্য মাহদী হাসানের।

ভারতের যে দুটি সূত্র থেকে মাহদী হাসানকে ঘিরে দিল্লির ঘটনাবলী সম্পর্কে বিবিসি বাংলা জানতে পারে, সেই ব্যাপারে তার বক্তব্য জানতে দুদিন ধরে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি আমরা।

কিন্তু কোনোভাবেই তার সঙ্গে ফোনে কথা বলা যায়নি।

(২১শে ফেব্রয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি এখানেই শেষ হয়)

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর - ফাইল ছবি

মাহদী হাসানের লিগ্যাল নোটিশ এবং প্রতিবেদকের বক্তব্য

গত ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত 'মাহদী হাসানের সঙ্গে দিল্লিতে ঠিক কী হয়েছিল?' শিরোনামে এই প্রতিবেদনে কিছু ভুল তথ্য রয়েছে উল্লেখ করে মাহদী হাসানের পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী ওই নোটিশটি দিয়েছেন।

মাহদী হাসান ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে দিল্লী গিয়েছিলেন। সেই সময় তৃতীয় একটি দেশের ভিসার আবেদনের জন্য দিল্লিতে গিয়ে ফেরার পথে বিমানবন্দরে তাকে জেরা করে ভারতের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা।

এই খবর বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।

সেই ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনের কিছু তথ্যকে অসত্য দাবি করেই আইনি নোটিশ দিয়েছেন মি. হাসানের আইনজীবী।

মাহদী হাসানের পক্ষে আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, "ভারতের দুইটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি করা হয়েছে, যেগুলো প্রকাশ করা হয়নি।"

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিবিসি বাংলার সংবাদদাতার প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা আছে, দুইজন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যের ওপরে ভিত্তি করে এই প্রতিবেদনটি করা হয়েছে, যারা ঘটনাক্রম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। কোনো 'গোয়েন্দা প্রতিবেদনের' ভিত্তিতে নয়।

মাহদী হাসানের আইনজীবীর নোটিশে আরো বলা হয়, "প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি পর্তুগালের ভিসা নিতে গিয়েছিলেন, যা সম্পূর্ণ অসত্য।

এছাড়াও ওই নোটিশে বলা হয়েছে, বিমানবন্দর সংলগ্ন হোটেলে তার অবস্থান সম্পর্কিত তথ্যও ভুল এবং তার ক্রিপ্টোকারেন্সির মালিকানা সম্পর্কিত অভিযোগও ভিত্তিহীন।"

এই তথ্যগুলো বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে সূত্রের বরাতেই উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো বিবিসির নিজস্ব বক্তব্য বা অভিযোগ নয়।

দিল্লির ঘটনাবলী সম্পর্কে এসব তথ্য পাওয়ার পর, সম্পাদকীয় নীতিমালা অনুযায়ী, সে ব্যাপারে সরাসরি মাহদী হাসানের বক্তব্যও জানার চেষ্টা করা হয়।

বিবিসি বাংলার ওই প্রতিবেদনেই উল্লেখ করা হয়েছে, মি. হাসানের বক্তব্য জানতে দুদিন ধরে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই তার সঙ্গে ফোনে কথা বলা যায়নি।

প্রতিবেদন প্রকাশের পরে বিষয়টি আলোচনা এলে, তখনও তাকে অনেকবার ফোন করা হয়। যা তিনি রিসিভ করেননি।

যদিও, বুধবার (১১ই মার্চ) তিনি বিবিসি বাংলার কাছে স্বীকার করেছেন যে, তার ফোনে তখন ফোন গিয়েছিল।

দিল্লি থেকে ঢাকায় ফিরে মাহদী হাসান গণমাধ্যমের কাছে, ক্রিপ্টোকারেন্সির বিষয়টিকে 'গুজব' বলে দাবি করেন।

যা বিবিসি বাংলার ঐ প্রতিবেদনে তার বক্তব্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

মাহদী হাসান ফিনল্যান্ডের ভিসার জন্য আবেদন করতে গিয়েছিলেন বলে তার আইনজীবীর নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অপপ্রচার দ্বারা প্রভাবিত বলেও দাবি করা হয়েছে লিগ্যাল নোটিশে।

উল্লেখ করা হয়, "প্রতিবেদনে একটি হত্যার অভিযোগকে সামনে আনা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং আওয়ামী লীগের চালানো অপপ্রচার।"

তবে, বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে কোনো হত্যার অভিযোগ আনা হয়নি। বরং, তার বক্তব্যকেই উদ্ধৃত করা হয়েছে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট কারো বক্তব্যও তুলে ধরা হয়নি।

মূলত, তার বেলায় এই হত্যা সংক্রান্ত বিষয়টি জানুয়ারিতে প্রথমে আলোচনায় আনেন মি. হাসানই। যদিও, মুখ ফস্কে অসাবধানতাবশত এ কথা বলেছেন বলে তখন বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন তিনি।

"সেদিন যে কথাটা আমি বলেছি এটা একদম অসাবধানতাবশত স্লিপ অব টাং হয়েছে " বলেন মি. হাসান।

লিগ্যাল নোটিশে বলা হয়েছে, প্রতিবেদনের ফলে মাহদী হাসান 'সাইবার হামলা, সামাজিকভাবে নাজেহাল এবং আওয়ামী দুর্বৃত্তদের আক্রমণের' শিকার হন।

যদিও এই প্রতিবেদনটি করা হয়েছিল সামাজিক মাধ্যমে এবিষয়ে নানা আলোচনার প্রেক্ষিতে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার এই দিল্লি সফর নিয়ে সংবাদ প্রচারিত হয়েছে।

মি. হাসানের পক্ষ থেকে দেয়া এই লিগ্যাল নোটিশটি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানীয় গণমাধ্যমের কাছে দেয়া হলে সেটি নিয়ে তারা প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনের প্রয়োজনে মাহদী হাসানের আইনজীবী শাহরিয়ার কবিরের কাছ থেকেই লিগ্যাল নোটিশের একটি অনুলিপি সংগ্রহ করা হয়েছে। এবং তার প্রেক্ষিতে এই প্রতিবেদনের বিভিন্ন বিষয়ে তার যে প্রতিবাদ এবং নতুন বক্তব্য এসেছে সেটি সংযুক্ত করা হয়েছে।